বাঙালিয়ানা ধাঁচে পুরোনো লাল বেনারশিটা পরে, মাঝ দিয়ে সিঁথি করে লম্বা, কালো চুলগুলা ছেড়ে দিয়ে আগাম জানান না দিয়েই,দুরু দুরু বুকে এসে দাঁড়ালাম অনিরুদ্ধর রুদ্ধ দ্বারে!
আজ ওদের হোলি উৎসব চলছে। অনেক লোকের সমাগম।
ওর দেয়া ঠিকানা মত এসে, অনিরুদ্ধর খোঁজে ইতিউতি চাইলাম।
ভাগ্যিস আজ হোলি, তাই কেউ আমার এমন জাঁকজমকপূর্ণ সাজ দেখে অদ্ভুতভাবে আমার দিকে তাকাচ্ছেনা! না পেয়ে খানিকটা দূরে একটা স্টল দেখে সেদিকে এগিয়ে গেলাম। স্টলের মালিককে জিজ্ঞেস করলাম-
ঃ শুনুন! অনিরুদ্ধ রায় কে চেনেন?
ঃ হা চিনি!
ঃ কোথায় পেতে পারি জানেন?
ঃ তুমি কি রাই? (ভদ্রলোক আমার দিকে ভ্রু কুঁচকে এক দৃষ্টে খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে জিজ্ঞেস করলো)
*ঃ (আমিও একটুক্ষণ দ্বিধায় ভুগে পাল্টা জিজ্ঞেস করলাম) আপনিই কি সমীরদা?
একান ওকান অব্দি হাসি দিয়ে মাথা ঝাঁকালো সমীরদা। তারপর দোকান ছেড়ে বেরিয়ে এসে "এসো!" বলে আমাকে নিয়ে উৎসবের ভীড়ের দিকে এগিয়ে চললো।
চারপাশে রঙের ওড়াওড়ি, ছড়াছড়ি।
রঙটঙ পড়ছে আশপাশ থেকে। কিছুদূর যেয়ে আমার সামনে এসে থামলেন সমীরদা, চিৎকার করে ডাকলেন, "অ্যাই অনি! এদিকে আয়তো!"
আমি সমীরদার পিছনে দাঁড়িয়ে হঠাৎ কেমন নার্ভাস হয়ে গেলাম।
এই আয়োজনের সাজ, অভিমানের লাজ, কিশোরী হৃদয়ের অনাহূত কম্পন সব মিলিয়ে মনে হলো ঘুরে একটা দৌড় দেই!
যথেচ্ছ হলো এ স্বয়ম্বর!
কিন্তু ততক্ষণে উনি পৌঁছে গেছেন!
ঃআরে দাদা! তোমার বদ্ধ গুহা ছেড়ে বেরুলে তবে! তুমি আবার ক..."
ওঁর মুখের কথা মুখেই রয়ে গেলো। কারণ ততক্ষণে সমীরদা আমার সামনে থেকে সরে দাঁড়িয়ে চুপচাপ কেটে পড়েছে! এমন আচম্বিত পর্দা উঠে যাওয়ায় হতবিহ্বল আমি। কান ঝাঁঝাঁ করছে!
চোখ তুলে যখন চাইলাম- ওকে হঠাৎ দেখে মনে হলো, বুদ্ধদেবের রাজর্ষি বসু যেনো আমার সামনে দাঁড়িয়ে!
সাধা পাঞ্জাবি-ধুতি, কাঁধের এক পাশে ফেলে রাখা ঘিয়ে রঙের একটা চাদর, কপালে লাল তিলক, ক'দিনের না কামানো দাঁড়ি আর রাজ্যের বিস্ময়, আনন্দ মিশে একাকার হওয়া অভিভূত এক জোড়া চোখ। এইতো সেই পুরুষ যার প্রেমে পড়েছিলাম একবার, আজীবনের তরে।
চোখাচোখি হতেই চোখ নামিয়ে ফেললাম। পুরয়ায় চোখ তুলে চাইতে পর্যন্ত পারছিনা। মানে হয় এসবের! হঠাৎ করেই সমীরদার উপর রাগ হচ্ছে! ব্যাটা হুট করেই কেনো চলে গেলো এভাবে!
আমি তখনও মাটির দিকেই চেয়ে আছি।
নিজেকে পরিণত নারীর মত আচরণ করার জন্য মনে মনে খুব শাসাচ্ছি।
অনিরুদ্ধ পায়ে পায়ে এগিয়ে এলো এলো। তারপর আমাকে পেরিয়ে চলেও গেলো! আমি হতম্ভবের মত ওভাবেই দাঁড়িয়ে রইলাম।
সম্বিত ফিরতে ঘুরে দাঁড়াতেই দেখি একগাল হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে! অদ্ভুত দূর্বোধ্য এক হাসি।
দু'হাত দিয়ে আলতো করে আমার দুই গালে রঙ লাগিয়ে দিলো (প্রয়োজনের তুলনায় বেশীই সময় নিলো যেনো!) সে গালের আলতো স্পর্শ বোধহয় সমগ্র স্বত্বাকে ছুঁয়ে গেলো। আমি চোখ বুজে, ঠোঁট কামড়ে।
ঃ দেবী ধরায় নেমে এলে তবে! হাসি আরো বিস্তৃত করে বললো।
ঃ ভালো হচ্ছেনা কিন্তু! অন্যদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে জবাব দিলাম।
তারপর ফেরার সময় হয়ে এলো। হঠাৎ আমার দিকে সামনে ফিরে, মুখোমুখী দাঁড়িয়ে অনিরুদ্ধ জিজ্ঞেস করলো-
ঃআমাদের কি আর দেখা হবে?
ঃ (এই ভয়ই করছিলাম। এই প্রশ্নটার। কিসের একটা পাকানো ঢেউ, গলার কাছে এসে আটকে গেলো। ঠোঁট কামড়ে তীব্র কান্না ঠেকানোর চেষ্টা করছি। জবাব দিতে পারলাম না।
ঃ আরকি চিঠি লেখাও হবেনা? মরিয়ার মত জিজ্ঞেস করলো যেনো।
আমি অন্যদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে চেয়ে রইলাম। চোখের পানি লুকোনোর চেষ্টায়। ওতো জানে, বুঝে; তবুও কেনো আমার সংকল্পকে নাড়িয়ে দিচ্ছে।
ওর বড় দীর্ঘশ্বাস এইরকম কোলাহলেও স্পষ্ট টের পেলাম।
"এক মিনিট দাঁড়াও" বলে কোথায় যেনো গেলো। আঁচল দিয়ে তাড়াতাড়ি চোখ মুছে নিলাম।
আমি যেমন জানতাম আর দেখা হবেনা, কথা হবেনা , ও নিজেও জানতো! তবুও কেনো প্রশ্ন করে এই অপ্রাসঙ্গিকতা টেনে কষ্টের ঢেউটাকে জাগিয়ে দিলো! কেনো এভাবে সংযমের দেয়ালকে এক ধাক্কায় ভেঙে দিতে হবে!
.
একটু পরই ফিরে এলো।
আমি কিছু বুঝে উঠবার আগেই গাড় একতাল সিঁদুর আমার সিঁথিজুড়ে রাঙিয়ে দিলো!
কিছু বলতে পারলাম না। মরিয়া হয়ে শব্দের খোঁজ করছি। পেলাম না কিছুই। বিহ্বল আমি মাথা তুলে ওর দিকে চাইলাম।
অনিরুদ্ধ হাসছে। সবচেয়ে বেশী হাসছে ওর সিক্ত, চকচকে চোখ জোড়া। নির্বাক দৃষ্টে ওর হাসিমাখা মুখশ্রীর দিকে চেয়ে রইলাম।
ওর বিন্দুবিন্দু ঘাম জমা কপাল, আর্দ্র চোখজোড়া, মুখ ভরা খোঁচাখাঁচা দাড়ি আর ভীষণ একটা হাসি যাতে তীব্র কষ্ট আর সুখ একইসাথে মিলেমিশে একাকার।
আমার নীরব কান্না এবার ফুঁপিয়ে উঠলো। দু'হাতে মুখ ঢেকে কান্না থামানোর তীব্র চেষ্টা করছি।
অনিরুদ্ধ আলতো করে মাথায় হাত রাখলো আশীর্বাদের ভঙ্গিতে। যেনো ক্রন্দনরত ছোটো বাচ্চার অভিমান থামাতে হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছে।
তারপর হঠাৎই কি হলো ওর!
স্থান, কাল, পাত্র ভুলে আমাকে বুকে টেনে নিলো।
পরক্ষণেই আমার এত বছরের হাসি মুখে প্রত্যাখ্যিত হওয়া সমস্ত অভিমান, ভালবাসা, সুখ, কষ্টরা সব অস্বীকৃতির গারদ ভেঙে আজ প্রতিশোধ নিচ্ছে আমার উপর।
ঠেলাঠেলি করে বেরিয়ে আসছে। আমি অসহায় হয়ে কেবল প্রত্যক্ষ্য করছি সেসব বহুমুখী আবেগের উপচে পড়া ভীড়।
আমি ওর বুকের কাছটার পাঞ্জাবি দু'হাতে আঁকড়ে ধরে ফুঁপিয়ে যাচ্ছি।