পথশিশু বলতে আমরা তাদের কেই বুঝি, যাদের থাকার নির্দিষ্ট কোন জায়গা নেই, যাদের কাছে রাস্তাই স্বাভাবিক বাসস্থান। তাদের ঘরের ছাদ ঐ আকাশটা। তারা দায়িত্বশীল কোন ব্যক্তি দ্বারা পরিচালিত বা সুরক্ষিত নয়। পথশিশু বলতে আমরা তাদের কেই বুঝি, যারা তাদের সাধারণ অধিকার থেকে বঞ্চিত।
পথশিশুরা অন্য শিশুদের মতো বিদ্যালয়ে যায় না। তারা নিজের পেটের দায়ে রাস্তাঘাটে বিভিন্ন জিনিসপত্র বিক্রি করে। কখনো তারা বাসের হেলপার, কখনো বা ইট ভাঙ্গার কাজ আবার কখনো বা হোটেল পরিষ্কারের কাজ করে তারা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাদের পরিবারের ভরণ-পোষণ তারাই বহন করে থাকে। কারোর দেখা যায় বাবা নেই, কারো বাবা আবার মা নেই । থাকলেও যারা উপার্জন করতে অক্ষম অথবা তাদের উপার্জন পরিবারের ভরণ-পোষণের জন্য যথেষ্ট নয়। ফলে তারা হয়ে উঠেছে তাদের পরিবারের ভরসার প্রতীক।
বাংলাদেশে বর্তমানে উন্নয়নশীল একটি দেশ। ২০২০ এ বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ছিল ২২২৭ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি টাকায় যা হাজার ১৯,০০০ টাকার মতো। এই আয় স্পষ্ট ভাবে প্রকাশ করে আমাদের দেশ কতোটা উন্নত। একটি হিসেবে দেখা গেছে বাংলাদেশ প্রায় ৬,০০,০০০-এর বেশি পথশিশু বসবাস করছে তারমধ্যে প্রায় ৭৪ ভাগই রাজধানী ঢাকায় বসবাস করে। বাকিদের মধ্যে বেশিরভাগই চট্টগ্রাম শহরে বসবাস করে।
বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। আরেকটি উৎস হতে জানা গেছে যে, মানব উন্নয়ন সূচকে বর্তমানে বাংলাদেশ ১৩৮ তম স্থানে অবস্থান করছে। এই স্তর ই প্রকাশ করে আমদের আমাদের দেশের মানুষের জীবন যাত্রার মান। আর এই দেশে পথশিশু আর শিশুশ্রম এখন একটা স্বাভাবিক ব্যাপার।
দেশে প্রয়োজনীয় কর্মসংস্থানের অভাব যেমন বেকারত্ব বাড়িয়ে তুলছে তেমনি বাড়াচ্ছে দারিদ্রতা । অতি দারিদ্রতা দিন দিন পথশিশুদের পরিমাণ বাড়িয়ে তুলছে। ফলে দেখা যাচ্ছে রাস্তার ছেলে-মেয়েরা অবৈধ উপার্জনে জড়িয়ে পড়ছে। যার প্রধান কারন হচ্ছে সঠিক শিক্ষা না পাওয়া। পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক শিক্ষার অভাব। পথশিশুরা সাধারন ভাবেই মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। তাদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থাকেনা। প্রয়োজনীয় শিক্ষার অভাবে তারা মানবিক মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলে।
দেশের কুচক্রী কিছু কিছু মানুষ পথ শিশুদের তাদের কাজে ব্যবহার করে। রাস্তার ছেলে মেয়েরা অনেক সময় ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করতে বাধ্য হয়। তাদের দ্বারা ভিক্ষাবৃত্তি থেকে শুরু করে মাদক ব্যবসায় ব্যবহার করে কিছু দুষ্ট প্রকৃতির মানুষ। প্রায়ই দেখা যায় পথশিশুরা মাদকসেবনে জড়িয়ে পড়ে।
শিশু অধিকার ফোরামের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী ৮৫ ভাগ পথশিশু মাদকাসক্ত। যাদের মধ্যে ২৮% হেরোইন, ৪৪% শিশু ধূমপান, ২৮% নানারকম ট্যাবলেট , ৭% শিশু ইনজেকশনে আসক্ত। আরেকটি হিসেবে দেখা গেছে ২০% পথশিশু শারীরিকভাবে নির্ধারিত হয় এবং ১৪.৫% পথশিশু সার্বিকভাবে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। দেশের অনেক রাজনীতিবিদ ও পথশিশুদের ব্যবহার করে থাকে তাদের কাজে। তাছাড়া প্রায়ই পথশিশুরা ছিনতাইয়ের কাজেও জড়িয়ে পরে।
পথশিশু সমস্যার সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ :
পথশিশু সমস্যার প্রতিকারে রাষ্ট্রীয়ভাবে দেশের সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে। পথশিশুদের পুর্নবাসনের পাশাপাশি পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে ওয়েলফেয়ার বোর্ড গঠন করা এবং তাদের জন্য আলাদা ফান্ডিং এর ব্যবস্থা করা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।
সামাজিকভাবেও এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে পারিবারিক শিক্ষা অত্যন্ত জরুরী। পথশিশুরা যেন পারিবারিক ও সামাজিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন এনজিওর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
খুশির খবর হ্যালো বর্তমানে অনেক সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এই সমস্যা সমাধানে এগিয়ে এসেছে। সরকারি সমাজসেবা অধিদপ্তর এ নিয়ে কাজ করে আসছে অনেকদিন ধরে। পাশাপাশি বিভিন্ন এনজিও ও কাজ করছে পথশিশুদের নিয়ে। এখন দেশের অনেক জায়গায় গড়ে উঠেছে পথশিশুদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ব্যক্তিগতভাবেও অনেকে এগিয়ে আসছে পথশিশুদের সাহায্যের জন্য। এখন প্রায়ই দেখা যায় ব্যক্তিগত অথবা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পোশাক ও খাবার বিতরণ করা হচ্ছে পথ শিশুদের মধ্যে। সামান্য এই উপহারগুলো হাসি ফুটিয়ে তুলছে পথশিশুদের মুখে।
আশা করি সরকারি-বেসরকারি, প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত শিশু গুলো একদিন তাদের অধিকার গুলো ফিরে পাবে।সৃষ্টি হবে একটি সুন্দর বাংলাদেশের।