ফেসবুকে আক্রমণ করে কখন, কবে, কাকে হেদায়েতের আলোয় আলোকিত করতে পেরেছেন, খুব জানতে ইচ্ছে করছে।
ইসলামপন্থিদের মাঝে সোস্যাল মিডিয়ায় দুধরণের মানুষ আছে। এক শ্রেণির ভাইবোন শত অযোগ্যতা ও সীমাবদ্ধতাকে সাথে নিয়েই আল্লাহ্ প্রদত্ত কিছু মেধা ও সৃজনশীলতাকে কন্সট্রাকটিভলি কাজে লাগিয়ে অবিরত ভালো কিছুর চেষ্টা করে যাচ্ছে।
আরেক শ্রেণির ভাইবোন আছেন কে, কী করছেন, কেন করছেন, কেন লিখছেন, কেন বলছেন- এসব প্রশ্নের বৃত্তের মাঝে ঘুরপাক খাচ্ছেন। ক্রিটিক করার মাঝে এক চিরন্তণ সুখ আছে মনে হয়। কিছু লোক কী দারুণ যোগ্যতার সাথে একজনকে আক্রমণ করতে পারছে, ঘন্টার পর ঘন্টা ব্যয় করে তথ্য আবিস্কার করছে। খুব আফসোস করি, অন্যের পেছনে না-লেগে এই মেধাবী মানুষগুলো যদি আরও কন্সট্রাক্টিভ কাজের পেছনে লেগে থাকতো! উম্মাহ তাহলে কতই না উপকৃত হতো।
দেখুন, অন্যকে আপনি যতোই মেধা ও মননের সাথে ভুল প্রমাণিত করুন না কেন, তাতে আপনি লোকটা যে ‘সঠিক ও ভালো মানুষ’ তা কিন্তু প্রমাণ হয় না । বরং কিছু মধ্যমপন্থি মানুষ আপনার এই ‘সমালোচক সত্বাকে’ সিরিয়াসলি খারাপ চোখে দেখে।
ইসলামপন্থি কারও সামান্য ত্রুটি দেখলেই যেভাবে ঈমানের দাবি মেটাতে কীবোর্ড হাতে নেন, বুকে হাত রেখে একবার ভাবুন তো তামাম জিন্দেগীতে সব বিষয়েই কি আপনি এতোটা কঠোর? অনলাইনে যাকে এভাবে কেটে-কুটে খারিজ করে দেন, নিজের পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের সবাইকেই দ্বীনের কারণে এভাবে কি খারিজ করে দিয়েছেন? কারও সাথে কি আপোষ করেননি?
খুব সেন্সিটিভ একটা কথার প্রচলন হয়েছে। ইসলামপন্থিদের ভুল কাজের সমালোচনা করা ঈমানের অপরিহার্য দাবি। হ্যাঁ, মানলাম। আমাদের দ্বীনে ইহতেসাব (কাউকে সংশোধনের পদ্ধতি) নিয়ম সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা আছে। কারও ভুল সংশোধনের সময় ইহতেসাবের নিয়ম মেনে চলছেন তো? মনে রাখবেন, ভুল সংশোধনের উপায় যেন ভুল না-হয়। তাহলে তৃতীয় আরেকটি ভুলের জন্ম হবে।
এই যে কীবোর্ডে ঝড় তোলেন, তাতে কতজনকে গোমরাহির (আপনার মতানুসারে) পথ থেকে ফিরে আনতে পেরেছেন? কতজনের ঈমানকে হেফাজত করতে পেরেছেন?
দেখুন, প্রত্যেক মানুষের বিশ্বাস, দর্শন, চিন্তা তিলে তিলে নির্মাণ হয়। আপনার একটা মাত্র স্ট্যাটাসেই সেই নির্মাণ ভেঙ্গে পড়ে না। বড়জোড় একটা নাড়ানি খায়। কিন্তু তার গাঁথুনি তাকে আবার সোজা করে দেয়। এভাবে কাউকে আপনার চিন্তার মুসাফির বানাতে পারবেন না মশাই।
আপনার এক জ্ঞাণগর্ভ স্ট্যাটাসে বুঝলাম, বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করে মারাত্মক ভুল করেছি। তো? আমি আগামীকাল মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে যাবো? ধরে নিলাম, আমি একটা সংগঠনের কর্মী হয়ে সব আমল বরবাদ করে ফেলেছি। তো? আপনার অসাধারণ পোষ্ট আর সমালোচনায় আমি সেই সংগঠন থেকে আগামীকাল পদত্যাগ করে আপনার দলে যোগ দিব?
এটা হারাম, ওটা বিলকুল হারাম, এটা করতে হবে, ওটা করা যাবে না -বলে কি দারুণ দারুণ রেফারেন্স দিচ্ছেন। ভেবে দেখেছেন, তাতে আল্টেমিটলি কী হয়েছে? হ্যাঁ, বলবেন- আপনি আপনার ঈমানী দায়িত্ব পালন করেছেন। ঈমানী দায়িত্বের ব্যাপারটা আপনার মতো করে তৈরি করে নিলেই, সবাই আপনাকে আমীর মানবে-এমন ভাববেন না প্লিজ। ঈমানী দায়িত্ব বলে আপনি যা খারিজ করছেন, আরেকজন তা পালন করাকেই ঈমানী দায়িত্ব মনে করছেন। আপনি খারিজ করলেই ঈমান থাকবে না- ব্যাপারটা কিন্তু এতো সরল নয়।
তন্ত্র, মন্ত্রের বিরুদ্ধে কথা বলতে বলতে নিজেই কীসব তন্ত্রের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছেন, সেটা টের পান না ভাই। অন্যকে জাহান্নাম থেকে বাঁচানোর সাথে সাথে নিজের ব্যাপারটাও মাঝেমাঝে চেক করে দেখা দরকার। জান্নাতের সোল এজেন্সি আপনার কাছে নাই, রাব্বুল আলামীনের কাছে। এমনভাবে কথা বলবেন না, একমাত্র আপনিই হেদায়েতের চূড়ায় উঠেছেন।
আপনি যেভাবে নির্মাণ হয়েছেন, সেভাবে দ্বীনের খেদমত করতে থাকুন। আল্লাহর সাহায্য পাবেন নিশ্চয়। নিজের অবস্থান, ফিলোসফি ও চিন্তার ব্যাপারে সবসময় রাব্বুল আলামীনকে বলা দরকার- রাব্বানা লাতুজিগ কুলূবানা বা'দা ইজ হাদাইতানা।
আপনার চোখে ভুল মানেই আল্লাহ্ তায়ালার চোখে ভুল- এমন জাজমেন্ট দিয়ে বসবেন না। সত্যিকারার্থে কাউকে দ্বীনী পেরেশানি থেকে সংশোধন করতে চাইলে, ইহতেসাবের নিয়ম-পদ্ধতি মেনে পরম মমতায় আয়না হয়ে কথা বলুন।
কাউকে চ্যালেঞ্জ করে শুধরে দেয়া যায় না। বরং, তাতে গোমরাহির পথ আরও বেশি উন্মুক্ত হয়ে যায়। আল্লাহ্ তায়ালার কাছে যেন কেউ এই বিচার না-দেয়, এই লোকটার কারণে আমি গোমরাহির দিকে চলে গেছি।
আমি একটা মূলনীতি মেনে চলি। আল্লাহ্ তায়ালাকে যিনি রব হিসেবে মেনে নিয়েছেন, রাসূল সাঃ যিনি নেতা হিসেবে মেনে নিয়েছেন, যিনি ঈমানের বেসিক কন্ডিশন মেনে নিয়েছেন- তিনি আমার ভাই, তিনি আমার বোন। মাযহাব, মানহায, দল- যাই ই হোক। আমি প্রত্যেক ঈমানদারকে আল্লাহর রাহে ভালোবেসে যাবো।
এই পৃথিবীতে আর কটা দিন থাকবো। ঈমানের দাবি মেটাতে অন্য কারও দিকে কামান দাগানোর কাজে সময় ব্যয় করতে চাই না। রবের দুনিয়ায় কতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাকি এখনো!
দৃষ্টির দরজা খোলা রেখেছি। সমালোচনাকারিদের তীরকেও পজেটিভলি নিবো। কারও সমালোচনা পেয়ে পড়াশোনা করে যদি মনে হয়, অভিযোগ সত্য; তাহলে তওবার পথ তো আল্লাহ্ তায়ালা খোলা রেখেছেন।
বোঝাপড়াটা আল্লাহ্ সুবহানাহু তায়ালার সাথে; দুনিয়ার কোনো প্রেসক্রিপশনের সাথে নয়।
আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন আমাদের হৃদয়ের বক্রতা দূর করে দিন। মুসলিম উম্মাহর হৃদয়গুলোকে এক সূতোয় বেঁধে দিন