ছোটবেলায় আমরা পাঠ্যবইয়ে পড়েছি গ্রহ ৯টি। এরপর ২০০৬ সালে প্লুটোকে গ্রহের তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়। নেপচুন আবিষ্কার হয়েছিল ১৮৪০এর দশকে। নেপচুন আবিষ্কারের পর এর গতি পর্যবেক্ষণ করে নবম একটি গ্রহের অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনা অনুমান করা হয় উনিশ শতকে। অজানা বলে গ্রহটির নাম দেওয়া হয় প্লানেট X, কেউ কেউ বলেন প্লানেট নাইন। ১৮৯৪ সালে ধনী ব্যবসায়ী পারসিভাল লয়েল আকাশ পর্যবেক্ষণের জন্য অ্যারিজোনায় লয়েল অবজারভেটারি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯০৬ সাল থেকে এই নবম গ্রহটিকে খুঁজে বার করার চেষ্টা শুরু করা হয়।১৯০৯ সাল নাগাদ গ্রহটি সম্ভাব্য কয়েকটি অবস্থানের ঘোষণা করার পর, এটি তখনও পর্যবেক্ষণ করা যায়নি। ১৯১৬ সালে গ্রহটিকে সনাক্ত না করেই তিনি মারা যান। তবে তার অজান্তেই ১৯১৫ সালে তার তোলা দুটি ছবিতে প্লুটোকে অস্পষ্ট ভাবে দেখা যায়। এরপর ১৯২৯ সালে তার স্ত্রী এর উদ্যোগে এক জ্যোতির্বিজ্ঞানী কে গ্রহটিকে খোঁজার কাজে নিয়োগ করা হয়। বছরখানেক পর্যবেক্ষণের পর ১৯৩০ সালে এ ধরনের একটি গতি শনাক্ত করেন, আরও কিছু পরীক্ষা শেষে নিশ্চিত হওয়ার পরেই এ নতুন আবিষ্কার টিকে হার্বাট কলেজ অবজারভেটারিতে প্রেরণ করা হয়। নতুন গ্রহটির আবিষ্কারের পড়েই সারা বিশ্বে হইচই পড়ে যায় । বড় বড় সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে পরিণত হয়।
প্লুটো গ্রহের নামকরণ এর ইতিহাস
হাজারেরও বেশি নামের প্রস্তাবনা শেষে এই গ্রহের নামকরণ করা হয় প্লুটো মানে পাতালের দেবতা। এক এগারো বছর বয়সী বালিকা এই নামটি প্রস্তাব করেন। তিনি নামটি প্রথমে তার দাদার কাছে উত্থাপন করেন তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি লাইব্রেরীইয়ান ছিলেন। তিনি আবার এই নাম জ্যোতিষ বিদ্যার অধ্যাপকের কাছে হস্তান্তর করেন। লয়েল অবজারভেটারিতে এই নামটি সহ মোট তিনটি নামের মধ্যে থেকে ভোটাভুটির মাধ্যমে প্লুটো নামটি নেয়া হয়।
প্লুটোর ভর নির্ণয়ের ইতিহাস
প্রাথমিকভাবে এই প্লানেট X এর যে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল তখন তার ভর ধরা হয়েছিল অনেক বেশি। কিন্তু প্লুটো আবিষ্কারের পর এর গতি বৃদ্ধি এবং অস্পষ্টতা দেখে সন্দেহ করা হয়। যে এটি পূর্বের অনুমানকৃত প্লানেট X নয় বরং এটি অন্য একটি গ্রহ। জ্যোতির্বিদগণ প্রাথমিকভাবে এর ভর নির্ণয় করেছিলেন নিকটবর্তী কোন দুটি গ্রহ নেপচুন ও ইউরোপের কক্ষপথের উপর এর প্রভাব পর্যবেক্ষণ করে।১৯৩১ সালের প্লুটো ভর নির্ণয় করা হয় পৃথিবীর ভর এর কাছাকাছি ।পরবর্তীতে আরো মেজারমেন্ট এর মাধ্যমে ভর কমে যায় এবং মঙ্গল গ্রহের কাছাকাছি নির্ণীত হয়।১৯৭৬ সালে প্লুটো এর বর্ণালী পর্যবেক্ষণ করে ধারণা করা হয় এরপর পৃথিবীর ভরের ১ শতাংশের বেশি হবে না। আর তারপর ১৯৭৮ সালে প্লুটো এর চাঁদ আবিষ্কৃত হলে। এরপর ভর যথাযথভাবে নির্ণয় করার পথ খুলে যায়। বিভিন্ন হিসেবে দেখা যায় এরপর ভর হবে পৃথিবীর ভরের মাত্র শূন্য দশমিক ২ শতাংশ। এত সামান্য ভর নিয়ে প্লুটোর পক্ষে ইউরোপের গ্রহের কক্ষপথের প্রভাব বিস্তার করা দুষ্কর। তাই ধারণা করা হয় প্লানেট X গ্রহটি এখনও আবিষ্কৃত হয়নি। যদিও তা বিদ্যমান আছে প্লুটো ২৪৮ বছরে একবার সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে।
প্লুটোর কক্ষপথ
এর কক্ষপথের বৈশিষ্ট্য অন্যান্য গ্রহের তুলনায় যথেষ্ট আলাদা। প্লুটো ব্যতীত অন্য আটটি গ্রহ সূর্যকে একই সমতলে থেকে প্রদক্ষিণ করে। অপরদিকে প্লুটো অন্য গ্রহ গুলোর ব্যতিক্রম হিসেবে সমতলের সাথে ১৭ ডিগ্রি কোণ করে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। তা ছাড়া অন্যান্য গ্রহ গুলোর কক্ষপথ গোলাকার আর প্লুটোর কিছুটা উপবৃত্তাকার। এই বৈশিষ্ট্য কারনে প্লুটোর কক্ষপথ নেপচুনের কক্ষপথের সাথে সাংঘর্ষিক। তবে তারপরও প্লুটো নেপচুনের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় না। এর কারণ হচ্ছে প্লুটো ও নেপচুনের বৃত্তাকার গতি ঐক্যতানে আছে ।১৯৯২ সাল থেকে বিভিন্ন প্লুটোর এলাকায় অর্থাৎ এটি সূর্য থেকে যে দূরত্বে অবস্থান করে সেখানে আরও কিছু বস্তু আবিষ্কৃত হতে থাকে। যেগুলো আকার-আকৃতিতে প্লুটোর সাথে তুলনীয় এই বস্তুগুলো সমেত অঞ্চলটিকে এখন কুইপার বেল্ট নামে ডাকা হয়। এধরনের আবিষ্কারের ফলে গ্রহ হিসাবে প্লুটোর মর্যাদা বিতর্কিত হয়ে পড়ে।অনেকেই প্রশ্ন রাখেন ওর মতো আরো বিভিন্ন বস্তু যেহেতু পাওয়া যাচ্ছে সেহেতু এটি ওই বস্তুগুলো হতে আলাদা করা ঠিক হবে কিনা। প্লুটোকে যদি গ্রহোর মর্যাদা দেওয়া হয়। তাহলে সেই বস্তুগুলো কেও তো মর্যাদা দিতে হবে। এই সময়টিতে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াই অনেক ক্ষেত্রে জাদুঘর কিংবা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে পরিচালকগণ প্লুটো গ্রহের মডেল বাইরে রেখে একটি বিতর্কের জন্ম দেয়।২০০০ সালের মধ্যে কুইপার বেল্টে বেশ কিছু বস্তু আবিষ্কৃত হয়ে যায়।
কোন বস্তুকে গ্রহ বলতে হলে এই ৩ টি শর্ত মানতে হবে
এমতবস্তায় কোন কোন বস্তুটিকে গ্রহ এবং কোন বস্তুটিকে গ্রহ বলা হবে না তা নির্ধারণ করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এর আগে গ্রহের কোনো সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা ছিল না। তাই বেশ কিছু গ্রহ সদৃশ বস্তু কে নিয়ে বিতর্ক লেগেই ছিল। এই অবস্থার অবসান এর জন্য ২০০৬ সালের ২৪শে আগস্ট জ্যোতির্বিদদের একটি সম্মেলন আই এ ইউ রেজুলেশন অনুযায়ী গ্রহের সংজ্ঞা নির্ধারণ করে দেয়া হয়। এ শর্ত পত্রের আওতায় সৌরজগতের একটি বস্তুকে গ্রহ হতে হলে
১ একে সূর্যের চারদিকে ঘুরতে হবে।
২ একে যথেষ্ট পরিমাণ ভারী হতে হবে যেন নিজের মাধ্যাকর্ষণের টানে এটি গোল আকার ধারণ করতে পারে। আরও যথাযথভাবে এর নিজস্ব মাধ্যাকর্ষণ এটিকে এমন আকৃতিতে পরিণত করবে যেন তা হাইড্রোস্ট্যাটিক সাম্য অবস্থায় থাকে।
৩ এর কক্ষপথটি অন্যান্য গ্রহের কক্ষপথ থেকে আলাদা হতে হবে যদি দুটি বস্তুর কক্ষপথ পৃথক না হয় বা একটির কক্ষপথ অপরটির ভেতরে ঢুকে পড়ে তাহলে অপেক্ষাকৃত বেশি ভরের বস্তুর গ্রহের মর্যাদা পাবে।
প্লুটো এই তিনটি শর্তের মধ্যে তৃতীয় টি পূরণ করতে ব্যর্থ হয়। প্লুটোর কক্ষপথ স্বতন্ত্র নয় বরং এটি এর কক্ষে আবর্তন কালে নেপচুনের কক্ষের মধ্যে ঢুকে পড়ে। অর্থাৎ কক্ষপথের আবর্তন কালে একপর্যায়ে এটি নেপচুনের চেয়েও সূর্যের কাছাকাছি অবস্থান করে এবং এর অবস্থান হয় নেপচুন এর আগে। কিন্তু নেপচুনের ভরের তুলনায় প্লুটোর ভর অনেক অনেক অংশে কম হওয়ায় গ্রহ মর্যাদা নেপচুনের পাওয়ার কথা প্লুটোর নয়। আই এ ইউ আরো নির্ধারণ করে দেয় যে প্লুটোর মতো অন্য যেসব বস্তু কেবল গ্রহের সংখ্যার ১,২ নাম্বার শর্ত পূরণ করতে পারবে তাদের বামন গ্রহ বলা হবে। এভাবে প্লুটো গ্রহের তালিকা থেকে বাদ পড়ে যায়।