রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মজিজ্ঞাসা- প্রথম দিনের সূর্য, কবিতার পুনর্পাঠ

Words
549
Reading
3 min
Listen
Play
6y

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামকরণ করেছিলেন.. যতটুকু জানা যায়.. তার দাদা ঠাকুর। উনাকে ধন্যবাদ দিতেই হয়.. একেবারে সার্থক নামকরণ.. বাংলা সাহিত্যের রবি এবং ইন্দ্র.. যাই বলি না কেন.. সেটি রবীন্দ্রনাথ। তাকে বাদ দিয়ে বাংলা সাহিত্যের আলোচনা প্রায় অসম্ভব।

একটা কবি কতটা জনপ্রিয় হলে.. তার পরবর্তী কবিদেরকে কয়েক দশক পর্যন্ত শুধুমাত্র তার প্রভাব কাটিয়ে ওঠার জন্য সংগ্রাম করতে হয়.. রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে তাই হয়েছে। তিরিশ দশক পর্যন্ত ছিল বাংলা সাহিত্যে কবিতা চর্চার ক্ষেত্রে সবাই একমাত্র সংগ্রাম করত রবীন্দ্রনাথের প্রভাব কাটানো..যেই কাজে সফলতা তাকেই কবি হিসেবে সাহিত্যের স্বীকৃতি দেওয়া হতো.. মাত্র অল্প কয়েক জন সফল হয়েছিল।

বাংলা ভাষার প্রথম নোবেল বিজয়ী কবি.. এবং একমাত্র নোবেল বিজয়ী কবি তিনি। বাইরের দেশে বাংলা ভাষাকে ব্র্যান্ডিং করেছেন তিনি.. এমনকি এখনও.. অনেক দেশের মানুষ বাংলা বলতে রবীন্দ্রনাথকেই বুঝে।

তার একটি বিখ্যাত কবিতা প্রথম দিনের সূর্য নিয়ে আজ আলোচনা করব।


কবিদের ক্ষেত্রে সাধারণত দেখা যায়.. প্রথম জীবনে তারা পরীক্ষা-নিরীক্ষায় বেশি আগ্রহী হন.. কিন্তু শেষ জীবনে তারা একটা নির্দিষ্ট স্থান গ্রহণ করে, সেই ধাচে কবিতা সাহিত্য রচনায় সচেষ্ট থাকেন.. যেটি আমরা বিখ্যাত কবি শামসুর রাহমান কিংবা জসীমউদ্দীনের ক্ষেত্রে দেখেছি।

কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ব্যতিক্রম.. তিনি মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত কবিতার আঙ্গিক এবং বিষয়বস্তু নিয়ে ক্রমাগত নিরীক্ষা চালিয়ে গিয়েছেন.. যার ফলে বার্ধক্য তার লেখনিকে গ্রাস করতে পারে নি.. বিশেষ করে শেষ দশকে তিনি জীবনের সবচেয়ে বেশি নিরীক্ষাধর্মী লেখা লিখেছেন।

তার মৃত্যুর পর শেষ জীবনের লেখা কবিতাগুলো সংগ্রহ করে শেষ লেখা নামে একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়.. যেখানে এক অসাধারণ কবিতা প্রথম দিনের সূর্য জায়গা করে নেয়।

খুব ছোট্ট একটি কবিতা.. কিন্তু তার গভীরতা.. এবং জীবনবোধের প্রাসঙ্গিকতা অতি ব্যাপক। আসুন আগে কবিতাটি একবার পড়ে নিন..

প্রথম দিনের সূর্য
প্রশ্ন করেছিল
সত্তার নতুন
আবির্ভাবে
কে তুমি?
মেলেনি উত্তর।
.
বৎসর বৎসর চলে গেলো।
দিবসের শেষ সূর্য
শেষ প্রশ্ন উচ্চারিল
পশ্চিম সাগর তীরে
নিস্তব্ধ সন্ধ্যায়
কে তুমি?
পেলো না উত্তর।
(প্রথম দিনের সূর্য, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

images 51.jpeg

কবিগুরুর শেষ জীবনের কবিতাগুলোতে জীবন জিজ্ঞাসা এবং ঐশ্বরিক অনাস্থা দেখতে পাওয়া যায়.. প্রথম দিকের সাথে শেষ দিকে তার কবিতাগুলোর মোটাদাগে পার্থক্য এটাই যে- প্রথম দিকের কবিতাগুলোতে তিনি ঈশ্বরকে উদ্দেশ্য করে স্তুতি বাক্য রচনা করতে বেশি উৎসুক ছিলেন.. আর শেষ দিকের কবিতাগুলোতে তিনি ঈশ্বরকে চিনতে, জানতে এবং প্রশ্ন করতে বেশি প্রয়াসী হন।

শেষ দিকে তিনি কিছুটা সংশয়বাদী হয়ে গিয়েছিলেন.. যেটা তার আরো কিছু কবিতায়ও পরিলক্ষিত হয়.. ঠিক যেমন এই কবিতাটিতে হয়েছে।

কে তুমি? - এই একটি প্রশ্নের মধ্যেই অনেক বড় একটি জীবন জিজ্ঞাসা জড়িত.. কবি আসলে ঈশ্বরকে প্রশ্ন করছেন, না সূর্যকে প্রশ্ন করছেন? না নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করছেন? এই সূর্য কখনো ধরা দিচ্ছে ঈশ্বরের হিসেবে.. কখনো মহাকাল.. কখনো বা আমাদের আত্মা হয়ে সামনে দাঁড়াচ্ছে। আর আমরা তখন নিজেকেই প্রশ্ন করছি- কে আমি?
images 52.jpeg

মনে পড়ে যায় সক্রেটিসের সেই বিখ্যাত উক্তি- নিজেকে জানো.. নিজেকে জানার চেষ্টা মানুষের অনেক পুরাতন। মনীষীরা বারবার বলেছেন- নিজেকে জানো.. নিজেকে খোঁজো.. নিজের মধ্যেই তুমি স্রষ্টাকে খুঁজে পাবে..

কিন্তু আমরা কতটুকু নিজেকে জানতে পারি? সেজন্য জীবনের শেষ মুহূর্তে এসে আবার থমকে দাঁড়ালেন কবি.. প্রথম দিনের সূর্য.. মনে হয় যেন এটি আসলে কবি লিখতে চেয়েছিলেন- প্রথম দিনের রবি.. সূর্য শব্দটি যে কবির নামেরই আরেকটি প্রতিশব্দ।

কবি যেন নিজেকে সূর্যের‌ আড়ালে নিয়ে এসেছেন রূপক ভাবে.. তবে কি কবি প্রথম জীবন থেকেই প্রশ্ন করতেন নিজেকে- সত্তার নতুন আবির্ভাবে, কে তুমি?

তাহলে তো কবি এখনো পান নি কোনো উত্তর.. এই উত্তর পাওয়া সহজ নয়.. একটি ছোট্ট প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সাধকগন বছরের পর বছর সাধনা করে যান.. তবু পথ খুঁজে পান না।

তাই দিবসের শেষ সূর্য.. অর্থাৎ শেষ জীবনের রবি বাবু.. আবার নিজেকে যখন প্রশ্ন করছেন.. তখনও অপরপক্ষ নিরুত্তর থেকে যাচ্ছে.. কোন উত্তর ফিরে আসছে না।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মজিজ্ঞাসা- প্রথম দিনের সূর্য, কবিতার পুনর্পা... | Ecency