শিক্ষা ও চাকরির ইতিবৃত্ত :বাংলাদেশ প্রেক্ষিত

Words
1021
Reading
5 min
5y

আসসালামু আলাইকুম, বন্ধুগন। সবাই কেমন আছেন? আশা করি সুস্থ ও প্রফুল্ল আছেন সবাই💖💗🙂।সবসময় ভালো থাকুন ও ফুরফুরে মন বজায় থাকুক এই কামনা করি।

  ★উপক্রম :

আজ, গত পোস্টের ধারাবাহিকতায় যে যেই নিত্যদিনের সমস্যাগুলো আমরা মুখোমুখি হই, বিশেষ করে ছাত্র থাকাকালীন, তার বাস্তবিক বর্ণনা দিয়েছিলাম। আজ ঐ বিষয়গুলোর উত্তরন ও সমাধানের উপায় লেখার একটি ক্ষুদ্র প্রয়াস চালাবো। আশা করি আপনারা আমার সাথেই থাকবেন 🙂

photo-1567168544813-cc03465b4fa8.jpeg
Source

★ ঘটনা প্রবাহ :
বাংলা ভারতবর্ষের মধ্যযুগীয় পিরিয়ডে (১৫০০-১৭৫০ খ্রীস্টাব্দে)যদি যুবক বয়সী নব্য তরুণদের জীবন জীবিকা বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখতে পাওয়া যায়, সে সময়ের অধুনা জ্ঞানবিদ্যায় শিক্ষিত- স্বল্পশিক্ষিত তরুনরা হয়তো রাষ্ট্রীয় কোনো ট্যাক্স কালেক্টর, প্রশাসনিক পদ,শিক্ষক, পত্রিকায় সম্পাদনা,ব্যবসা পরিচালনা, ক্ষুদ্র কুটির ও মাঝারি শিল্প, রাজপন্ডিত, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ইত্যাদি ক্ষেত্রে জীবিকা নির্বাহ করতো, কিন্তু ব্রিটিশদের আগমনে পুরো ভারতবর্ষের চেহারা পাল্টাতে থাকে।
এ সময় ইউরোপীয় কলোনিকরনের ফলে বেনিয়াদী শক্তি এ দেশে ঢুকে পড়লে তারপর শুরু হয় ইংরেজী পাশ্চাত্য ঢংয়ের লেবাসে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সজ্জা এবং ইংরেজ অনুকরন। ব্রিটিশরা যে শুধু এ দেশে শোষনই করেছে তা নয়, বরং পুরো ইউরোপীয় আধুনিকায়ন আর নতুন প্রযুক্তিগত বিকাশের সৃষ্টিশীল উদ্ভাবনরীতি এদেশে চালু করে। এদেশের স্থায়ী বদ্ধমূল মান্ধাতার আমলের টোলের পাঠনরীতি রদ করে নতুন পাঠ্যসূচী ও শিক্ষায় সংস্কার করে বৈশ্বিক যোগাযোগের আন্তর্জাতিকীকরন, হান্টার কমিশন গঠন, রামমোহন-সলিমুল্লাহ-রোকেয়া-ঈশ্বরচন্দ্র,মানিকচন্দ্র,মহসীনদের তৎপরতায় এদেশে নতুন শিক্ষার দ্বার উন্মোচন হয়।

Jawaharlal-Nehru.jpg
Source
এ সময় আমাদের মতো তরুণরা যারা ভালো রকমের ইংরেজি জানতো, শুদ্ধভাবে ভাষান্তর করতে পারতো তারা ইংরেজ লাটদরবারে আপিসে নিয়োগ পেত। রাজস্ব, ইংরেজদের সাথে চুক্তিপত্র, রাজনৈতিক বিষয়ে সাহায্য করতো।
টেকনিক্যাল ক্ষেত্রে যেমন মেডিক্যাল কলেজ, ইন্জিনিয়ারিং কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আধুনিক অনুষদ গঠন করে যুগোপযোগী শিক্ষা নিশ্চিত করে ইংরেজরা।

ঐ সময়ের নামিদামী শিক্ষাবিদদের, বুদ্ধিজীবিদের পরামর্শে গড়ে ওঠে সরকারি চাকুরিজীবিদের নিয়োগের একমাত্র প্রতিষ্ঠান যেটাকে বলা হতো 'The British Raj Civil Service '.।
এখানে ইংরেজ আমলা ও সরকারি কর্মকর্তা সিলেক্ট করা হতো। তারপর, পাকিস্তান ও নবগঠিত বাংলাদেশে ঐ ইংরজদের ঠিক করে দেওয়া পদ্ধতিকেই অনুসরন করে সিভিল সার্ভিস ক্যাডার পদবি তৈরি করা হয়।
★মুখ্য প্রসঙ্গ :

যা হোক, গত ব্লগে বলেছিলাম যে আমাদের দেশে সরকারি চাকুরি একটি অমাবস্যার চাঁদের মতো দুর্লভ একটি জিনিস। কেননা, প্রতি বছর প্রায় ৫ লাখের মতো গ্র্যাজুয়েটরা প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় বসে। এর মধ্যে বাছাই করে ২০০০ পদের জন্য যোগ্যরা নির্বাচিত হন। তারপর পাবলিক সার্ভিস কমিশন থেকে গেজেট আকারে যোগ্যদের সুপারিশ আসে।

★প্রস্তুতি পরিকল্পনা ও সমন্বিত অধ্যয়ন বিন্যাস :

বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন সময়ে যতটুকো সময় হাতে পাওয়া যায় তার মধ্যে একাডেমিক পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে মূলত বিসিএস পরীক্ষাটাকে কেন্দ্র করে নিজের প্রস্তুতি ঝালাই করে নেয়া বুদ্ধিমানের কাজ। কারন, গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার পর হাতে সময় তেমন একটা থাকে না। তাই এই বিস্তর পরিসরের জ্ঞান আয়ত্তে আনা স্বল্প সময়ে সম্ভব হয়ে ওঠে না।

photo-1535982330050-f1c2fb79ff78.jpeg
Source
★প্রিলি প্রস্তুতি : সুষম পঠন পদ্ধতি -

বিসিএসের জন্য যে ২০০ নম্বরের এমসিকিউ পরীক্ষাটা হয় ঐটা সব সেক্টরের জন্যই খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
যেহেতু চাকরির পরীক্ষাগুলোতে কোনো ধরাবাঁধা সিলেবাস হয়না, তাই যত বেশি পারা যায়, তত বেশি জ্ঞান আহরন করতে হবে। বাংলা সাহিত্য, ইংরেজি সাহিত্যের বই, ইতিহাস আশ্রয়ী বই, পত্রিকা, গবেষণা গ্রন্থ পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। এভাবে নিজের একটি ব্যক্তিগত লাইব্রেরি তৈরি করতে হবে যেখানে বিসিএসের জ্ঞানপ্রণালীতে সাহায্য করে এমন বই সংগ্রহশালায় স্থান দিতে হবে।
🍥বাংলা :
১.ভাষাগত জ্ঞান ও ইতিহাস :
২.ব্যকরন ও মুসলিম বঙ্গীয় সাহিত্য এবং চর্যাপদ, মঙ্গলকাব্য,আধুনিক সাহিত্য,
৩.বাগধারা, প্রবাদ প্রবচন, নির্মিতি।

🍥ইংরেজি :
১.ইংরেজি সাহিত্য, ভাষাগত জ্ঞান,
২.গ্রামার অংশ, phrase idioms, inclusive grammar,
৩. প্রশ্ন আলোচনা, শেক্সপিয়ার, ইয়েট্স, বার্নার্ড শ, হোমার, লংফেলো ওয়ার্ডসওয়ার্থ, গ্ল্যাডস্টোন,ইলিয়ট, শেলি, মিল্টন ইত্যাদি লেখকের বই ও সাহিত্য,
৪.ভালো একটা ডিকশনারী প্রতিদিন পাঠ করা খুব উপাদেয় হয় এক্ষেত্রে। কারন, প্রতিটি শব্দের সঙ্গে সংযোজিত টিকা টিপ্পনী ও বাক্যে প্রয়োগ জানা থাকলে ভালো মানের কার্যকরি ও চলনসই স্পিকিং সক্ষমতা অর্জন করা সম্ভব। এ দিকটা প্রতিদিন অভ্যাস করতে হবে।

🍥সাধারণ জ্ঞান :
১.বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলীর মৌলিক বিষয় সম্পর্কে ধারনা। প্রথমে যেকোনো ভালো একটি সাধারণ জ্ঞানের বড় ভলিউমের বই থেকে অল্প অল্প করে মনে রাখার মতো করে এ বিষয়টিতে দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির খবরাখবর, বিভিন্ন চুক্তি, সাল,বিশ্বযুদ্ধ, জাতিসংঘ, রাজধানী,মুদ্রা, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নোট করতে হবে। বিভিন্ন সংঘ, জীবনি, দেশ মহাদেশ পরিচিতি, প্রণালি, টানেল, নদনদী ইত্যাদি বিপুল তথ্য মনে ধারন করার চেষ্টা করতে হবে। কিছুদিন পরপর রিভিউ করা অপরিহার্য। এমসিকিউ অংশে ভালো করার চেষ্টা করতে হলে অনুশীলনে জোর দিতে হবে বেশি।
পড়ার রূমে অনেক নোটখাতা রাখবেন যেখানে শুধু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়ে ঠাসা থাকবে।

নবম দশম শ্রেণির গণিত বই আর প্রশ্নব্যাংক এর উত্তর মেলানোর চেষ্টা করবেন। গণিত বিষয়ে সাধারণত সুদকষা, লাভক্ষতি,মুনাফা আসল, বিনিয়োগ, পার্সেন্টেজ,পাটিগণিত, বীজগনিত,ত্রিকোণমিতি ইত্যাদি সম্পর্কে জানতে হবে।উচ্চতর গনিত অধ্যয়নের প্রয়োজন নেই।

গ্র্যাজুয়েশনের আগ পর্যন্ত শুধু প্রিলি পরীক্ষার প্রস্তুতি গ্রহন করা যথেষ্ট। কারন এ প্রথম ধাপে পার হয়েই পরবর্তী ধাপে অর্থাৎ রিটেনে ৯০০ নাম্বারের জন্য প্রস্তুতি নিতে হয়। রিটেনের জন্য অনেক লেখার অভ্যাস তৈরি করতে হবে। এমনভাবে নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে যেন যেকোন বিষয়ে, যেকোন টপিকে শুদ্ধভাবে, তথ্য উপাত্তসহ ২ পৃষ্ঠা বাংলা ও ইংরেজিতে লিখতে পারা যায়। এ ব্যাপারে ব্লগ ও কলাম লেখা সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

জাতীয় দৈনিক কিছু পত্রিকা পড়লে সুডোকো, শব্দধাঁধা, রহস্য সমাধান ইত্যাদি কনটেন্ট বিসিএস মানসিক দক্ষতা অংশের জন্য আগাম প্রস্তুতি গ্রহন করা হয়ে যাবে।তাছাড়া সাধারন বিজ্ঞান অংশের জন্য মৌলিক কিছু জ্ঞান অর্জন করতে হবে যা নবম দশম শ্রেণির পদার্থ, রসায়ন, জীববিজ্ঞান বই পড়লে অনেকটা ধারনা চলে আসবে।এ দিক দিয়ে বেসিক ক্লিয়ার থাকলে আপনি অনেক ধাপ এগিয়ে যাবেন।

প্রিলির জন্য সংক্ষিপ্ত আকারে অনেক কিছু একসাথে জানতে হবে, আয়ত্ত করতে হবে। এ অংশের জন্য অল্প জ্ঞান আর বিবরণী মনে রাখলেই চলবে।কিন্তু, লিখিত পরীক্ষায় ঐ বিস্তর জিনিসের ডিটেইলস জানার চেস্টা চালাতে হবে।তবে আমি মনে করি, গ্র্যাজুয়েশনের পরই লিখিত অংশের প্রস্তুতি গ্রহন করা উচিত,তার আগে নয়।গ্র্যাজুয়েশনের পর পরবর্তী ১ বছর ৫-৬ ঘন্টা ধরে দৈনিক বিভিন্ন বিষয়ে লিখতে হবে। এতে করে সৃজনশীল লেখনির বিকাশ ঘটবে এবং উপস্থাপন দক্ষতা বাড়বে যা লিখিত পরীক্ষার সবচেয়ে দরকারি ফ্যাক্টর।

images.jpeg
Source
এবার আসি ভাইবা অংশের জন্য কিভাবে প্রস্তুতি নিবেন। মূলত, ভাইবার জন্য মানসিকভাবে নিজেকে তৈরি করতে হবে, ইতিবাচক মনোভাব, স্মার্ট ব্যবহার, হাসিখুশি মন, কথা বলার সাবলীলভাব অর্জন করা, উপস্থাপন দক্ষতা, ভদ্রতা-বিনয় প্রদর্শন, সাম্প্রতিক বিষয় সম্পর্কে, নিজের অনার্সের বিষয়, নিজ জেলা ও জেলার বিখ্যাত মানুষদের সম্পর্কে ধারনা রাখা, ভৌগোলিক দিক সম্পর্কে জ্ঞান, দেশের অর্থনীতি,রাজনীতি,পলিসির মৌলিক জ্ঞান রপ্ত করতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন বিভিন্ন ডিবেট, সেমিনার ও বিতর্কে অংশগ্রহন করে যুক্তিবাদী মনন তৈরি করতে পারলে মৌখিক পরীক্ষায় ইন্টারভিউতে কাজে আসে।

সর্বোপরি, বই পড়ার ভালো অভ্যাস ,একটি জিজ্ঞাসু মন থাকলে,বিসিএস ও অন্যান্য চাকুরির পরীক্ষার প্যাটার্ন অনুসরন করলে আপনি অবশ্যই অন্যদের থেকে এগিয়ে থাকবেন।
মনে রাখবেন, আজ যদি নিজেকে প্রস্তুত করার জন্য একটু ধৈর্য্য ধরতে পারেন তাহলে ভবিষ্যৎ আপনাকে অবশ্যই পুরস্কৃত করবে।
সবাই ভালো থাকুন। আমি বিশ্বাস করি, তারুণ্য ঠিক একটা পথ বের করে নিয়ে আসবে।🙂🥰
আল্লাহ হাফিজ
ফি আমানিল্লাহ 👍✌️

শিক্ষা ও চাকরির ইতিবৃত্ত :বাংলাদেশ প্রেক্ষিত | Ecency