মেঘ দেখে কেউ করিস নে ভয়, আড়ালে তার সূর্য হাসে।
বাসায় নতুন শো-কেজ, আলমারি কিনার কিছুদিন পরে উষ্ণের কঠিন দিনগুলোর কথা মনে পরছিল যেই সময়ে তার কাপড় রাখার জন্য জায়গা খুজে পেত না। উষ্ণের নানি মারা যাওয়ার আগে যখন ছোট মামা আর নানা-নানির সাথে থাকতো তখন একটা ওয়ার্ড্রোবের মধ্যে তার নিজের একখানা ড্রয়ার ছিল যেখানে সে তার কাপড় গুছিয়ে আবার মাঝেমাঝে অগোছালো অবস্থায়ই রেখে দিত। নানি মারা যাওয়ার পর সে আরেক মামার বাসায় চলে গেল যেই মামা কে সে সবচেয়ে আপন মনে করতো যদিও এমনটা মনে করা নিছক বোকামি ছাড়া আর কিছুই ছিল না। তো সেখানে যাওয়ার পর উষ্ণের কাপড় কোথায় রাখবে সেটা ভেবেই পাচ্ছিল না উষ্ণ। হ্যা ঐ মামার বাসায় অনেকগুলো ফার্নিচার ছিল কাপড় রাখার জন্য, কিন্তু মামা-মামি আর ছেলেদেরও তো অনেক কাপড় আর তাছাড়া তাদের ঘরের ওয়ার্ড্রোব ব্যবহার করবে এমনটা চিন্তাও করতো না উষ্ণ। তবে টিভির রুমে একটা ফার্নিচার ছিল লম্বা করে যেটা মুলত খেলনা রাখার জন্যে হয়তো কিনা হয়েছিল কিন্তু এখানেও বিভিন্ন ধরনের কাপড় যদিও চাইলেই একটা থাক ফাঁকা করে সেখানে উষ্ণের কাপড় রাখা যায়। এমনটা ভেবে উষ্ণ তার মামি কে বললো, "মামি, এখানে আমাকে একটু জায়গা করে দিলে আমার কাপড়গুলো রাখতে পারতাম"।
মামিঃ না, এখানে রাখা যাবে না।
মামির সরাসরি না শুনে উষ্ণ আর কিছু বলতে পারলো না, পরে ছোট টিভির ট্রলির নিচের অংশে উষ্ণ কাপড় রাখলো যদিও সেটা নিয়ে মামি কোন আপত্তি দেখায় নাই আর আপত্তি দেখাবেই বা কেনো? ঐখানে অন্য কেউ কিছুই রাখবে না কারণ জায়গাটা ফ্লোরের কাছাকাছি, ঘর ঝাড়ু দিলে বাতাসে ধুলাগুলো ওখানেই যায়, তো তাদের দামি জিনিশপত্র তো আর ওখানে রেখে নষ্ট করা যাবে না। এই সুযোগে উষ্ণই জায়গাটা ব্যবহার করার সুযোগ পেল। ওখানে সমস্যা না থাকলে মনে হয় এই জায়গাটাও পেত না, তো সেই দিক দিয়ে উষ্ণ বড্ড ভাগ্যবান ছিল বলা যায়।
উষ্ণের সেই মামা-মামির খারাপ ব্যাবহার দেখে সেই বাড়ি ছাড়তে হয় আর সাময়িকের জন্য তার ছোট খালার বাসায় উঠে। এদিকে উষ্ণের একটা চাকুরি হয়ে গেছে আর সে একটা ব্যাচেলর সিট ভাড়াও নিয়েছে, কয়েকদিন পর মাসের শুরুতেই চলে যাবে ব্যাচেলর বাসায়। খালার বাসায়ও কাপড় রাখার তেমন জায়গা না দেখে বড় একটা ব্যাগের ভিতরেই উষ্ণের নানির রেখে যাওয়া কিছু স্মৃতিসহ নিজের কাপড় রেখে দিল আর ঐ ব্যাগ থেকেই বের করে করে ব্যবহার করতো। উষ্ণের মামা-মামি অনেক ভালো ছিল যে তারা ব্যাগ টা উষ্ণকে দান করেছিলো সাময়িক সময়ের জন্য।
কিছুদিন পর উষ্ণ তার ব্যাচেলর জীবন শুরু করলো যেখানে একটা রুমে একজন অপরিচিত লোকের সাথে থাকতে হবে, তবে বিছানা আলাদা। সুন্দর একটা খাট পেয়েছে দেখে তো উষ্ণ খুবই খুশি যদিও পরে বুঝতে পারলো যে খাটটা ভাঙা আর সেখানে ঘুমোলে শরীর খুব ব্যাথা করে। কোনমতে কয়েকটা দিন ঘুমিয়ে এরপর কমদামি একটা তোষক কিনে নিয়েছিল। তখনও কাপর রাখার কোন জায়গা ছিল না উষ্ণের। পরবর্তীতে রুম চেঞ্জ করার পর নতুন জায়গায় একটা কাঠের আলনা পেল যেখানে কিছুটা জায়গা পেয়েছে উষ্ণ কাপড় রাখার জন্য। সেখানে বেশ কিছুদিন থাকার পরে সে ঐ বাসাটা চেঞ্জ করলো বিভিন্ন সমস্যার কারণে। নতুন জায়গায় গিয়ে সেখাণে ফ্লোরেই কাপড় রাখতো। অল্প টাকা বেতন আবার প্রথম বেতন দিয়েই একটা ফোন কিনেছিল তাই হাতে টাকা ছিল না বললেই চলে। একমাস থাকার পর রুমে সমস্যার কারণে সেই রুমটাও চেঞ্জ করলো উষ্ণ আর নতুন জায়গায় অ্যাটাচ ওয়াশরুমসহ একটা রুম একাই ভাড়া করলো কারণ অন্যদের সাথে রুম শেয়ার করে সে কম্ফোর্ট ছিল না বেশ কিছু কারণে। নতুন জায়গায় গিয়ে খরচ আরো বাড়লো তার, কারণ রুম ভাড়া বেশি, একটা ফ্রিজ কিনেছে তাই বিদ্যুৎ বিলও বেশি। কাপড় রাখার জন্য এখনো কিছু কিনতে পারে নাই কারণ হাতে টাকা জমছিলই না। একদিন রাতে উষ্ণ হঠাৎ খেয়াল করলো, তার রুমের পাশাপাশি দুই দেয়ালের দুইটা জানালা খুবই কাছাকাছি। তো সে ঠিক করলো ঐ জানালার গ্রিলের সাহায্যে সে তার কাপড় রাখার জন্য একটা আলনার মতো কিছু বানাবে। তারপর সে অফিস থেকে আনা কেয়ার লেবেল দিয়ে বেধে একটা ব্যবস্থা করলো কাপড় রাখার আর ব্যাবস্থা টা কেমন
হয়েছিল তার উদাহরণ হিসেবে নিম্নের ছবি দেখা যেতে পারে।
হ্যা, এটা ছিল হাতে বানানো ৪ থাকের আলনা। ক্রিয়েটিভিটির কি লেভেল রে বাবা!!!
পরবর্তীতে এতটা প্লাস্টিকের ছোট র্যাক কিনবে এমনটা উষ্ণ তার গার্লফ্রেন্ডকে জানালো। ৬৫০ টাকা দামের জিনিসটাও যেন তখন উষ্ণের কাছে অনেক বড় কিছু ছিল কারণ তার হাতে তো টাকাই থাকতো না। উষ্ণের গার্লফ্রেন্ড র্যাক টা কিনে দিতে চাইলো কিন্তু উষ্ণ রাজি না হওয়ায় তাকে তার গার্লফ্রেন্ড জানালো যে কোন বান্ধবিদের এলাকায় নাকি এই জিনিসের দাম কম প্রায় ২০০ টাকা কম আর এটা শুনে উষ্ণ খুশি হলো। উষ্ণের গার্লফ্রেন্ড নিজে গিয়ে র্যাক কিনে এনে দিল আর ২০০ টাকা ছাড় দিয়ে বাকি টাকা টা উষ্ণ জোর করেই দিয়ে দিল যদিও উষ্ণ পরে জানতে পেরেছিল যে কোন ছাড় ছিল না, উষ্ণের টাকা কম দেওয়ানোর জন্য তার গার্লফ্রেন্ড এই মিথ্যার আশ্রয় টা নিয়েছিল। তো এরপর এই নতুন র্যাকেই কাপড় রাখা শুরু করলো উষ্ণ।
পরবর্তীতে তাও অনেক দেড়িতে হাতে টাকা আসার পর উষ্ণ একটা বড় ওয়ার্ড্রোব কিনলো। ৪ টা বড় বড় ড্রয়ার আবার একটা বড় সাইড ড্রয়ার। আজ উষ্ণের কাপড় মাটিতে পড়ে নেই বা ব্যাগের ভিতরেও নেই। পরবর্তীতে বিয়ের পর তার বউ নিজের কিনা প্লাস্টিকের ওয়ার্ড্রোবটাও নিয়ে আসে, তো তাদের বাসায় তখন ২টা ওয়ার্ড্রোব। এখন উষ্ণের ঘরে ২টা ওয়ার্ড্রোবে ৮ টা ড্রয়ার, শো-কেজ এ ৪ টা ড্রয়ার, নতুন আলমারিতে জায়গার অভাব নাই এমনকি ড্রেসিং টেবিলেও ২টা বড় বড় ড্রয়ার আছে। আজ উষ্ণের কাপড় রাখার জায়গার অভাব নাই আল্লাহর রহমতে। অনেক ড্রয়ার ফাকাও পরে আছে। এমন একটা সময়ে উষ্ণের স্কুলে পড়া সেই ভাব-সমপ্রসারণ টার কথা মনে পরে গেল, "মেঘ দেখে কেউ করিস নে ভয়, আড়ালে তার সূর্য হাসে..."।
মোরাল অফ দ্যা স্টোরিঃ কখনো ভেঙে পড়া যাবে না, মেঘের আড়ালে সূর্য আছে, আধারের পরে আলো আসবেই এটা মাথায় রাখতো হবে।
"সমাপ্ত | The End"
"Be Good, Think Good and Do Good"