শৈশবে ছোটো থাকা অবস্থায় চিন্তা করি বড় হলে না জানি কত সুখ অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য । কিন্তু বড় হবার পরে এখন প্রতিমুহূর্তে ফিরে যেতে চাই শৈশবে। শৈশবে মাথায় থাকে না কোন চিন্তা, সারাদিন খেলাধুলা আর হই হুল্লোড়ের মধ্যে কোন দিক দিয়ে সময় কেটে যায় কিছুই বুঝা যায় না। একটা সময় কৈশোর পেড়িয়ে কখন যে যৌবনে পা দিয়ে ফেলি বুঝতে পারিনা। তখন বুঝতে পারি সেই মহামূল্যবান সময় হারিয়ে গেছে মহাকালের গভীরে।
আমার শৈশব কেটেছে লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ থানার তুষভান্ডারে। জীবনের প্রথম সাতটি বছর আমি এখানে কাটিয়েছি। এই বয়সে খুব বেশি স্মৃতি মনে রাখা সম্ভব না। এরপরেও যতটুকু মনে আছে এটিই আমার জীবনের সবথেকে মধুর সময়। বাবার রিটায়ার্ডমেন্টের পরে ২০০০ সালে আমরা লালমনিরহাট ছেড়ে জয়পুরহাট চলে আসি। এরপরে আমার আর কখনো লালমনিরহাটে যাওয়া হয়নি।
আমি চার ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোটো। সবার আদরে থাকতাম সবসময়। বাবার সরকারি চাকরীর সুবাদে কোয়ার্টারে থাকতাম। আশে পাশে অনেক বিল্ডিং ছিল। মোটামুটি সব বিল্ডিং আমার বয়সী ছোট বাচ্চা ছিল। সকালে ঘুম থেকে উঠে খাওদাওয়া করে পাশে টি.এন.ও আঙ্কেলের বাশায় যেতাম। ওখানে তার ছোট ছেলের সাথে আমি ও আমার মেজ ভাই গাড়ি খেলতাম। ওর নাম সিজান। সিজানের অনেক ছোট ছোট গাড়ি ছিলো। ছাদের রেলিইং এর উপরে সেই গাড়ি নিয়ে খেলতাম আমরা। সেই সময় মনে হতো আসলেই গাড়ির ভিতরে আমি আছি এবং আমি নিজে চালাইতেছি। দিনের বেশিরভাগ সময় আমার আর ভাইয়ের সিজানের সাথেই কাটতো।
এর মধ্যে হঠাৎ একদিন স্কুলে ভর্তি করায় দিলো। আমি ছোট ওয়ানে আর ভাইকে বড় ওয়ানে। ছোট থেকেই স্কুলে যেতে চাইতাম না। এইজন্য বাড়ির সবাই উপাধি দিয়ে দিলো স্কুল চোর। প্রতিদিন সকালে আমার কান্না শুরু হয়ে যেতো স্কুলে না যাবার জন্য। বাবার অফিসের আয়া আমাকে প্রতিদিন কোলে করে স্কুলে নিয়ে যেতো। তার কোলে ছাড়া স্কুলে যেতে চাইতাম না। সাথে আম্মাকেও যেতে হতো। আমি ক্লাসরুমে বসে থেকে জানালা দিয়ে আম্মার শাড়ির আঁচল ধরে থাকতাম। কিছুদিন পরে আমি কোয়ার্টারের এক দেয়াল থেকে পরে যেয়ে হাত ভেঙ্গে ফেললাম। এর পরে প্রায় মাসখানেক আমাকে স্কুলে যেতে হয়নি। ঐ সময় টা হাত ভাঙ্গা থাকেলও আমার অনেক মজা লাগতো কারন স্কুলে যেতে হচ্ছে না। কিন্তু যখন হাত ভালো হলো তখন বিপদে পড়লাম কারন এখনতো আমাকে আবার স্কুলে যেতে হবে। এখনও মনে আছে হাত ভালো হওয়ার পরে আমাকে টেনে বাশার বাহিরে নিতে পারে নাই স্কুলে যাওয়ার জন্য।
বিকালের দিকে কোয়ার্টারের সবাই বের হতাম বাসার সামনে মাঠে খেলার জন্য। কুমির ডাঙ্গা, বৌছি, ক্রিকেট, ফুটবল আরও অনেক খেলা খেলতাম। সন্ধ্যার আজানের সসাথে সাথে বাসায় ফিরতে হতো নয়তো একটা মাইরও মাটিতে পড়তো না। বাসায় হাত মুখ ধুয়ে পড়তে বসতাম। রাতের দিকে টিভিতে আলিফ লায়লা, সিনবাদ, রবিনহুড, ম্যাকগাইভার দেখার জন্য মুখিয়ে থাকতাম। প্রতি সপ্তাহে বিটিভিতে বাংলা মুভি। মনে আছে 'ভাত দে' মুভি দেখে ঐ বয়সে আমি কেদে দিছিলাম।
কোয়ার্টারের মাঠ ছারাও বাসার রাস্তার পার হলেই বিশাল মাঠ ছিল। ওখানে বড়রা ক্রিকেট, ফুটবল খেলতো। পাশেই শহিদ মিনার ছিল। প্রতি বছর ২১শে ফেব্রুয়ারী সকালে ফুল দিতে যেতাম। ২৬ শে মার্চ, ১৬ই ডিসেম্বারে অনুষ্ঠান হতো। যেমন খুশি তেমন সেজে যেতাম। এই সময়গুলো অনেক মজার ছিলো। এখন ও মনে পরে এই সময় গুলো। অনেক অনেক মজার স্মৃতি আছে। পরে অন্য সময় শেয়ার করবো।