সম্রাট হুমায়ুনের গুজরাট অভিযান ও গুজরাটের পতন

akazad(49)
Published in
#life
Words
461
Reading
3 min
Listen
Play
8y

মুঘল সালতানাতের মসনদে তখন বাবরপুত্র নাসরুদ্দিন মুহাম্মদ হুমায়ুন। তিনি বুঝে গেলেন বাহাদুর শাহের সাথে তার সংঘর্ষ অনিবার্য। বাহাদুর শাহকে বাঁধা দিতে এগিয়ে এলেন তিনি। ১৫৩৫ সালের শুরুর দিকে ঘাটি গাড়লেন বাহাদুর শাহের রাজধানী আহমেদাবাদ থেকে ১৫৩ কিলোমিটার দূরের সারাংপুরে। প্রথমেই তিনি যুদ্ধের কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ মালব আর উজ্জয়িনীতে নিজের প্রভাব বিস্তার করলেন। বাহাদুর শাহ তখনো চিতোর অবরোধে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছিলেন। অবশ্য তিনি হুমায়ুনের অভিযানের কথা ইতোমধ্যেই জেনে গিয়েছিলেন।

১৫৩৫ সালের ২৫ মার্চ মুঘল সেনাবাহিনীর আক্রমণের মুখে বাহাদুর শাহ মন্দসৌর ছেড়ে মাণ্ডু দুর্গে আশ্রয় নেন। তবে বাদশাহ হুমায়ুনের আক্রমণের মুখে বাধ্য হয়ে তাকে মাণ্ডু দুর্গও ছাড়তে হয়।

বাদশাহ হুমায়ুনের তাড়া খেয়ে গুজরাটের সুলতান বাহাদুর শাহ এরপর প্রথমে আহমেদাবাদ এবং পরে চাম্পানীর দুর্গে গিয়ে পৌছেন। ষোড়শ শতাব্দীতে এই দুর্গটিতে গুজরাটের রাজকোষ সঞ্চয় করে রাখা হতো। অনেক আগে থেকেই কৌশলগত দিক দিয়ে এই দুর্গটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

৩০ হাজার অশ্বারোহী যোদ্ধা নিয়ে বাহাদুর শাহকে ধাওয়া করতে করতে আহমেদাবাদ শহরে এসে পৌঁছান। আহমেদাবাদে অবস্থান দীর্ঘ না করে হুমায়ুন দ্রুত চাম্পানীরে গিয়ে পৌছলেন। অভিযানে হুমায়ুনের দ্রুততার সংবাদ পেয়ে বাহাদুর শাহ রীতিমত ঘাবড়ে গেলেন। কারণ বাদশাহ হুমায়ুন প্রায়ই তার অভিযানগুলোতে ধীরগতি প্রদর্শন করতেন। মাঝে মাঝে কোনো কারণ ছাড়াই দীর্ঘদিন কোনো জায়গায় ঘাটি গেড়ে বসে থাকতেন। কিন্তু বাহাদুর শাহকে ধাওয়া করার সময় হুমায়ুন তার চিরাচরিত আচরণ প্রদর্শন না করে দুর্দান্ত গতিতে এগিয়ে আসছিলেন।

প্রতিনিধি দল অনুমতি প্রার্থনা করলে বাহাদুর শাহ তার আমিরদের মধ্য থেকে কাউকে গুজরাটে গিয়ে রাজস্ব আদায়ের প্রস্তাব করলেন। কিন্তু কেউই মুঘলদের ভয়ে রাজী হলো না। শেষ পর্যন্ত ইমাদ উল মুলক নামে বাহাদুর শাহের এক আমির রাজি হলেন। তবে তিনি একটি শর্ত দিলেন। তিনি বললেন,

“এই কাজ করতে আমি রাজি আছি, কিন্তু শর্ত হলো প্রয়োজনমতো অর্থ ব্যয় করার অধিকার আমাকে দিতে হবে। এই কাজের জন্য নিয়োগকৃত লোকদের জন্য কৃত ব্যয়ের কোনো হিসাব নেয়া যাবে না। এই ব্যয়ের পর যা অবশিষ্ট থাকবে, তা সুলতানের জন্য অবশ্যই রাজকোষে জমা করে দেয়া হবে।”

আহমেদাবাদের জুনাগড়ে হাকিম মুজাহিদ খাঁর নেতৃত্বে তার বাহিনীতে আরো দশ হাজার অশ্বারোহী এসে যুক্ত হলো। বেতওয়া পৌছাতে পৌছাতেই তার বাহিনীর অশ্বারোহী যোদ্ধাদের সংখ্যা পঞ্চাশ হাজারে গিয়ে ঠেকলো।

ইমাদ উল মুলকের মাধ্যমে গুজরাট থেকে হুমায়ুনকে তাড়িয়ে দেয়ার একটা সম্ভাবনা দেখা দিল। বাহাদুর শাহ আশাবাদী হয়ে উঠলেন। এদিকে গুজরাটের মাটিতে ইমাদ উল মুলকের সগৌরবের মার্চ দেখে মুঘল বাদশাহ হুমায়ুন হুশ ফিরে পেলেন। তরদী বেগকে চাম্পানীর দুর্গ রক্ষার দায়িত্ব দিয়ে তিনি দ্রুত আহমেদাবাদের দিকে ছুটে এলেন।

আহমেদাবাদে প্রবেশ করলে তার বাহিনীর যোদ্ধারা শহরটিতে অবাধে লুটপাট চালাতে পারে, এই আশঙ্কা থেকে তিনি মূল সেনাবাহিনীকে তৎক্ষনাৎ শহরে প্রবেশ করতে দিলেন না। কেবল আসকারি মির্জা আর তার কিছু যোদ্ধা শহরে প্রবেশের অনুমতি পেলেন।

আহমেদাবাদে প্রবেশ করে হুমায়ুন আসকারি মির্জাকে গুজরাটের প্রাদেশিক শাসক হিসেবে ঘোষণা করলেন। সমগ্র গুজরাটকে পাঁচটি ভাগে ভাগ করে প্রত্যেক ভাগে একজন করে আমির নিয়োগ দেয়া হলো। এই ভাগাভাগিতে ইয়াদগার নাসির পেলেন পাটন, ইশাক বেগ আকা পেলেন কম্বে আর বারোদা, কাসিম হুসাইন সুলতান পেলেন সুরাত, নওসারি আর ভরৌচ, মীর বুচকা বাহাদুর পেলেন মাহমুদাবাদ, আর তরদী বেগ চাম্পানীরেই বহাল থাকলেন।

সম্রাট হুমায়ুনের গুজরাট অভিযান ও গুজরাটের পতন | Ecency