আসলে কাজে লজ্জা নেই, লজ্জা আমাদের অলসতায়। আজ বহুদিন পর জমিতে কাজ করতে গিয়ে কিছু চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিলো। কোদল ঘাড়ে কৃষক হয়ে মনে নানান ইগো নিয়ে কাজে নেমে পড়া মানুষের সংখ্যা কম নয়। আসলে ইগো মানুষের থাকতেই পারে, তবে সেটা প্রকাশ করাটা নিচক বোকামি ছাড়া কিছু নয়। একজন মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলেরা আসলে না পারে অন্যের কাজ করে খেতে না পারে বড়লোকদের মতো বিলাসিতা ভাবে চলতে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই, কিছু কথা শেয়ার করতে চাই।
ছোট বেলা থেকেই বাবার ৭ বিঘা জমি, ছোট্র একটা চাকুরী এবং মাছ চাষ করে খেতে দেখতে দেখতে বড় হয়েছি। আমরা তিনভাই, আমি মেঝো। ছোটবেলা থেকেই এলাকার ভালো স্কুল কলেজে পড়াশুনা করিয়েছে। মোটামুটি ভাবে সংসার চলে, কেউ অভাব কিংবা দূর্দশা দেখেনি কখনো। সেই আমি, এলাকায় সবার সাথেই মিশে চলি, ফ্রিলি আড্ডা দেই, বন্দরে প্রাইভেট পড়ি মেসে থেকে, ভালো মানের শার্ট-প্যান্ট জুতা পড়ে ঘুরি, কম্পিউটারে কাজ করি, বাবার বাইক চালাই, পাশাপাশি ছাত্র রাজনীতির সঙ্গেও কিছুটা জড়িত, এমন অবস্থা দেখে দেখে সবাই আমাকে সেই চোখেই দেখে। তো,
সচারাচর আমরা জমি আবাদ করিনা, মাছ চাষ করে জীবিকা নির্বাহ হয়। কিন্তু বাপ এবার ধান আবাদ করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। আজ সকালে যখন বাপ বলছিলো জমিতে একটু যাও তো, পাওয়ার টিলার আসছে তা দিয়ে জমি প্রস্তুত করে নাও, হ্যা বাপের কথা মোতাবেক কোদাল টা ঘাড়ে নিয়ে চলে গেলাম জমিতে। সবাই যেনো এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিলো, সবাই ভাবতেছে যেই ছেলে সব সময় অন্যরকম ভাবে চলাচল করে, জমিতে কখনো দেখা যায়না, সেই ছেলে আজ কোদাল ঘাড়ে জমিতে কাজ করতে যাচ্ছে, ভাবা যায়? আমি সবার বিষয়টা সেভাবেই নিয়েছি। এক পর্যায়ে একটা ভাবি আমাকে রাস্তা দিয়ে যেতে দেখে গলা হাসর দিয়ে হাসতে হাসতে বলতেছে, ইয়াছিন দাড়াও তোমার একটা ছবি তুলি। আমি দাড়ালাম, ছবি তুলে নিলো। ভাবিও মজা নিচ্ছে, আমি কৃষক সেজে জমিতে কাজ করতে গিয়েছি বলে।
যাই হোক, আমি বুঝতে পারলাম আসলে ইগো কেনো কাজ করে মানুষের। তবে মানুষ কি ভাবলো, মানুষ কি দেখলো না দেখলো এটা চিন্তা না করে, কাজ কে বেশি বেশি ফোকাস করা উচিৎ। ইগো, লজ্জা আর অলসতা দিয়ে কখনো জীবন চলেনা, চলবেওনা।
বাঙ্গালিদের ভিতরে আসলে এই ধরনের বিষয়গুলো বেশি খেলে। যার ফলে কেউ সহজে এগিয়ে যেতে পারেনা। ভাবতে ভাবতেই জীবন শেষ। আমার কথা হচ্ছে, এই পৃথিবীতে আমরা পরীক্ষা দিতে এসেছি, জীবন সংগ্রাম করতে এসেছি। এখানে যদি কাজের প্রতি লজ্জা পেয়ে, মানুষের বিষয়গুলো ভেবে কাজ কে অবহেলা করাটা সত্যিই একজন ব্যক্তির জন্য দূঃখজনক। বাংলাদেশ এমন এক পর্যায়ে গিয়েছে আজকাল, কর্ম করে খাওয়া ব্যাতিত পেটে ভাত ঢোকা সত্যিই অনেক কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুতরাং, আমার ব্যক্তিগত মতামত থাকবে, এই পৃথিবীতে কোনো কাজকেই ছোট এবং অবহেলার চোখে দেখা ঠিক নয়। মানুষ একদিকে হাসবে, মজা নিবে, এই হাসির আড়ালে আপনি কাজ করে এগিয়ে যাবেন। আরেকটু খনন করলেই সোনা পাওয়া যাবে, কিন্তু বাঙ্গালিরা সেখানেই হতাশ হয়ে ছেড়ে দেয়। এটা আমার একটা চরম অভিজ্ঞতা।
এই পৃথিবীতে কেউ কাউকে যায়গা করে দেয় না, যায়গা করে নিতে হয়। আপনার আমার হাসি ঠাট্টার আড়ালে আরেকজন কর্ম করে, কাজ করে বহুদূর এগিয়ে যাবে। এটাই স্বাভাবিক। সুতরাং, কাজে নিশি-লজ্জা আর ইগো নিয়ে চললে কখনো সামনে এগুনো সম্ভব নয়।
কাজ শেষে যখন বাড়িতে ফিরি।