প্রায় ৩ মাস পর ঢাকায়, যদিও প্লান ছিলো মিডটার্ম এক্সামের আগেই ঢাকা থেকে কয়েকদিনের জন্য ঘুরে যেতে কিন্তু পরীক্ষা ছিলো অতি নিকটে, যার ধরুন প্লান পিছিয়ে গিয়েছিলো। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরের দিনই ঢাকার উদ্দেশ্য রওনা হওয়ার কথা থাকলেও সেটাও পিছিয়ে যায় ডাক্তার দেখানো আর টেস্ট করানোর জন্য। কিন্তু আর দেরি করিনি ডাক্তার দেখিয়ে, পরের দিন সকালেই রওনা হই। ভোর সাড়ে পাঁচটার বাসের টিকিট কেটে রাখি, যাতে ঢাকার বিরক্তকর জ্যাম এড়াতে পারি। ভাগ্যবশত কোন জ্যামের মুখোমুখি হওয়ার আগেই ঢাকায় এসে পৌছাই। ভাবিনি যে এতো দ্রুত এসে পৌছাবো, কিন্তু রাস্তা যথেষ্ট যানজট মুক্ত ছিলো যার কারনে সকাল ৯টার মধ্যে পৌছাই।
এই ব্যাস্ত, অপরিচিত শহরে আসার উদ্দেশ্য শুধু মাত্র একজনই যার সাথে বিরক্তিকর জ্যামে বসে থাকলেও সময় কিভাবে চলে যায় বুঝতেই পারি না। আমার কাছে ঢাকা শহর ছিলো একদমই অপরিচিত। একা একা কখনো এই শহরের আসার কথা ভাবতেও পারতাম না, ভয় পেতাম এটা ভেবে যে এতোদুর কিভাবে যাবো আবার আসবো। আমার আম্মুও কখনো একা ছাড়তো না কোথাও কিন্তু সময় পাল্টে গেলো, বুঝতে শিখলাম বিশেষ করে যখন তোমার সাথে পরিচয় হলো, সমস্ত ভয় দুর করে চলে আসতাম তোমায় এক নজর কাছে থেকে দেখতে, স্পর্শ করতে, হাতটা ধরে হাটতে। একসাথে রিকশায় ঘুরে শহরের উচু দালান গুলো দেখতে আর স্বপ্ন বুনতে। শহরের ফুটপাত দিয়ে হাটতে হাটতে কথা বলা, ফুচকা খাওয়া, এ যে তিন মাসের প্রতীক্ষার অবসান।
সেদিন রাস্তায় ৩ ঘন্টা একা দাড়িয়ে মানুষের বৈচিত্র্যময় জীবনচিত্র দেখতে দেখতে কাটিয়ে দিয়েছিলাম। সত্যি বলতে আমার তখন বিরক্ত লাগেনি যতক্ষণ না পিঠে ব্যাথা করা শুরু করলো। তুমি জানো কি যখন আমার সামনে দিয়ে শতশত মানুষ যাচ্ছিলো, কিছুক্ষণের জন্য হলেও আমি একা অনুভব করেছিলাম কিন্তু পরক্ষনেই উপলব্ধি করলাম তুমি আর কিছুক্ষন পরেই বের হয়ে আসবা। আমি অপেক্ষা করছিলাম খুবই ধৈর্য্য সহকারে।
অনেকেই রয়েছে যারা ঢাকা শহরকেই ভয় পায়। ভয় পাওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কেউ অযথা ঘন্টার পর ঘন্টা এই গরমের মধ্যে দীর্ঘ জ্যামে বসে থাকতে চায় না। বিশেষ করে আমার মত যারা অন্য শহর থেকে ঢাকায় আসে তাদের জন্য এই জ্যামে বসে থাকা অসহ্যকর। ঢাকায় যারা নিত্যদিন কাটাচ্ছে তাদের জন্য হয়তো এই ব্যাপারটা অনেকটাই অভ্যাসের মতো। যার কারণে তাদের হয়তো খুব একটা অসুবিধা হয় না। কারণ তারা আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে রাখে দীর্ঘ জ্যামে বসে থাকার। যখনই কেউ শোনে যে আমি ঢাকায় এসেছি তখনই বলে ওই শহরে বেশিদিন টিকতে পারবেন না। এর চেয়ে ভালো নিজের গ্রামেই শান্তিতে বসবাস করা উত্তম। একটা সময় আমি নিজেও এমন ভাবতাম। এমনকি অন্যদেরকে এমন কথা বলতাম। কিন্তু এখন কেন যেন ঢাকার প্রতি মায়া তৈরি হয়েছে।
যেই আমি কখনো ঢাকায় গেলে এক দিনও থাকতে চাইতাম না, সেই আমি এখন পুরোটা জীবন সেখানে কাটাতে চাই। আর সত্যি বলতে যেই মানুষটার জন্য সেখানে যাই, সে যদি পাশে থাকে ঘন্টার পর ঘন্টা জ্যামে বসে থাকাও এখন অসহ্য লাগে না। ব্যস্ততম শহরে যখন তার সেই চিরচেনা মুখটা সামনে আসে আমি পুরো স্বপ্নে চলে যাই। আমার আশেপাশে কি ঘটছে সেটাকে নিস্তব্ধতা অনুভব করি, সে যখন পাশে থাকে। আমি শুধুমাত্র তার অস্তিত্বটাই তখন অনুভব করি। তার কথা, তার হাসি, তার অভিমান শুধুমাত্র আমার চোখের সামনে ভাসে। আমি যে এক কোলাহল শহরে রয়েছি সেটা তখন ভুলে যাই।