ঈদ শেষ, দ্বিতীয় দিন চলছে, আশেপাশে প্রচুর বিয়ের ধুম পড়েছে। সকালে ঘুম থেকে উঠতে এক প্রতিবেশী ভাই এসে বললো, তোমায় আজকে আমাদের সাথে একটু থাকতে হবে। ছোট বোনের বিয়ে আজকে, তাই একটু থেকো সাথে। ফ্রেশ হয়ে চলে আসো। এদিকে বেচারা আমি দুপুর বেলা ঘুম থেকে উঠে কুল-কিনারাহীণ অবস্থা। কোন রকম ফ্রেশ হয়ে বিয়ে বাড়ি গেলাম। বিয়ের গেট বানানো হচ্ছে, আমাকে সেখানেই সাহায্য করতে হবে। কিন্তু তারা আমাকে নিয়ে যতটা প্রত্যাশা করেছে আমি ততটা নই, আমি এক অমনোযোগী ছেলে যার উপর তাদের প্রত্যাশা আকাশ চুম্বী। যাইহোক কি আর করার, যতটা সম্ভব ওদের সাহায্য করতে লাগলাম।
প্রায় ১ ঘন্টা ওখানে গেটের কাজ করার পর রেস্ট নেওয়ার জন্য পাশেই এক চেয়ারে বসে ফোন চাপতেছিলাম। বাড়ির ভিতরে বেশি জায়গা নেই কিন্তু মানুষ বেশি তাই আমি যেখানে বসেছিলাম পাশেই কয়েকটি মেয়ে বসে গল্প করছিলো, তবে তারা যা বলছিলো আমার পর্যন্ত কথা শোনা যাচ্ছিলো। এক মেয়েকে অন্য এক মেয়ে বলছিলো তোর কেমন ছেলে পছন্দ! আমি দেখলাম প্রশ্ন টা ইন্টারেসটিং, তাই একটু মনোযোগ দিয়ে শুনতে চেষ্টা করলাম মেয়েটি উত্তর কি আসে। তখন উচ্চ আত্মবিশ্বাস নিয়ে মুখস্ত বই পড়ার মতো মেয়েটি বললো, তাকে ডাক্তার হতে হবে, যথেষ্ট লম্বা, বেশি মোটাও না চিকনও না, স্বাভাবিক স্বাস্থ্যের, মাথা ভর্তি কালো চুল থাকা লাগবে, চোখে ফ্রেমলেস চশমা, মেয়েটির এমন উত্তর শুনে মনে হচ্ছিল লিস্টটা তার এমন ভাবে মুখস্ত ছিল যে সে খুব ভালোভাবে জানতো তার এমনই চাই, তা না হলে হবে না। আমি আক্ষরিক অর্থে অবাক হয়েছি যে এইরকম ভাবে দোকানে পন্য কেনার মতো করে লিস্ট বলে ছেলে বাছাই করার কি আছে।
উত্তরের সম্পুর্নটাই ছিলো যেকোন ছেলের জন্য অসম্মানজনক। যাকে নিয়ে সে স্বপ্ন দেখছে, সে একজন মানুষ, মানবিক অনুভুতির একজন মানুষ। দোকানে সাজিয়ে রাখা কোন পণ্য না, যাকে সে লিস্টি ধরে ধরে পছন্দের গুনগুলো যাচাই বাছাই করে ব্যাগে তুলবে। সত্যি বলতে উল্টোটাও ঠিক যে কোন ছেলে যদি মেয়ে পছন্দ করতে গিয়ে লিস্টি দেয় যে আমার এই গুণাবলি সম্বলিত মেয়ে লাগবে। এগুলো ছেলে বা মেয়ের জন্য অপমানের।
আমাদের বর্তমান সময়ে সম্পর্কগুলো কেন বেশিদিন টেকে না? এটার একটা কারণ হয়তো, আমরা ছোট বড় কোন ঝামেলা মেটাতে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করি না। চেষ্টা করার আগেই আমরা সেই গোছানো সম্পর্কটাকে শেষ করে দেই, সেটা করাই আমাদের কাছে সহজ মনে হয়, ঝামেলা মেটানোর সাথে তুলনা করলে। কারণ আমাদের চারপাশে আরো হাজার খানেক অপশান ছড়ানো ছিটানো আছে। প্রাক্তনের মতো দেখতে সুন্দর, স্মার্ট ছেলে/মেয়ে যে কেউ আরো পাবে বা তার থেকেও ভালো পাবে। কি দরকার সামান্য সরি বলার? কি দরকার তার জন্যই মরিয়া হওয়ার।
অতি আধুনিক মনমানসিকতার ঝোঁকেই আমরা ইগো আর আত্মসম্মানবোধের মধ্যে পার্থক্য গুলিয়ে ফেলছি। আত্মসম্মানী হওয়া দরকার আমি মানি কিন্তু আগে বুঝতে হবে এটা ইগো নাকি আত্মসম্মানবোধের? আমরা আত্মসম্মানের নামে ইগো দেখাই যা একদমই অনুচিত। আরো কারন আছে, যে আমরা সম্পর্ককে এর সঠিক মর্যাদা বা সম্মান দেই না। অসম্মান সেদিন থেকেই শুরু হয় যেদিন আমরা লিস্টি অনুযায়ী সম্পর্কে জড়িয়েছিলাম। অধৈর্য, ইগো, অবিশ্বাস, স্বাধীনতায় ব্যাঘাত সম্পর্ক চলাকালীন এগুলো সবই অসম্মানের এক একেকটা দিক। আমরা যেহেতু মানুষ, ভুল তো করবোই। একে-অপরের সাথে কথা বলে, বুঝিয়ে, বুঝে, ধৈর্য ধরে আমরা কেন কখনো ভুলের এই বড় ঝাপ্টা গুলো একসাথে সামলে উঠি না? কেন?
খুব সুন্দর করে শুরু হওয়া জিনিসটাকে কেন আমরা সেরকম যত্ন করে রাখি না? অসুন্দর করে শেষ হওয়ার থাকে বাঁচানোর চেষ্টা করি না।
সম্পর্কের ব্রেকাপ তো ঘন্টায় ঘন্টায় ঘটছে আবার এদিকে ডিভোর্সের হার বাড়ছে প্রতিদিন। দিনশেষে দেখি আমরা সবাই একা, নিজের করে বলার মত পাশে কেউ নেই।
আমাদের অন্তত এতোটুক জানা উচিত যে, পরিচিত অপরিচিত সবাইকে সম্মান যদি আমরা দিতে না পারি, অন্য কারো কাছ থেকে আমাদের সম্মান পাওয়া উচিত না।
কোন একটি সম্পর্কে যদি একজনের উপর আসা আঘাতটা যদি অন্যজনের কাছ থেকে আত্মসম্মানের উপর এসে পড়ে তাহলে আমার মতে সেখানে দ্বিতীয় একটা সুযোগ থাকা উচিত। এটার কারণ হলো সম্পর্ক অনেক দামী একটি জিনিস। অত্যন্ত সুন্দর করে শুরু হওয়া কোন জিনিস শেষ এত সহজে এত অসুন্দরভাবে হওয়া উচিত না, একদমই না।
আমাকে কেউ যদি জিজ্ঞেস করে জীবনের সঙ্গী হিসেবে কেমন মেয়ে পছন্দ? যদিও কেউ জিজ্ঞেস করে না। তবে যদি করে তাহলে আমরা উত্তর এমন হবে..
যে আমাকে ভালোবাসবে, আমি যাকে খুব বেশিই ভালোবাসবো আমার তেমন মেয়েই পছন্দ জীবন সঙ্গী হিসেবে।