মাঝেমধ্যেই আমার দুপুরে ঘুমানো হয়, যখন খুব বেশি ক্লান্ত লাগে তখনই শুধু বিশ্রামের জন্য সেই সময়টাকে বেছে নেই । আজকেও এর ব্যাতিক্রম নয়, বাইরে খটখটে রোদ, গরম তুলনামূলক বেশি, সুন্দর আবহাওয়া। হালকা বাতাস বইছে, গাছের পাতা দুলছে। আমিও মোবাইলটা হাতে নিয়ে ফেসবুক দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়েছি। আমি ভুলে গিয়েছিলাম দুপুরের খাওয়ার কথা। এটা মাঝেমাঝেই হয় আমার সাথে, গোসল করে এসে খাওয়ার কথা ভুলে যাই। আম্মু সে মনে করিয়ে দেয়। বিকেল প্রায় ৫ বেজে কয়েক মিনিট, হঠাৎ জেগে উঠেছি, জানালা দিয়ে সোনালী রোদ উঁকি দিছে, চোখের উপর পড়তেই কি সুন্দর অনুভূতি, উঠতে চেয়েও উঠতে ইচ্ছে করছে না। কিন্তু একটু পরেই সন্ধ্যা নামবে, আম্মু এখনো শুয়ে আছি দেখলে বকবে। হঠাৎই মনে পড়লো আমি দুপুরে না খেয়েই শুরে পরেছিলাম, কিন্তু আম্মু আজকে ডেকে নিলো না কেন!!
অজান্তেই চিন্তার রেখা কপালে চাপলো আমার, আস্তেধীরে উঠে গিয়ে দেখি আম্মুও শুয়ে আছে, আস্তে করে ডাক দিলাম, কোন সাড়া নে! দ্বিতীয় একই ভাবে জাগানোর চেষ্টা করলাম তবুও ঘুম ভাঙছে না। তৃতীয় বারের ডাকে হালকা নড়াচড়া করে উঠলো। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ভালো লাগছে না আপনার? আস্তে করে বললো, না! ঠিক আছি। কিন্তু চোখ খুলতেই পারছে না। আমার বুঝতে দেরি রইলো না যে তার প্রেসার-লো হয়ে গেছে।
আমি যেটা উল্লেখ করতে চাচ্ছি, সেটা হলো আমরা তাদের খেয়ালের জন্য প্রত্যাশা করি সব সময়, যে তারা আমাদের যত্ন নিক। কিন্তু আমরা ভুলে যাই তাদের প্রতি খেয়াল রাখতে।
বেশকয়েক বছর পাড় হয়ে গেছে আমার টাইফয়েড জ্বর হয়েছিলো। নয় বছর বয়সী ছিলাম হয়তো, সঠিক খেয়াল নাই। তবে আমার আম্মুর অবদান বরবারেই মতোই মনে রাখি। একদিন প্রচন্ড জ্বর, থার্মোমিটারে ১০৪° দেখাচ্ছে, রাত ২টা বাজে তখন। যোগাযোগ ব্যবস্থাও ভালো না সেই সময়। যেহেতু গ্রামে থাকি, আমাদের বাড়ি থেকে বাসস্ট্যান্ডে যেতে ১.৫ কি.মি রাস্তা হেটে যেতে হয়। এতো জ্বর আর দূর্বল শরীর যে এতো রাস্তা হেটে যাওয়া অসম্ভব আমার জন্য। কিন্তু আম্মু আব্বু উভয়ই ভয় পাচ্ছে জ্বরের তীব্রতা দেখে।
তারা দেরি না করে রাত ২টার দিকে আমাকে কোলে(ক্রোড়) নিয়ে রওনা হয়। বাইরে অমাবস্যার রাতের ন্যায় অন্ধকার, শিয়াল ডাকছে খুব কাছেই সাথে তো কুকুরে অনবরত ঘেউঘেউ। আমি তখন এতো কিছু চিন্তা করার অবস্থায় ছিলাম না কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম আম্মুর কষ্ট হচ্ছে আমায় কোলে নিয়ে হাটতে। তখনো পৌছাইনি, রাত ২;৩০ মিনিট, বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে সব ফাঁকা, এতো রাতে কোন যানবাহন প্রত্যাশা করাটাও বোকামি। ঘুটঘুটে অন্ধকারে কোন গাড়িঘোড়া নেই, এখন উপায়......?
তাদের যত্নেই কোন স্বার্থ থাকে না, থাকে বিশাল সমুদ্র সমান প্রত্যাশা সন্তানের প্রতি! তাদের অসময়ে পাশে বসে হাতটা শক্ত করে ধরে সাহস দেয়া। তাদের প্রত্যাশা আমাদের প্রতি অসীম না, খুবই সীমিত!