আম্মুর সাথে আমার ঝগড়া বাঁধে শুধু মাত্র খাওয়া দাওয়া নিয়ে, এই ঝগড়া যে সপ্তাহে একদিন বা প্রতিদিন তা নয়, তিন বেলা-ই আম্মুর সাথে কথা কাটাকাটি হয় এটা খাব না ওটা খাব না নিয়ে। বার বার খেতে ডাকা তার একদম পছন্দ না, কিন্তু আম্মু ঠিকই জানে না ডাকলে ওর খাওয়া হবে না, ডাকাডাকি করে অস্থির হয়ে যখন বলে, তোরে আর ডাকবো না , তোর যখন ইচ্ছে খাইস। তখন আরো কয়েক ডজন গালি শুনে খেতে যাই। এখন আরো একবার লাগবে ঝগড়া, "কি রান্না করছেন, এটা খাব না আমি" এই দুটো কথা আম্মুর কানের বিষ। তবুও প্রতি বেলায় খেতে গিয়ে এটা না বললে আমার খাওয়াই হয় না। গালাগালি শুনে যখন খাওয়া শেষ করি, তখন তার মুখের ভাষা "এতো তারাতাড়ি তোর খাওয়া শেষ! এমনে খাইলে বাঁচবি তুই!"। তার চোখে আমি কোনদিনও পেট ভরে খাইনি, ১ ঘন্টা সময় নিয়ে খেলেও আমার মায়ের কাছে এতো তাড়াতাড়ি। প্রতি বার রান্না করার আগে আমায় এসে জিজ্ঞেস করবে, "এটা রান্না করবো খাবিনি!"
প্রতিদিন সন্ধায় মাগরিবের নামাজ পড়ে আমার রুমে এসে আমার সাথে আড্ডা দিবে। তার সাথে আড্ডা দেওয়া বড্ড মুসকিলের। না! আমার আম্মু অক্ষরজ্ঞানহীন নয়, যথেষ্ট শিক্ষিত। আর আমাদের ভাইবোনের পড়াশোনা নিয়ে তার চিন্তার শেষ নাই। কিন্তু কথার তালে কখন কি বলে ফেলি সেটা ধরে পরে এতো কথা শোনায় দিয়ে যায়। "তুই এটা বাদ দিলে এটা হতো, সবাই পারে তুই কি করোস! শার্ট এই রংয়ের হলে ভালো হতো, কি সব কি রুম ভর্তি করোস তোরা বুঝি না"। মা'য়ের সাথে গল্প করতে গিয়েছি আর ঝগড়া বেঁধে কথা বন্ধ হয়নাই এমন নজির নাই বললেই চলে!
আম্মু কখনো মুখ ফুটে বলে না আমার এটা লাগবে। শাড়িটা পছন্দ হয় নি এমনটা কখনো তার কাছ থেকে শুনিনি। তাকে কখনো কেনাকাটা করতে বাইরে নিয়ে যেতে পারিনি। আব্বু ঈদের আগে ১০-১২ টা শাড়ি নিয়ে আসে, সেখান থেকে পছন্দ করেই তার জন্য রেখে দেয়। আমার কাছে তো শাড়ি নিয়ে ৩-৪ বার আসে যে, দেখতো কোনটা রাখবো!
ঈদের দিনে যে পাঞ্জাবি টা পরবো আম্মুর কাছে সুন্দর না দেখালে আমায় পড়তে দিবে না। আম্মুর পছন্দ না হলে আমিও পড়ে শান্তি পাই না। সেটা যার কাছেই পছন্দ হোক না কেন, আম্মুর কাছে আমি সুন্দর না দেখালে মনের মধ্যে খুটখুট করে আমার।
এইতো এক সপ্তাহ আগের কথা, আমি বললাম, একটা শার্ট কিনে নিয়ে আসি। সে আমাকে পুরো শার্টের বর্ণনা দিয়ে বললো এমম শার্ট কিনবি। দোকানে গিয়ে আমি তো ভয়েই শার্ট পছন্দ করতে পারছিলাম না। যখন শার্ট নিয়ে ভয়ে ভয়ে বাড়ি আসলাম, এসেই গায়ে লাগিয়ে আম্মুর সামনে গেলাম। আম্মুর মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম বর্ণনা অনুযায়ী'ই হইছে। যাক শান্তি এখানেই।
আসলে সমস্যা হইছে হলো, আমি ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারিনি। নিজের মধ্যে চেপে রাখতেই বেশি কম্ফোর্ট অনুভব করি। এতে তার মনে হয় তাকে কেউ ভালোবাসি না আমরা, তিনি মোটামুটি শিওর , তার কদর করি না, তার পুরো জীবন এহেন অকৃতজ্ঞ স্বামী-সন্তান নিয়ে হাড়ি ঠেলতে ঠেলতে ত্যানা ত্যানা হয়ে যাচ্ছে!
কিন্তু তার ভালোবাসার প্রকাশ আমি প্রতি সেকেন্ডেই পাই। সকালে উঠে কখনোই নিজের বিছানাটা গোছাই উঠি না। কাপড়চোপড় আমিই বেশি এলোমেলো করে রাখি। ঘরবাড়ি ফিটফাট রাখা নিয়ে তার প্রচেষ্টা আকাশচুম্বী, সবাইকে লাইনে রাখার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। হ্যা! আমার মা মা'ই!
নামাজ পড়তে যাওয়ার তাগিদ দিতে গিয়ে আমাকে মারে নি, তিনি এখনো বলতে পারবে না। ভোর ৪টা বাজে থেকে ডাকা শুরু করে ৫টা বাজিয়ে দেয়। যোহরের নামাজে যাওয়ার জন্য রান্না ঘর থেকে চিল্লাইয়া বলে নামাজে যা, তা না হলে খাইতে দিমু না। আছরের নামাজের সময় এসে একতরফা বকাবকি করে যায়। মাগরিবের নামাজে আমি নিয়মিত। এশার নামাজে তাগিদ টা সন্ধার সময় আড্ডা শেষ করে যাওয়ার সময় বলে যায়।
তার তুলনা আমি কখনোই কারো সাথে দেই নি, তার তুলনা কেউ নয়। "মায়ের" বৈশিষ্ট্য নিয়ে বলার শেষ খুজে পাবো না। সারাদিন লেখলেও তার সকালের দায়িত্ব সম্পর্কে লেখা শেষ হবে না। পৃথিবীতে একমাত্রই তিনিই যে নিঃস্বার্থ ভালোবাসে আমাকে,আমাদের। আসলে মা গোষ্ঠীই এমন, তাদেট বৈশিষ্ট্য অতুলনীয়।