আমার জীবন একটা বৃত্তের মধ্যেই ছিলো। স্বাদ ছিলো অনেক কিন্তু সাধ্য ছিলো না। আমার আব্বু একজন সামান্য বেতনভুক্ত একজন স্কুলের শিক্ষক, বাচ্চাদের চেঁচামিচি থামাতেই তার সারাদিন চলে যায়। বিকেলে ক্লান্ত আড়াল করে বাড়ি ফেরা তার।
আমাদের পরিবার মধ্যবিত্ত হলেও অনেক সুখী পরিবার। সামন্য বেতন, খরচও কম ছিলো। স্কুলের পরীক্ষার ফি আগে আগে দিতাম, নতুন ব্যাগ, নতুন নতুন জামাকাপড়, ঈদের সময়েও কেনাকাটা বাদ পরতো না। ছোট ছোট সব ইচ্ছে গুলো পুরন করতে দেরি হতো না আব্বুর।
কিন্তু আব্বু কখনো বাড়তি পোষাক কিনতো না। একটা শার্ট, একটা প্যান্ট আর শক্ত খরখরে চামড়ার জুতা হলেই তার ১ বছর পার হয়ে যায়। ঈদের আগে ২ বছর আগের কেনা পাঞ্জাবীটা ইস্ত্রি করে নতুন বানিয়ে নেয়।
একটা সত্য কথা সবাইকেই মানতে হবে যে, মায়েরা খুব মিথ্যাবাদী. 'মায়েরা মিথ্যাবাদী'এটা চিরন্তন সত্য৷ মিথ্যা বলে, নিজে না খেয়ে সন্তানেকে খাওয়ান। মিথ্যা বলে, নিজে না পরে সন্তানকে পরান। নিজে কাঁদলেও সন্তানকে কাঁদতে দেন না৷ তিনি মিথ্যা বলে সন্তানকে হাসান৷ সত্যিই মায়েরা বড়ো মিথ্যাবাদী। আমি কখনো আম্মুর দিকে খেয়াল করতাম না। দুটি শাড়িতেই বছর শেষ করে দিতেন। আমরা প্রায় সময় ভালো খাবারই খেতাম। কিন্তু আম্মু কখনো আমারদের সাথে খেতেন না। সবাই খাওয়ার পরেও কিছু অবশিষ্ট থাকলে, সেটা পরের বেলার জন্য রেখে তিনি লবণ মরিচ দিয়ে ভাত খেতেন, কখনো কখনো পান্তা ভাত খেতেন। যতো বড়ো হতে থাকলাম জ্ঞান শক্তি বাড়ার সাথে সাথে আম্মুর মিথ্যা গুলো ধরা পড়তে থাকলো।
মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্ম নেওয়া একধরনের পাপ৷ এটাতে আমিও একজন পাপি। এটা বুঝতে শিখেছি তখন থেকেই যখন থেকে অভাবটা বুঝি,টাকার অভাব। না পারি মানুষের কাছে হাত পাততে না পারি কামলা দিতে।
মাঝখানে হঠাৎ আব্বুর বেতন আটকে যায়। তখন স্কুল বেসরকারি ছিলো। মাসের পর মাস কোন টাকা পয়সা ছাড়া কাটিয়েছি আমরা। আমাদের অনেক স্ট্রাগল করতে হয়েছে সেই সময়। চালের দোকানে বকেয়া হতে হতে, পরে আর চাল দিতে না করে দেয়। আব্বু আম্মু না খেয়েও কাটিয়েছে, কিন্তু আমরা ভাই-বোন'রা ঠিকমতই খেয়েছি। জীবনের আসল বাস্তবতা টা তখন বুঝেছি। টাকার মূল্যটাও তখনই বুঝেছি। অন্ধকার কতটা কালো হতে পারে তখন বুঝতে পেরেছিলাম।
আমিই বড় ছেলে, এই দুঃসময়ে তাদের কাজে না আসতে পারলে, কেন তারা আমায় না খাইয়ে খাওয়াচ্ছেন। কিন্তু হাজার কষ্টের দিনেও আব্বু আমাকে কোন কাজ করতে দিবেন না। যতোদিন আমি পড়াশোনা করতে থাকবো ততদিন আমাকে কোন কাজই করতে দিবেন না। যেদিন আমার পড়াশোনা শেষ হবে,সেদিনই আমি চাকরি করতে পারবো। আমি আগেই জানতাম আমার আব্বু আমাকে কতটা ভালোবাসে,শুধু আমাকে না আমাদের সবাইকেই খুব ভালোবাসেন। তার সন্তানদের জন্য কতটা করতে পারে।
১ বছর ৩ মাস পরে বেতন চালু হয়। সেদিন আব্বু স্কুল থেকে ৪টার আগেই আসছিলো। সেইদিনে আব্বুর মুখের হাসিটা আমার এখনো মনে আছে। সেদিন যেন আমরা নতুন করে জীবন ফিরে পেয়েছিলাম। পরিবারে আবার সুখ নেমে এসেছিলো।
পরিবার শুধু গুরুত্বপূর্ণ নয়, পরিবারই সবকিছু!