আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে যখন আমি স্কুলে ছিলাম তখন একটি সাইকেলের জন্য প্রায় ১৫ দিন একটানা কান্না করেছিলাম। আমি তখন ছোট ছিলাম, যখন আমার বন্ধুরা সবাই সাইকেল নিয়ে স্কুলে আসতো আমারও ইচ্ছে করতো একটা সাইকেল কিনতে। আব্বুকে বলেছিলাম, আব্বু বলেছিলো কিনে দিবে কিন্তু সামর্থ্য হয়ে উঠেনি সেই সময়। আমি যখন বায়না করলাম যে আমায় সাইকেল কিনে দিতেই হবে তবুও আব্বু কিনে দিতে পারেনি। তখন সাইকেলের জন্য আফসোস লাগলেও এখন আফসোস লাগে কেন আমি বায়না করতাম, কিন্তু বয়স তখন ১২-১৩ বছর হবে, তখন ততটা বুদ্ধিসুদ্ধি ছিলো না এতটা বোঝার।
একদিন স্কুল থেকে বাসায় এসে দেখি একটা সাইকেল রুমের সামনে দাড় করানো। আমি তো ভীষম খুশি। আমি নিশ্চিত ছিলাম এটা আমার জন্যই আব্বু কিনে এনেছে। যদিও সেটি পুরনো সাইকেল ছিলো, জায়গায় জায়গায় রঙ উঠানো। সীট কভার টা নতুন, মনে হচ্ছে আজকেই পাল্টিয়ে নতুন একটু সীট কভার লাগানো হয়েছে। পিছনের চাকার টায়ার আর রিংটাও চকচকে দেখাচ্ছে, এটাও মনে হচ্ছে পাল্টানো হয়েছে। রুমে ঢুকতেই আব্বু বললো, পছন্দ হয়েছে। সত্যি বলতে আমি ভীষন খুশি হয়েছিলাম সাইকেলটি পেয়ে। আমি এতোটা বুঝতাম না তখন যে এই একটা পুরোনো সাইকেল কিনতে আব্বুকে এতোটা কষ্ট করতেছে হয়েছে। আমি তখন নতুন সাইকেল চালানো শিখেছি। সাইকেল চালাতে ভীষন মজা পাচ্ছিলাম। স্কুল, ঘুমানো আর খাওয়া দাওয়ার সময় বাদে সারাক্ষণ সাইকেল চালাতাম। কয়েক বার দূর্ঘটনাও ঘটিয়েছি।
একবার হয়েছি কি, আমি আর আমার বন্ধু স্কুল থেকে আসছিলাম। আমার বন্ধুটি আমার সাইকেলের পিছনের সীটে বসা আর আমি সাইকেল চালাচ্ছি। একা একা সাইকেল চালাতে যতটা আরাম অনুভূত হয়, পিছনে থাকলে কিছুটা ভারি ভারি লাগে এবং কন্ট্রোল করা রীতিমতো কষ্ট সাধ্য। চালাইতে চালাইতে রাস্তার মোড় সামনে পরে, মোড় ঘুরতে কয়েকটি পিচ্চিকে কিছু দুরে রাস্তার উপর খেলতে দেখি। সাইকেলের বেল বাজানোর সাথে পিচ্চি গুলো এদিকওদিক ছোটাছুটি করতে শুরু করে। কেউ রাস্তা এপাশ যাচ্ছে দৌড়ে আবার কেউ উল্টোপাশে। আমি ব্রেক ধরলে সাইকেল থামে না, এবং এক পিচ্চির উপর দিয়ে সাইকেল চলে যায়। বেশ কিছু দুর গিয়ে সাইকেল থামে। সাইকেল রেখে পিছনে এসে পিচ্চিরে কোলে তুলে নিই, ইতিমধ্যে কয়েকজন লোক চলে আসে এবং আমায় বকতে শুরু করে।
আমি বলতে থাকি পিচ্চি গুলোর দোষ কিন্তু কে শোনে কার কথা। বকা শেষ হলে সেখান থেকে কেটে পরি। বাড়িতে গিয়ে আম্মুকপ বলার সাথে সাথে স্পষ্ট না করে দেয় সাইকেল নিয়ে আর কোথাও যাওয়া নাই। কিছুদিন পর কান্না কাটি করে আবার সাইকেল নিয়ে এদিকওদিক ঘুরতে থাকি আর ছোট ছোট দূর্ঘটনা ঘটাতেই থাকি। এই যেমন কেন রিকশার পিছনে গিয়ে লাগিয়ে দেওয়া, ভীড়ের মধ্যে কাউকে ধাক্কা দিয়ে যাওয়া, সাইকেল নিয়ে বালির ওপর পরে যাওয়া এগুলা দৈনিকের ঘটনা ছিলো।
মাসের ১৭ তারিখ, যে মাসে আমায় আব্বু সাইকেল কিনে দিয়েছে। এখনো ১৩দিন বাকি মাস শেষ হওয়ার এবং বেতন ব্যাংকে জমা হওয়ার। এই ১৩ দিন তাহলে সংসার চলবে কিভাবে? একটা সাইকেল সে মাসের রুটিন একদম পালটে দিয়েছিলো। কপালে ভাজ ফেলেছিলো একটি রঙ উঠা সাইকেল, আনন্দিত আত্মা তখনো এতোটা আনন্দে ছিলো যেন এতো আনন্দ কোথাও নেই। তার কোন মাথা ব্যাথা নেই, নেই খাওয়া দাওয়ার চিন্তা কারন খাওয়ার সময়ে ঠিকঠাক খাবার পাওয়া যায়, এতে কোন সমস্যা হয় না। অবুঝ ছেলেটও জানেও না যে খাবার গুলো কই থেকে আসছে, সাইকেলটি কই থেকে আসলো। সে বুঝতে পারেনি যে একটি সাইকেল মাসের অর্ধেক দিন আব্বুর কপালে ভাজ ফেলে রাখবে।