ঘটনাটা গতকালের। রমজান মাস, তার উপর লকডাউন। আমরা বের হয়েছিলাম রাস্তার কুকুরদের খাবার দিতে। আমি আর আমার বন্ধু নাসিবের ভাগে পরে আমাদের পুরান ঢাকার কাঠেরপুল আর সূত্রাপুর শ্যামবাজার এলাকায় খাবার দেয়ার দায়িত্ব। আমাদের খাবার দেয়া শেষ হয় রাত ১২টার কিছু আগে।
আমি আর নাসিব, সিগারেট খেতে খেতে বিদায় নিচ্ছি। মাঝে ফোন করলাম আমার বাকি বন্ধুদের, যে একসাথে ফিরা যায় নাকি। কিন্তু ওরা খাবার দিতে দিতে নারিন্দার দিকে চলে গেছে। আমার একাই যেতে হবে। ঠিক হলো নাসিব আমাকে সূত্রাপুর মোড় পর্যন্ত এগিয়ে দেবে ।
আমি বললাম, ''থাক তোর আর আগাইতে হবে না, আমি লোহারপুল দিয়ে চলে যাব।"
নাসিব একটু অবাক হয়ে বললো, ''মানে তুই কবরস্থানের সামনে দিয়ে যাবি? এই রাতে তাও খাবারের প্যাকেট হাতে নিয়ে?''
ও যে জ্বীন-ভুতের কথা ইংগিত করছে তা বুঝে আমি একটু মজা নিলাম ওর সাথে। সাথে বুঝালাম অন্য রাস্তা মানে কাঠেরপুল দিয়ে গেলে আমার ১০ মিনিট বেশি হাঁটতে হবে।
তারপর বললাম, ''না ভূতের ভয় নাই। ওই রাস্তা এমনিতেই শুনশান, তার উপর লকডাউন চলে। ভয় পুলিশের আর ছিনতাইকারীর।''
পুলিশ ধরলে যাতে কুকুরের খাবার দেখাতে পারি তাই দুই প্যাকেট খাবার রেখে দিয়েছিলাম ব্যাগে। বের হয়েছিলাম ১১টায়। তখন বেশ মানুষ ছিল। করোনার ভয় নেই পুরান ঢাকায়। কিন্তু লোহারপুল পার করে দেখি একদম জনশুন্য। হাতে কুকুরের খাবার থাকায় কুকুর খুঁজছিলাম। কিন্তু একটা কুকুরও নাই। একদম থমথমে নীরব সব দিক।
লোহারপুলের পর আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের লাশবাহী গাড়ির গ্যারেজ। সাথেই লোহারপুল কবরস্থান। এইখানে প্রায়ই ছিনতাই হয়। এই ভয়টাই কাজ করছিলো। ঠিক ঐ জায়গার পেছনেই একটা দুর্বল খোঁড়া কুকুরকে পেলাম। আদর করে ডাক দিতে বেচারা আস্তে আস্তে কাছে এসে অভিমানের সুরে ডেকে উঠলো। কুকুরটা একদম দুর্বল আর ক্ষুধার্ত ছিলো। গলায় আওয়াজও বের হচ্ছে না এমন। আমি খাবারটা দিয়ে কবরস্থানের গলিতে ঢুকে হাঁটা শুরু করলাম।
তখনই খেয়াল করলাম গলিতে ল্যাম্পপোস্ট নাই । হঠাৎ দেখি কুকুরটা খাবার ছেড়ে অনেক জোরে ঘেউ ঘেউ করতে করতে আমার পিছনে আসছে। একটু আগে যে কুকুরটা দুর্বলতার কারণে ডাকতে পারছিলো না, ঐ কুকুর এমনভাবে ডাকছে কেনো বোঝার জন্য তাকালাম।
ওর দিকে তাকিয়ে, ওর ডাক আর অংগভংগি দেখে বুঝলাম ও আমাকে এদিকে যেতে দিতে চাচ্ছে না। ভূতের ভয় আমার নাই, তবে ছিনতাইয়ের ভয় আছে। কুকুরটা এই অল্প কয়েকটা ভাতের জন্য আমার প্রতি এমন আনুগত্য দেখাচ্ছে দেখে খুব ভালো লাগলো। ইতোমধ্যে বাসা থেকে দুবার ফোন আসছে। ফিরতে হবে এখনই। আমি কুকুরটাকে মাথায় হাত বুলায়ে আদর করে চলে আসা শুরু করলাম।
ঠিক এইখানে একটা বিখ্যাত বাড়ি আছে। এই বাড়ির বর্ণনা হুমায়ূন আহমেদের বইয়েও আছে।
বাড়িটা বিশাল প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। হয়ত বাড়ির পাশেই কবরস্থান, তাই। তবে অবাক করা বিষয় হলো, বাড়ির ফটক। বিশাল এক দরজা। হয়ত প্রাচীরের সাথে সামঞ্জস্য রাখতেই এইরকম বিশাল দরজা। এই বাড়ি নিয়ে অনেক কানাঘুষা আছে। বাসাটাতে একসময় অনেক দাসী রাখা হইতো। এইটা ছিলো মূলত বাইজী ঘর। এখানকার এক বাইজীর প্রতি আরেক ক্ষমতাসীন মানুষের নজর ছিলো। ফলস্বরুপ এই বাড়ির মালিক এই বাড়িতেই খুন হয়।
বাড়িটা এখন একটা কারখানা। তবে তখন আমার মাথায় এসব কিছুই আসেনি। আমি খেয়াল করলাম, কুকুরটা প্রথমে গলির মাথা পর্যন্ত এসে ঘেউ ঘেউ করছে। যদি কুকুরের ভাষা অনুবাদ করা যেত, তাহলে আমি আমার এতদিনের কুকুর পালার অভিজ্ঞতা থেকে হলফ করে বলতে পারি, এই কুকুরটা আমাকে চিৎকার করে এখান দিয়ে যেতে মানা করছে।
আমার হালকা ভয়টা যাতে মাথাচাড়া না দেয় তাই আমি নিজেকে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে, আবার পা চালানো শুরু করলাম।
এবার খেয়াল করলাম, কুকুরটা গলা ফাটিয়ে ডাকতে ডাকতে দৌঁড়ে আসছে। আমি কুকুরটার জন্য দাঁড়িয়ে গেলাম। বেচারা কেনো জানি ভয় পাচ্ছে । ওর ডাক শুনে মায়া লাগার কারণে দাঁড়ালাম নাকি, জানি না।
অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম, কুকুরটা একটা অদৃশ্য রেখা বরাবর, নিজের সীমা নির্ধারণের মতো করে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে গেছে। এরকম ভাব যে সে আসতে চায়, কিন্তু আসতে পারছে না।
কুকুর খুবই টেরেটোরিয়াল, আমি নিজেকে এই সান্ত্বনা দিয়ে আর পিছনে না তাকিয়ে হাঁটতে লাগলাম। পিছন থেকে এবার কুকুরের ডাকটা অন্যরকম শোনা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে কুকুরটা নাঁকি সুরে শেয়ালের মত হাউল করছে। ভয় পেয়েই কিনা জানি না, আমি আর হাঁটা থামালাম না।
কবরস্থানের ঠিক সামনে আসার পর, ভিতর থেকে কেমন জানি একটা অনুভূতি কাজ করতে লাগলো। শরীরে একটা শীতল স্রোত বয়ে গেলো। মনে হচ্ছে, কোনো একটা ঝামেলা আছে। বিশাল কোনো ঝামেলা আছে।
আমার ফিরে যেতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু একটু আগে বন্ধু নাসিবের সাথে যে মজা নিলাম, সেগুলো মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। নিজেকে সাহসী প্রমাণের জন্য না, নিজেকে সঠিক প্রমাণের জন্য হাঁটতে থাকলাম।
আয়াতুল কুরসি পারিনা, অন্য কোনো দোয়া পড়া যায় নাকি ভাবছি। সেইসময়ই, কোথা থেকে যেনো একটা ভেজা ভেজা বাতাস আসলো। বাতাস একদমই ছিলো না। বৈশাখের গরমে অতিষ্ঠ। ঠিক তখনই একটা নারিকেল গাছের পাতা বেশ শব্দ করে পড়লো।
একদম কবরস্থানের দেয়ালের উপরে। অর্ধেকটা পাতা রাস্তায়।
একটা বাড়ি থেকে হালকা একটু আলো আসছে, সেই আলো ছাড়া কোনো আলো নাই। ঐ আলোতেই স্পষ্ট দেখতে পেলাম। ঐ আলো না থাকলে কী হতো সেটা ভাবলেও চমকে উঠছি।
আমি প্রায় বলতে গেলে দৌঁড়ানো শুরু করলাম । সামনে বিশাল অন্ধকার। ঘুটঘুটে অন্ধকার যাকে বলে। আমার কেনো জানি মনে হলো পাতাটা এমনি এমনি পড়ে নাই। একদম কাঁচা পাতা। নারিকেল গাছের কাঁচা পাতা।
ভাবনাটায় জোর দিব, তখন খেয়াল করলাম যে আমি হাঁটছি, কিন্তু মনে হচ্ছে কেউ আমার ব্যাগটা পেছন থেকে ধরে রাখছে।
আমি গায়ের জোরে, বা নিজে ঠিক ভাবছি নাকি দেখতে ব্যাগটা একটা হ্যাঁচকা টানে সামনে নিয়ে আসলাম। স্পষ্ট বুঝতে পারলাম যে ব্যাগটা ফিজিক্সের সব নিয়ম উপেক্ষা করে পিছনের দিকে যাচ্ছে। নাকে কোথা থেকে যেনো একদম অচেনা একটা গন্ধ আসছে।
আমি আর কিছু চিন্তা না করে ব্যাগটা ফেলেই দৌঁড় দিলাম। এক দৌঁড়ে বাসায় চলে আসলাম। বাসায় পা কাঁপতে কাঁপতে সিড়ি দিয়ে উঠছি, আর কি হচ্ছিলো মনে করার চেষ্টা করছি।
দৌঁড়ের মাঝে একটা জিনিসই মনে আছে, যে বাগিচার (ঘটনাস্থলের ঠিক সামনের জায়গার নাম) সামনে ল্যাম্পপোস্টের হালকা আলোর সামনে আমি বলছিলাম “আল্লাহ, আল্লাহ”।
– ২১শে এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ ।