মধ্যবিত্ত

Words
776
Reading
4 min
Listen
Play
5y

সজল হন হন করে হাঁটছে। অন্য দিনের তুলনায় আজ তার একটু বেশিই তারা। অবশ্য অফিস শেষ করে বাসায় ফেরার পথে সাবারেই একটু বেশি তারা থাকে। আজ সজলের এতো বেশি তারা যে অফিস থেকে বার হয়ে রিক্সা নিতেই ভূলে গেলেন। অফিস থেকে বার হয়ে হন হন করে দ্রুত গতিতে হাঁটা শুরু করলেন। পথে ঘাটে এক দুজনের সাথে ধাক্কা লাগলেও তার এদিক দিশা নেই। চলছে আপন গতিতেই। বাসায় না ঢুকেই বাসার পাশের পারিবারিক কবরস্থানে সোজা চলে গেলেন। বাশের ঘেরা একটি কবরে পশ্চিম মুখ হয়ে দাঁড়িয়ে হু হু করে কাঁদছে সজল।

সজলের স্ত্রী জানালা দিয়ে দেখছিল সজলকে আসতে। কিন্তু সে বাসায় না ঢুকে সরাসরি কবরস্থানের দিকে কেন গেলো সে বুঝতে পারে নিই। এমনটা এই রকম কখনো করে নিই।

সজল আজকে প্রথম বেতন পেয়েছে। বেতন পাওয়ার খুশিতে আজকে তার হাতে শপিং ব্যাগ থাকার কথা ছিল। যে ব্যাগে বউয়ের জন্য শাড়ী থাকার কথা ছিল। পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের জন্য কিছু সারপ্রাইজ গিফট থাকার কথা ছিল। আনন্দ উচ্ছাসে উৎফুল্লে হাসিমুখে বাসায় প্রবেশের কথা ছিল। কিন্তু সজলের চোখে মুখে কোন আনন্দ নেই। আছে শুধু অন্তর্বেদনা। এই বেতনের টাকা হাতে পেয়ে তার বুকে ঝড় বয়ে যাচ্ছে। তার হৃদয়ে রক্তখরন হচ্ছে। তার খুব করে মনে পরছে বাবা'র কথা।

মধ্যবিত্ত পরিবারের সংসারে সজল ছিল বাবার বড় ছেলে। রশিদ মিয়ার সল্পবেতনে টেনে টুনে চলতো তার পরিবার। নুন আনতে পান্তা ফুরানোর সংসারে বেতন পাওয়াটাই যেন সব থেকে বড় সমস্যা হয়ে যেত। সল্পবেতন হাতে নিতেই মাথায় ঘুরপাক খেত বেতন নিয়ে গিন্নি আর সন্তানকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি গুলোর কি জবাব দিবে। রহিম মিয়ার মুদি দোকানের বাকী পরিশোধ করতে হবে, বাড়ি ভাড়া, ইলেকট্রিক বিল, ছেলের পড়াশুনার খরচ। ছেলেটার প্যান্ট ছিড়ে গেছে। জোড়াতালি দিয়ে চলছে। এইবার বেতন পেয়ে প্যান্ট কিনে দিতে চেয়েছিলাম। এই রকম প্রতি মাসেই নানা রকম প্রতিশ্রুতি আবদার দেনা এইসব বেতন হাতে পাওয়ার পরে রহিম মিয়ার কানে চারপাশেই ধমকাতে থাকে। রাতে ঘুমালেও যেন ঘুমের মধ্যে মুদি দোকানদার রহিম মিয়া টাকা চায়, বাড়ি ওয়ালা ভাড়ার জন্য এসে চেঁচামেচি করে। তিন মাসের বকেয়া ভাড়া সহ।

এভাবেই চাপ নিয়ে চলছে রশিদ মিয়া। সজল ও বড় হয়ে গেলো এভাভেই। বড় ছেলে সজল চাকুরি খুঁজতে খুঁজতে দিশেহারা। এদিকে বড় ছেলের প্রেমিকার বাসা থেকে বিয়ে দেওয়ার চাপের কারণে বাসা ছেড়ে সজলের বাসায় চলে এসেছে। এমনিতেই সংসার চালানো কঠিন তার উপর নতুন আরেকজন সদস্য। এইসব দুঃশ্চিন্তায় নিমজ্জিত হয়ে অফিস থেকে বার হয়ে রাস্তার মাঝখানে দিয়ে হাঁটা শুরু করে দিয়েছে রশিদ মিয়া। পিছনে একটা পিকআপ ভ্যান হর্ন দিতে দিতেই আসছিল। দুঃশ্চিন্তায় এতটাই নিমজ্জিত ছিলেন যেন কোন হর্ন তার কর্ন পর্যন্ত পৌচাচ্ছিল না।

হঠাৎ সজলের ফোন আসে-
আসসালামু আলাইকুম, হ্যালো কে বলছেন?
আমি মেডিকেল থেকে বলছি, আপনি রশিদ মিয়ার ছেলে?
জি, হ্যাঁ।
আপনার বাবা এক্সিডেন্ট করেছে দ্রুত আসেন মেডিক্যালে।
সজলের পা হতে যেন মাটি সরে গেছে। তার কিছুদিন পর রশিদ মিয়া পরলোক গমন করেন।

একমাস পরেই সৃষ্টিকর্তার অনুগ্রহে সজলের একটা জব হয়ে যায়। আজ মাস পূর্ণ হতেই হাতে বেতন পেয়েই বাবার কথা খুব বেশি মনে পরে। প্রতিদিনেই মনে পরে কিন্তু আজকে বেশি মনে পারছিল বাবার বেতন হাতে মলিন মুখটা। মনে পরছিল বাজারে বাকির রশিদ হাতে নিয়ে রমিহ মিয়ার দোকানে কাঁচুমাচু হয়ে দাঁড়ানো। ছেলে কে মাসেও একটা চকলেট কিনে দিতে না পারার লজ্জায় সন্তানের চোখে চোখ রাখতে না পারা। বাড়ি ওলার ভাড়ার জন্য মাথা নিচু করে কথা শুনা। তার স্কুলের বেতন কমানোর জন্য ঠোঁট কেঁপে কেঁপে হেড মাস্টারের কাছে আকুতি মিনতি করা। সবেই তার হৃদয়ে মোচড়ে দিচ্ছিল। বেতন হাতে নিয়ে ভাবছিল বাবা'ই তো নাই এই বেতন কার হাতে গিয়ে দিব। যেই বাবা সারা জীবন কষ্ট করলো সন্তানের হাতে প্রথম ইনকামের একটা লুঙ্গি বা পাঞ্জাবি পরার জন্য সেই বাবা'ই তো নাই আজ। বাবাকে সহযোগিতা করতে না পারার আক্ষেপ তাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। সে নিজেকে আর সামলাতে পারছিল না। তাই সোজা বাবার কবরে গিয়ে অঝোরে কাঁদতে থাকে।

‘রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বাইয়ানি সাগিরা।’ (সুরা বনি ইসরাইল : আয়াত ২৪)

কবর জিয়ারত করে সজলের বুকটা অনেকটা হাল্কা হল। সে বাসায় আসে বউকে একটু হাসি খুশি মনে বললে আজকে বেতন পেয়েছি। বউয়ের মুখেও হাসি। এতোদিনে কষ্ট যেন নিমিষেই ভূলে যায়।

সজল বউয়ের হাতে হাত রেখে বললো বাবা বেঁচে থাকতে তো ওনার জন্য কিছু করতে পারি নিই। সারা জীবনটা আমাদের জন্য দিয়ে গেলো। আমাদের জন্য টেনশন করতে করতে উনি এক্সিডেন্ট করে ইন্তেকাল করলো। তাই বাবার জন্য মসজিদে কিছু টাকা, আর কয়েকজন গরীব মানুষকে একবেলা খাওয়াতে চাই। ওনার মাগফেরাতের জন্য দোয়া করাতে চাই। তুমি কি বল?

তার কথা শুনতে শুনতে চাঁদনীর চোখ বেয়ে পানি পরছিল। সে সজলকে জড়িয়ে ধরে চোখের পানি শার্টের মধ্যে মেখে একাকার করে দেয়। তারপর বলে বাবার জন্য আমিও তো কিছু করতে পারি নিই। খুব ইচ্ছা ছিল বাবা মায়ের খেদমত করার। বাবা মায়ের খেয়াল রাখার। কিন্তু আমি পারি নিই। বরং আমার জন্যই বাবা দুঃশ্চিন্তায় পরে এক্সিডেন্ট করে। আমি চাই তোমার যতটুকু সম্ভব বাবার জন্য যা যা করার কর।

সজল চাঁদনীর কথা শুনে নিজেকে আস্বস্ত করলো আমার ভালোবাসা কখনো ভুল ছিল না। আমি সঠিক মানুষকেই আমার জীবন সঙ্গীনি করেছি।

আজ সজল ও তার পরিবার শক্ত অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে। তার মধ্যবিত্ত বাবার শ্রম রক্ত ও ঘামের বদৌলতে।

images (6).jpeg

Source

মধ্যবিত্ত | Ecency