অসম্পূর্ণ ভালোবাসা

Words
830
Reading
4 min
Listen
Play
5y

অমাবস্যার রাত, বেঁচে থাকা প্রিয় মানুষটিকে কবর দিয়ে ঘরে ফিরছে। পৃথিবী স্তব্ধ। এতটাই স্তব্ধ যে কবর থেকে ভেসে আসছে এক পরিচিত আওয়াজ। এতোক্ষনে কেরামুন কাতেবিনের শাওয়াল জবাব শুরু হয়ে গেছে। ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করা নিঃষ্পপ্রয়োজন। তবুও স্বভাব যার যেটা। স্বভাবতই দরজা বন্ধ করে দিল বিপ্লব।

বাসায় পিনপতন নিরবতা। মা আত্মীয় স্বজন সবাই বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো। খালাম্মা এক দু পা করে এগিয়ে আসা শুরু করতেই রুমের দরজা টেনে দিয়েছে বিপ্লব। খাটের উপর হাঁটু চেপে বসে স্বপ্নার ছবির দিক চোখ পরতেই ভিতরের চাপা কান্না আর বাধ ভাঙ্গা জোয়ারের ন্যায় অশ্রু বেরিয়ে আসলো। গলা মুখ চেপে ধরেও হু হু কান্না থামাতে পারলো না বিপ্লব। শরীর কাঁপুনি দিয়ে স্বপ্নাকে হাড়ানোর কষ্ট কলিজা ছিড়ে বার হতে শুরু করেছে বিপ্লবের।

স্বপ্নার সাথে ভার্সিটিতে পরিচয় হয়। বন্ধুত্বের সম্পর্ক হতে ভালোলাগা সেই থেকে ভালোবাসার সূচনা হয়। প্রভাবশালী পরিবারের মেয়ে হলেও খুবই সাধারন সাদামাটা জীবন যাপন করতো। আর এটাই ছিল মূল কারণ সম্পর্কে জড়িয়ে পরার। পাঁচ বছরের পরিচয় চার বছরের ভালোবাসার সম্পর্কের টানে পরিবারের অবাধ্য হয়ে চলে এসেছিল বিপ্লবের জীবনকে পূর্নতা দেওয়ার জন্য। তাই তো বিপ্লব ভালোবেসে ডাকতো পূর্নতা বলে । তার সাধারণ চিন্তা ভাবনা শশুর শাশুরীর প্রতি শ্রদ্ধা সন্মানবোধের কারনে বাসার সবার কাছে খুব দ্রুতই প্রিয় হয়ে ওঠেন। বিয়ের দ্বিতীয় বছর চলছে তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা। সুখবরটি তখন পর্যন্ত কাউকে বলা হয় নিই। হঠাৎ পূর্নতার শরীর কাঁপুনি জ্বর। শরীর ঝাঁকুনি দিচ্ছে। সিরিয়াস অবস্থায় মেডিক্যালে নিয়ে যাওয়ায় ডাক্তার বলেন মেরিনজাইটিসে আক্রাক্ত। রোগীর অবস্থা খুব একটা ভালো না। এটা শুনতেই পা থেকে মাটি সরে যাচ্ছিল বিপ্লবের। হঠাৎ করেই পূর্নতা স্বার্থপরের মত বিপ্লবকে ছেড়ে চিরবাদায় নিয়ে চলে যায়। চার বছরের ভালোবাসার সম্পর্ক চারটা বছরও দাম্পত্য জীবনে কাটাতে পারলো না বিপ্লব। সে সময় হৃদয়ে তার ঝড় বয়ে যাচ্ছিল।

দুই দিন পর অনামিকার আগমন। কেমন আছো অনামিকা? এতোদিন পর এই আমাকে মনে পরলো।
আরে না, মনে তো সব সময় পরে। কিন্তু বুঝেন এই তো সময় হয় না। আসলে কি বলে আপনাকে সান্তনা দেব। স্বপ্না এতো দ্রুত আমাদের ছেড়ে চলে যাবে আমি বিশ্বাসেই করতে পারছি না। মহান আল্লাহ্ যা করেন মঙ্গলের জন্যই করেন। নিশ্চিত এর মধ্যে কোন মঙ্গল নিহিত আছে।
বিপ্লবের চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। শুধু মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো।
তারপর কিছুক্ষণ ভালো মন্দ কথা বলার পর আবার আসবে বলে অনামিকা উঠতে চাইলেন। বিপ্লব আর জোর করল না। ঐ যে বিয়েতে দেখা হয়েছিল আর আজ দেখা হল।

স্বপ্না আর অনামিকা ছিল বেস্ট ফ্রেন্ড। সেই ছোট্টকাল থেকেই একই সাথে পড়াশোনা থেকে শুরু করে খেলাধুলা। অনামিকা প্রথমেই বিপ্লবকে ভালোবেসেছিল। প্রচন্ড ভালোবাসতো কিন্তু তার ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ সঠিক সময়ে করতে পারে নিই। এদিক স্বপ্নাকে বিপ্লব ভালোবেসে প্রস্তাব দেওয়ায় স্বপ্না তার সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পরে। তাদের দুজনের মাঝখানে বাঁধা না সেজে অনামিকা তার ভালোবাসাকে জলাঞ্জলি দেয়। একদিকে তার বেস্ট ফ্রেন্ড অন্যদিকে তার ভালোবাসার মানুষের খুশি দেখেই সে নিজের ভালোবাসাকে আড়াল করে।

চারটি বছর বিপ্লব আর স্বপ্নার ভালোবাসা একে অপরের প্রতি বিশ্বাস অনামিকার মধ্যে কিছুটা হিংসার জন্মনিলেও সেটার প্রকাশ সে কখনোই করে নিই। বরং তাদের দুজনের জন্যই সে সবর্দায় নিজেকে উজার করে দিয়েছিল। অনামিকা এই কারনে এখনো বিয়েই করে নিই। সে আর কখনো বিয়েই করবে না এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল। স্বপ্নার মৃত্যুর পর তার সেই পুরনো ভালোবাসার জোয়ার উঠতে থাকে। সুপ্ত ভালোবাসা যেন আবার তাজা হয়ে উঠে। ফিনিক্স পাখির মতো নতুন করে নিজেকে গোছানোর স্বপ্ন দেখে। সে বিপ্লবকে নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করে। সে আর চায় না তার ভালোবাসাকে ফিরে পাবার এই সুযোগটা মিস করুক।

এবার অনামিকা ঘন ঘন বিভিন্ন বাহানায় বিপ্লবের সাথে যোগাযোগ রাখে। বিপ্লবের শরীর কিছুটা খারাপ শুনতে পেয়ে দ্রুত দেখা করতে চলে আসে অনামিকা। কি বেপার তোমার নাকি শরীর খারাপ?
আরে না, তেমন কিছু না, হালকা জ্বর। তবে শরীরের চেয়ে মনটা ভিষন খারাপ। খুব করে স্বপ্নার কথা মনে পরছে।
তুমি আর একটা বিয়ে করছো না কেন? স্বপ্না বিপ্লবের মনের মধ্যে কি চলছে তা জানার জন্য জিজ্ঞাসা করলো।
বিপ্লব একটু হেসে আরে এই বুড়ো কে কোন হতভাগী বিয়ে করবে। আমার কথা বাদ দাও। তুমি এখনো বিয়ে করলে না কেন?
যাকে পছন্দ করতাম সে আমার নয় বলেই বললো চল একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসলেই তোমার মনটা ভালো হয়ে যাবে।
বিপ্লব যেতে চাচ্ছিল না, অনামিকা একটু বেশি রিকুয়েস্ট করাতেই সে রাজি হয়ে গেলো।

দুজনেই এক রিক্সাতে আঁটোসাঁটো করে বসে পরলো। বিপ্লব নিজেকে একটু ইতোতস্ত বোধ করলেও অনামিকার মনের মধ্যে উচ্ছাস দেখা দিয়েছে। অনেক দিনের স্বপ্ন তারা দুজনে এক রিক্সায় বসে ঘুরবে, হাত এর ভিতরে হাত জোড়ায় ধরে হাটবে।

দুজনেই নীরবতা পালন করে রিক্সায় ঘুরছে। নীরবতা ভেঙ্গে অনামিকা বলেই ফেললো বিপ্লব তোমার একাকিত্ব দূর করার জন্য বিয়ে করার দরকার।
পাল্টা জবাবে বিপ্লব আর তোমার একাকিত্ব দূর করার জন্য বুঝি কাউকেই দরকার নেই?
ও কপাল কি আর আমার আছে বলে উঠলো অনামিকা।
তুমি বললে ছেলেদের লাইন লাগিয়ে দিতে পারি। তোমার মত সুন্দরীর জন্য শত শত ছেলে পাগল হয়ে আছে। অন্য কোন মেয়ে হলে কত ছেলেকে যে নাচাতো তার ইয়ত্তা নেই। বল কেমন ছেলে লাগবে তোমার জন্য।
তোমার মত ছেলে হবে এই পৃথিবীতে আর একটা?
বিপ্লব মুচকি হেসে আমার মত বুড়া খাটাস তোমার সাথে মানাবে না। আমি বরং তোমার জন্য ভালো ছেলে খুজবো। অনেক কথা শেষে দুজনেই দুজনের বাসার দিকে রওনা দিল। অনামিকা তার ভালোবাসাকে কাছে পাওয়ার জন্যে উতলা হয়ে আছে। চোখে ঘুম নেই।

বিপ্লব প্রতিদিনের মতো স্বপ্নাকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পরে। সকালে ঘুম ভাঙ্গতেই ফোন হাতে নিতেই দেখে You have 1 Unread message. মেসেজটি অনামিকার নাম্বার হতে এসেছিল।

images (2).jpeg

Source