বয়সন্ধিকাল পার করে এখন ভরা যৌবন। সেই কবেই বিয়ের বয়স পার হয়েছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বাসায় বিয়ের কথা উঠেছে। ঘটকালি করছে মামা। হঠাৎ করেই আজ মেয়ে দেখতে যাবে। বিয়ে করবো, আমি তো মহা খুশ। দিলে লাড্ডু ফুটে গেছে। যাক আমিও ভালো করে শ্যাম্পু সাবান মেখে গোসল করে একেবারে চকচকা ফকফকা হয়ে গেলাম। আয়নায় নিজের চেহারাটা বার বার দেখছি আর মুচকি হাসছি। চেহারার মধ্যে লাইট মারছে। মাঝে মধ্যে দরজার দিকে উঁকি মারছি হচ্ছে কেউ দেখছে না তো আবার। লজ্জা বলে একটা বিষয় আছে না।
মেয়ে দেখতে যাবো শুট বুট আর পার্ফিউম মেরে রেডি। চাচা মামা দুজন মুরুব্বি আর এক ভাবি সহ মেয়ের বাসায় উপস্থিত। যথারীতি মেহমানদারি চলছে দিব্বি। এতো বাহারী খাওয়া জানলে তো আরো কয়েকটা বিয়ে করায় যায়। হবু বউ মানে মেয়ে চা নিয়ে আসলো। দুজন দুজনকে বাঁকা চোখে দেখতেই চোখে চোখে সরাসরি সংঘর্ষে দুজনেই লজ্জায় কাচুমাচু অবস্থা। ভালো ভাবে না দেখতে পেলেও যতটুকু দেখেছি মনে ধরেছে মেয়ে। মনে মনে পাক্কা নিয়ত করে ফেলছি বিয়ে করলে এই মেয়েরেই করবো।
মুরুব্বি আর ভাবীরা আপনাদের হবু ভাবীকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বিভিন্ন ধরনের যেরা করতে থাকলো। আর এদিক আমি তাদের জেরা দেখে বিরক্ত হচ্ছি। যতোই হোক মনের মধ্যে ছক কষেছে , তার কষ্ট হলে আমারও তো কষ্ট হবে। মুরুব্বিদেরও পছন্দ হয়েছে। চাচা মামা ভাবি একে অপরের দিকে তাকিয়ে ইশারায় সম্মতি জানালো তাদের মেয়ে পছন্দ হয়েছে।
সব শেষে আমাদের দুজনকেই আলাদা রুমে ছেড়ে দিল কথা বলার জন্য। আমিও লজ্জা পাই সেও লজ্জা পায়। এভাবেই দুই মিনিট নীরবতা পালন করে লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে বলেই ফেললাম নাম কি তোমার? পড়শুনা কতদূর, বিয়ে করতে কোন বাধা নেই তো? তারপর একে একে অনেক কিছু জিজ্ঞাসা করে রীতিমতো একটা আলাপচারিতা হয়ে গেলো।
অবশেষে সব কিছু ঠিকঠাক দিন তারিখ ও ঠিক হয়ে গেছে। ধুমধাম করে বিয়ে হয়ে গেলো। ফুলশয্যার রাতে দরজার ছিটকিনি থেকে শুরু করে সব কিছুই যেন ভালোবাসার গান গাইছে। দরজার ছিটকিনি লাগিয়ে গলা খেকরিয়ে বউয়ের পাশে বসে ঘোমটা ওঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছি ওমনি চিৎকার
-নবাবজাদা, জমিদার! আর কত ঘুমাবি? তোর বাপ জমিদারি রাখে গেছে? উঠ জলদি করে উঠ।
বিয়ে সাদী সব খান খান হয়ে গেলো। ফুলশয্যার রাতে আর ফুল ফোটানো হলো না মধুও আর খাওয়া হল না। মায়ের নবাবজাদা জমিদার সম্ভধন আর স্বপ্ন ভঙ্গের মধ্য দিয়ে দিনটি শুরু হলে।
একে তো মায়ের বোকা তার উপর এতো মধুর স্বপ্ন ভেঙ্গে গেলো । এই নিয়েই দিনটি শুরু হলেও মোটেও খারাপ যায় নিই। তারাহুরা করে ব্রাশ করে গোসল শেরে নাস্তা করতে বসলাম। কোরবানির গরুর গোস্তের ঝোল আর গরম গরম মায়ের হাতের পরাটা আহ কি টেষ্ট। খুব মনোযোগের সহিত চুটেচুটে খাইলাম। এমনিতেই মায়ের হাতের রান্না পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ রান্না। স্বাদ যেন লেগেই থাকে।
নাস্তা করতে করতে দেরি হয়ে যায় সেন্টারের উদ্দেশ্যে বার হই। রিক্সায় উঠেই ভাই জলদি চল দেরি হয়ে গেছে। মোরার উপর খারা ট্রাফিক জ্যামে আটকে গেলাম। কথায় আছে না "যেখানে বাগের ভয় সেখানেই সন্ধ্যা হয়।" আমার অবহ্থাও তাই। জ্যামে আটকে আছি পাশেই একটা রিক্সা এসে দাড়ালো। রিক্সায় এক সুন্দরী মেয়ে। হয়রানির মত চোখ, চুল গুলো হালকা বাতাসে দুলছে, ফর্শা কপালে কালো টিপ। আমি আবার ভদ্র ছেলে আশে পাশে কোন মেয়ের দিকে তাকাই না। আর যদি সুন্দরী মেয়ে হয় তাহলে তো না বাবা পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা আছে। একবার তাকাইতে গিয়ে মাইনকা চিপায় পরছিলাম। গার্ল ফ্রেন্ড ফোন দিয়ে কয় রাস্তায় রিক্সার পাশের টার উপর ক্রাশ খাইছো বাবু? দাড়াও তোমার কাছে নিয়া আসতেছি। পরে জিএফ এর বান্ধুবী আমার সাথে পরিচয় করায় দেয়। আমি তো তব্দা খায়ে গেছিলাম। তখন থেকে বাদ সুন্দরী ললনাদের দিকে তাকানো।।
যাই হোক জ্যাম সারলে দ্রুত আমার গন্তব্য সৈয়দপুর প্লাজায় পৌছায়। রীতিমত দৌড় দিয়ে সেন্টার খুললাম। আসলে ততোই তারাতারি করতে চাই না কেন দেরি হয়েই যায়।
হোক দেরী কিন্তু প্রতিদিনের কাজ ঝাড়ু দেওয়া পরিষ্কার করা সেটা তো করতেই হবে। ঝাড়ু দেওয়া শেষ করবো ওমনি কয়েকটা মেয়ে পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ফুস করে বলে দিল
-বউ সুখে থাকবে।
আমি আবার ভদ্র মানুষ এসবে পাত্তা দেই না। তারপরেও মুখ ফসকে বার হয়েই গেল
-জামাই লাগবে?
রিপ্লাই না পেয়ে আরেকবার আশাহত হলাম।
সেন্টারে স্টুডেন্টদের ক্লাস নিতে নিতে দুপুর গড়িয়ে বিকাল হয়ে গেলো। বাড়ি আসবো সেই সময়ে আমার কোচিং এর এইচএসসি ব্যাচের স্টুডেন্ট পপি ফোন দিল। পনির ভয়েস সব সময় উঁচু।
-আসসালামু আলাইকুম, ভাইয়া কেমন আছেন?
-ওয়ালাইকুম আসসালাম, আলহামদুলিল্লাহ্ ভালো। তুমি?
-ভালো ভাইয়া। আপনি কি প্লাজায়?
-হুম, প্লাজায় তবে এখন বাসায় যাবো।
- না না ভাইয়া যাইয়েন না, আমরা আসতেছি।
-ওকে জলদি আসো পেটের মধ্যে ইঁদুর দৌড়াচ্ছে বাসায় যাবো।
আমি মনে মনে সেই খুশি। বকেয়া টাকা গুলো হয়তো আজ পাওয়া যাবে। এমনিতেই পকেটের স্বাস্থ্য ভালো না। পকেটের স্বাস্থ্য ভালো হবে এই মনে করে মনের খুশিতে বসে আছি। আর টিপাটিপি করতেছি।
-ভাইয়া, কেমন আছেন? আসে গেছি, আমরা বান্ধুবিরা ফুচকা খাইতে আসছিলাম তো তাই আপনার সাথে দেখা করতে আসলাম।
-একটু কষ্ট করেই বলতে হল খুব ভালো করছো। মনে মনে টাকা টা পাচ্ছি এটা কম কিসে।
-ভাইয়া আপনি শুকায় গেছেন, দাড়ি, চুল বড় বড়। এই কি অবস্থা আপনার। ভাবী কেমন আছে? বিয়ে কবে করবেন?
-সংসারে অভাব, টাকা পয়শার অভাবে চুল দাঁড়ি কাটতে পারতেছি না। বিয়ে করতে পারতেছি না এই টেনশনে শুকায় যাচ্ছি।
-ধুর ভাইয়া আপনিও না! আচ্ছা ভাইয়া আমাদের টাকাটা একটু দিতে দেরি হবে। ভাইয়া মনে কিছু করিয়েন না।
-আরে না মনে করার কি আছে। এদিকে মনের ভিতর ঝড় বাতাস বইছে। রীতিমতো ছ্যাঁকা খেলাম।
আরেকবার আশাহত হলাম। ব্যাগ থেকে একটা আইসক্রিম আর একটা মিঃ টুইস্ট বার করে বলে ভাইয়া আপনার জন্য। এখন কি আর করার, সান্তনা পুরস্কার নিয়েই চলে আসলাম বাসায়।