ঈদের বিকালে শুনশান নিরবতা। মাঝে মধ্যে দু একজন নতুন জামা কাপড় পাঞ্জাবী পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, কেউ বউ বাচ্চা নিয়ে, কেউ বা গার্লফ্রেন্ড বয়ফ্রেন্ড নিয়ে রিক্সার হুক উঠিয়ে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
এরেই ভিতর কোথাও কোথাও জোটলা বেধে লোকজনের ভীর, ধাক্কাধাক্কি, ঠেলাঠেলি চলছে। এদের ধাক্কাধাক্কি ঠেলাঠেলি দেখে করোনা দূর থেকে বসে বসে ভাবছে এখানে হানা না দিলেও সে পারতো।
যাক এক ভদ্রলোক জটলার দিকে লক্ষ করে এগুচ্ছে। নিম্ন আয়ের মানুষেরা সেখানে প্রচুর দরদাম করে মাংস কিনছে। ৩০০ টাকা ৫০০ টাকা ও ১০০০ টাকার মাংসের ভাগা বিক্রি হচ্ছে। এরেই মধ্যে কিছু লোক ভীর ঠেলে মাংস নিয়ে কাচু মাচু চেহারা নিয়ে দ্রুতই স্থান ত্যাগ করছে। চেহারায় সংকুচিত ভাব নিয়ে সন্মান রর্ক্ষার্থে দ্রুতোই স্থান ত্যাগ করছে।
কয়েকজন জটলাকে কেন্দ্র করে দুরে দাঁড়িয়ে আছে। কাছে ভেরার চেষ্টা করছে। এরোই মাঝে এক ভদ্রলোক রিক্সায় এসে নামলো। সাদা রংয়ের পাঞ্জাবী পরনে লুঙ্গি। লোকজনের ভীর ঠেলে জটলা ভেদ করে সামনে আগানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হলেন। পরিবেশের সাথে খাপ না খেয়ে একটু দূরে গিয়ে দাড়িয়ে রইলেন। তারপর একটা সিগারেট নিয়ে ভূল করে উল্টা পাশে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। তার লক্ষ ভিরের দিকে। চোখ দেখে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে ভীর কমার অপেক্ষায়। এভাবে ভীর ঠেলে কখনো মাংস কেনার অভ্যাস নেই।
সাঈদ দূর থেকে সব কিছুই পর্যাবেক্ষন করছিলেন। সাঈদ হচ্ছে সেই ছেলে যে বিপদে সবার আগে এগিয়ে আসে। এলাকায় সবার কাছে হাতেম তাই নামে পরিচিত। সে কোনোকিছু না ভেবেই এগিয়ে গেলো এবং জিজ্ঞেস করলো
-আপনি কি মাংস কিনতে আসছেন?
কিছুক্ষণ চোখ সংকুচিত করে কি যেনো ভেবে, বা তার দলের লোক মনে করে বললেন,
-হু।
-কিনে ফেলেন, দেরি করলে তো শেষ হয়ে যাবে।
-এই ভিড় ঠেলে কিভাবে কিনি! আপনেও তো কিনতে পারতাছেন না।
তাকে জিজ্ঞেস করল, কত টাকা বাজেট?
-পাঁচ/ছয় শো টাকার মাংস কিনুম।
-আমার পছন্দ মত কিনা দিলে হবে?
তিনি সম্মতি জানাতেই তাকে দাঁড় করিয়ে অনায়াসে ভীর ঠেলে মাংস কিনতে জটলার মধ্যে ঢুকে পরলো, দুইভাগা কোরবানির মাংস ৬০০টাকা দিয়ে নিয়ে নিল। ওজনে কমবেশী আড়াই কেজির মত হবে।
মাংস ভর্তি পলিথিন তাকে এনে দিতেই জানতে চাইলেন, 'সাঈদ নিজেরটা নেয় নিই কেনো!' সাঈদ একটু হেসে, 'আমি মাংস কিনতে আসিনি।' এবার হাঈদ তার পোশাক খেয়াল করলেন, আমার শরীরে পুরানো পাতলা গেঞ্জি আর ট্রাউজার, পায়ে বৃষ্টিজনিত কাদায় ব্যবহারের জন্য অতি সস্তা দামের রবারের স্যান্ডেল। কড়কড়ে রোদের ঈদের বিকেলে খুব সন্তর্পণে সাঈদের দিকে ২০টাকার একটা নোট বাড়িয়ে দিলেন, সম্ভবত তাকে মাংস কেনার দালাল মনে করেছেন।
তাকে সাঈদ,
-বখশিশের দরকার নেই, কিছু প্রশ্নের উত্তর দিবেন?
-বলেন..
-বাজারে তো মাংস পাওয়া যায়, এখান থেকে মাংস কিনলেন ক্যান?
-কিনছি কি আর সাধে! গত চার মাস ধরে অফিস অর্ধেক বেতন দেয়। বাড়ি ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, পানির বিল, গ্যাসের বিল সংসারের খরচ কুলাতে ফারঠি না। এইবার গ্রামের বাড়িও যাইতে পারি নাই। বাজার থেকে গোশত কিনার ক্ষমতা থাকলে কি আর এইখান থেকে কিনি!
-সর্যি। এবার কোরবানির মাংস পান নাই?
-না। আমরা ভাড়াটিয়া, ভাড়াটিয়ারে কে মাংস দিবে!
এদিকে তিন'টা বাচ্চা দুপুর থেকা জ্বালাইতাছে 'কোরবানির গোশত' খাবে। না, পেরে এইখানে কিনতে আসছি।
এরপর কয়েক সেকেন্ড নীরবতা, নীরবতা ভেঙে তিনি বললেন,
-আপনে এইখানে কি করেন?
-কিছু করিনা। ঘটনা দেখি, পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করি।
-ও! কি জানি! তবে একটু চা খান?
-তা খাওয়া যাইতে পারে।
চা খাওয়ার সময় আর কোনো কথা হলো না। চায়ের বিল তিনি দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু চা দোকানদার ফিরোজ ভাইকে আগেই ইশারা করে রাখায় তার কাছ থেকে বিল নেয়নি। দ্বিতীয়বার তিনি বিব্রত হলেন হয়তো। তিনি রিকশা দিয়ে বাসায় ফিরে যাচ্ছেন।
তার সন্তানদের চিনিনা, দেখার প্রশ্নও আসেনা। তবুও যেনো দেখতে পাচ্ছি- কোরবানির গোশত দিয়ে তাদের মা ভুনা রান্না করেছে, ওই ভূনা গোসতের খুশবু ছড়িয়ে পরছে বাতাসে।
গরম পোলাও থেকে ধোঁয়া উঠছে। সবাই মিলে গোল হয়ে খেতে বসেছে। সবার মুখে কোরবানি ঈদের আনন্দ আর উচ্ছাস। শুধুমাত্র বাবার মনটা ভাঙ্গাচুড়ে একাকার। তার সব অশ্রু গোপন বাষ্প হয়ে মিশে যাচ্ছে ভূনা মাংসের খুশবু আর পোলাওয়ের ধোঁয়ায়, নিজের অভাবকে কোরবানি দিতে না পারার গাঢ় অক্ষমতায়।