মুন্সিপাড়ার রহিম মিঞা। হ্যাংলা দুগলা দেখতে। গ্রামের সবাই বাতাসু বলে ডাকে। এতো হ্যাংলা যে, জোরে বাতাস হলে উড়ে যাবে। সে কারনেই সবাই তাকে বাতাসু বলেই ডাকে। খুবই শান্ত স্বভাবের। গ্রামের সবাই তাকে পছন্দ করে ভালোবাসে। হেটার্স বিহীন একজন মানুষ। এমন মানুষ পৃথিবীতে বিরল।
যদি কোন সৎ ব্যক্তিদের উপমা দেওয়া যায় তাহলে সবার টপ লিস্টে বাতাসুই আগে আসবে। যাক অভাবের সংসার বাতাসুর। সৎ লোকদের সংসারে অভাব কিছুটা বেশিই থাকে। সংসারে বউ আর দুটা সন্তান। একজন তিতলি আর একজন মহেশ।
রহিম মিয়া মহেশের খুবই যত্ন নেন। নিজে হাতে খাইয়ে দেন। গোসল থেকে শুরু করে যা যা দরকার সকাল বিকাল সন্ধ্যা খাওয়া দাওয়া সব কিছুই। যত্নের যেন শেষ নেই। রহিম মিঞার যত্ন পেয়ে মহেশ ও হয়ে উঠে টাগরা জোয়ান। দেহের গঠনে যে কেউ আকৃষ্ট হতে হবে।
মহেশ নামটি দিয়েছিল তিতলি। ক্লাসে স্যার যখন অপরাজেয় কথা সাহিত্যিক শরৎ চন্দ্র চট্টপাধ্যায়ের "মহেশ" গল্পটি পড়াচ্ছিলেন ঠিক সেই মুহুর্তে রহিম মিঞা ছোট্ট মহেশ কে নিয়ে বাসায় আগমন ঘটান। রহিম মিঞার মেয়ে তিতলি, কাজেই বাপের মত তো চারিত্রিক মিল থাকবে এটাই স্বাভাবিক। অত্যন্ত শান্ত শিষ্ট স্বভাবের তিতলি মহেশ গল্প পরে রীতি মত মহেশের প্রেমে পরে যায়। তখনেই তিতলি নতুন মেহমানের নাম দিয়ে দেন মহেশ।
অভাবের সংসার হলেও মহেশের জন্য কোন ঘাটতি হত না। নিজে না খেয়েই মহেশ কে খাওয়াতো রহিম মিঞা। অনেক স্বপ্ন বুনেছে মহেশ কে নিয়ে। তাই তো অভাব কখনো বুঝতে দেয় নিই মহেশকে।
মহেশ ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠে। এখন তরতাজা যুবকের ন্যায়। শান্ত শিষ্ট মোটা সোটা ভারী দেহে পরিনত হয়েছে মহেশ।
রহিম মিঞা অনেক আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবার কুরবানীতে মহেশকে হাটে তুলবে। মহেশকে বিক্রি করে তিতলির বিয়ে দিবে রহিম মিঞা। তাই তো মহেশের এতো যত্ন।
তিতলিও বিয়ের উপযুক্ত হয়েছে। সামনে গরুর হাটে তুলবে মহেশকে। এতেই যেন তিতলির মন খারাপ বিষন্ন মনে বাসায় বসে আছে।
শুক্রবার সকাল সকাল ঢেলাপীর হাটে ওঠানোর জন্য মহেশকে প্রস্তুত করছে। তাতেই তিতলি স্বজন হারার মত হাউ মাউ করে কান্না শুরু। রহিম মিঞার বাড়বাড়িতে শোকের আবহ বিরাজ করছে। তিতলির কান্নায় আকাশ বাতাস সব ভারী হয়ে উঠেছে। এদিক রহিম মিঞা বুক ফাটা আর্তনাদ মুখ ঘুরিয়ে লুকিয়ে রশি ধরে হাঁটা দিল মহেশকে নিয়ে হাটে।
ইতিমধ্যে মহেশের ও বুঝতে দেরি নেই যে তাকে হাটে তোলা হচ্ছে কুরবানীর জন্য। মহেশের চোখ বেয়ে জল। তবে মহেশ মনে মনে নিজেকে এই বলে শান্তনা দিচ্ছে যে তাকে আল্লাহর নামে কোরবানি দেওয়া হবে। কোন কসাই মাংস বিক্রির জন্য নয়।
হাটে অনেক ধরনের গরু। মোটা চিকন পাতলা লম্বা হ্যাংলা স্বাস্থ্যবান। বিভিন্ন সাইজের বিভিন্ন কালারের গরুর মধ্যে মহেশ সেরা। শিরদাঁড়া লম্বা করে দাঁড়িয়ে আছে মহেশ। বলা যায় হাটে সবার পছন্দের হয়ে উঠেছে মহেশ।
হাক ডাক চলছে মহেশের এরেই ফাঁকে ফাঁকে রহিম মিঞা আদর করে চুমু খাচ্ছে। দাম ধরেছে ১ লক্ষ ৫০ হাজার। ১ লক্ষ ৩৫ হাজার হলেই ছেড়ে দিবে মহেশকে। ১ লক্ষ ২০ হাজার পর্যপ্ত উঠেছে।
দড়াদড়ির সময় ঠোঁটে কাপনি উঠে যাচ্ছে রহিম মিঞার। দালালেরা আশে পাশে ঘুরলেও পাত্তা দেয় নিই রহিম মিঞা। নিজ হাতেই তার মহেশকে তুলে দিবে ক্রেতার কাছে।
অবশেষে ১ লক্ষ ৩২ হাজার টাকা ঠিক হল মহেশের। রহিম মিঞা আবার ভালো লোক ছাড়া গরু দিবেন না। এক মুরুব্বি দাড়ি টুপি পরা পরহেজগার লোক মনে হয়েছে তার কাছে। তাই তো নির্ধারিত মূল্যের কিছু কম হলেও তাকেই দিতে রাজি হয়। রহিম মিঞার উদ্দেশ্যে তার মহেশ যেন হালাল টাকায় কেউ কিনে কুরবানী দেয়।
এখন রশিদ করার পালা। ক্রেতাদের চোখে মুখে আনন্দের ছাপ। তারা খুবই খুশি। অন্য দিকে রহিম মিঞার চোখে ছল ছল জল। হৃদয় ভেঙ্গে কান্না যেন বার হতে আর একটু সময় দরকার। ভিতরে ভিতরে তার হৃদয় উত্তাল হয়ে উঠেছে।
রশি ক্রেতার হাতে সর্পদ করে দিতেই মহেশকে জড়িয়ে ধরে হাউ মাউ করে কেঁদে ফেললেন রহিম মিঞা। যেন সে তার সন্তানকে চির বিদায় দিচ্ছে। মুহূর্তেই পরিবেশ ভারি হয়ে উঠলো। অবলা প্রাণী মহেশ হাউ মাউ আওয়াজ করে কাঁদতে না পারলেও অঝরে জল ঝরছে তার চোখ দিয়ে। বুঝার আর বাকি নেই কারোই রহিম মিঞা আর মহেশের ভালোবাসা।
চোখের জল মুছতে মুছতেই ক্রেতা আমজাদ হোসেনকে বলতে শুরু করলো আমার মহেশকে কষ্ট দিবেন না। সে খুব শান্ত শিষ্ট। তাকে খাওয়া দাওয়া করাবেন ঠিক ভাবে। তার যেন কস্ট না হয়। তাকে কসাই দিয়ে জবাই দিবেন না বলেই আরেক বার ফেঁপে ফেঁপে কেঁদে উঠলো।
ময়লা কাঁদা মাখা রহিম মিঞাকে কাছে টেনে বুকে জড়িয়ে নিল আমজাদ। তাকে আশ্বস্ত করলো আমজাদ মিঞা। তার মহেশের কোন কষ্ট হবে না। আমজাদের আশ্বস্ত পেয়ে চোখের পানি মুছতে মুছতে ঠোঁটের কোন হাসা ফুটে উঠলো। এ যে স্বর্গীয় হাসি। আশে পাশে সবাই তার হাসি দেখেই তালি মেরে উঠলেন।
রহিম মিঞা মহেশ হারা কষ্ট নিয়েই বাড়ির পথে রওনা দিচ্ছে রাজ্যের দুঃশ্চিন্তা নিয়েই। তিতলিকে কিভাবে শান্তনা দিবে। তিতলির বিয়ে দিতে হবে। চোর ডাকাতের ভয়। নিজেকে এখন কিভাবে সামলিয়ে রাখবে। মনে মনে ঠিক করছে আরেকটা ছোট মহেশকে কিনবে রহিম মিঞা।