এই নিয়মতান্ত্রিক দেশে সাধারণ মানুষ আইন মানবে না তা কি হয়! আইন অমান্য করলেই সাজা, নো মার্সি। বনল ছেলেটা এখন রিকশা ভ্যান চালক, দোকানে দোকানে পণ্য পৌছে দেয়।
এখন রিকশা ভ্যান চালক বলার কারণ হচ্ছে সে একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে জব করতো। যা বেতন পেতো তা দিয়ে বাড়ি ভাড়া, বাবা মা কে টাকা পাঠানো, ছোট ভাইয়ের পড়াশুনার খরচ, নিজের বউ বাচ্চার খড়চ হয়ে যেত। খুব ভালো না গেলেও আটকাতো না।
করোনার মহামারীতে তার চাকরি চলে যায়। সামান্য কিছু টাকা জমিয়েছিল। তা দিয়ে এই কয়েক মাস বাড়ি ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল সহ সংসারের সকল খড়চ চালিয়ে নিয়েছে। এখন হাত শূন্য। কিন্তু খরচের খাতা থেমে নেই। আপন গতিতে চলছে।
এদিকে বউ রিমি সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। ডাক্তার দেখাতে হবে। পকেটে মাত্র ২০০ টাকা আছে। ছোট ছেলে টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে মাটির কুলিয়ায় টাকা জমিয়েছিল। বুকে পাথর চাঁপিয়ে ছেলের কুলিয়া ভেঙ্গে ১২৬০ টাকা পেয়েছে। এদিক ছেলে কান্না কাটি তার জমানো টাকার জন্য। ছোট্ট ছেলে অভাব কি বুঝে? হাতে হল ১২৬০+২০০=১৪৬০ টাকা।
অবশেষে রিমি কে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেলো। ডাক্তারের রেগুলার রুগী ছিল রিমি। এর আগেও ছেলেটা হওয়ার সময় তারেই কাছে চিকিৎসা নিয়েছিল। যাক ভিজিট দেওয়ার সময় দশ টাকা বিশ টাকার নোট গুলো দেওয়ার সময় বনল একটু লজ্জিত বোধ করিছিল। ডাক্তার শৈলী তাদের দেখে তাদের অর্থনৈতিক সমস্যা বুঝতে পেরে ভিজিট নিবে বলে বিনয়ের সাথে জানান। বনল ও রিমা ভিজিট নেওয়ার জন্য আকুতি মিনতি করেও লাভ হয় নিই। কে বলেছে সব ডাক্তাররা কোসাই?
যাক ফেরার পথে সামান্য কিছু ওষুধ নিয়ে পকেট শূন্য করে বাসায় ফিরলো বনল আর রিমা।
আবার কাল থেকে সংসারের যাবতীয় খরচের জন্য টাকা নেই শূন্য হাত। চাকরির খোঁজে বার হয় প্রতিদিন।
অবশেষে একটি কোম্পানির দোকানে দোকানে মাল ডেলিভারী দেওয়ার জন্য ভ্যান চালকের চাকরি পায় বনল। কিন্তু তার পক্ষে সেই টা করা সম্ভব না। সাফ জানিয়ে দেন। রাতে বউয়ের সাথে এই ভ্যান চালকের চাকরির কথা বললে দুজনের চোখ বেয়ে নিরবে জল চলে আসে। স্ত্রীর বাঁধা থাকা সত্বেও সকালে ঠিকই যায়ে কথা বলে চাকরি কনফার্ম করে আসে। আগামী কাল থেকে শুরু।
পরের দিন কথা অনুযায়ী সকাল সকাল অফিসে সব কিছু বুঝে ভ্যান নিয়ে বার হয়। কিন্তু অভাব অনটনের থাকায় বাধ্য হয়ে তার এই সিদ্ধান্ত তার যে জীবনের সমাপ্তি ঘটবে সে কি জানতো?
সে বুঝতে পারেনি সে কি আইন অমান্য করেছে, কিন্তু আইন রক্ষার দায়িত্বে আপোষহীন এক ব্যক্তির লাথি বিদ্ধ করে তাকে। হয়তো ওই ব্যক্তিও এভাবে লাথি মারতে চান নাই, আইনের লোক হিসেবে আইন রক্ষা করতে চেয়েছিলেন। নিয়তির দোষেই লাথি এসে লাগে তার বুক আর কোমড়ের মাঝামাঝি।
বনল লাথি সয়েই মূল সড়ক থেকে শাখা সড়কে ভ্যান চালিয়ে এগিয়ে যায় প্রায় এক দুইশো গজ, তারপর আস্তে করে ঢলে পরে রাস্তায়। বনল কে দেখেই বুঝা যাচ্ছিল সে পেশাদার ভ্যান চালক নয়, নিয়তির দায় তাকে এইখানে নিয়ে আসে। গোঙাতেও তার কষ্ট হচ্ছিল, তার এসআর এসে একটা ব্যবস্থা করবে এ আশায় অনেকটা নির্জীব দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে ছিল, আস্ফুট স্বরে বলছিল, 'মা তুমি কই.. মা তুমি আমারে ধরো..।'