উত্তাল রাজ পথ। মুহ মুহ রাবার বুলেট, টিয়ার শেল ছোঁড়া হচ্ছে। অস্ত্র ছাড়াই আমরা। তারপরেও ক্লান্তিহীন ভাবে ইটের টুকরা দিয়ে ঢিল ছুঁরেই যাচ্ছি প্রশাসন ও বিরোধী পক্ষের উপর। একদিকে অস্ত্রশস্ত্র সহ প্রশাসন সাথে রয়েছে বিরোধী পক্ষ অন্য দিকে আমরা নিরস্ত্র। ক্লান্তিহীন ভাবেই লড়েই যাচ্ছি।
এভাবেই দুই তিন দিন ধরে চলছে যুদ্ধ। প্রতিদিনেই রণক্ষেত্রে পরিনত হচ্ছে। বাসায় থাকাও হচ্ছে না। প্রতিদিনেই বাসায় প্রশাসনের টহল। বাসায় রয়েছে সাদা পোশাকে ডিবি পুলিশের নজর দারি।
বাসা হতে পালাতক বউ বাচ্চা প্রতিদিনেই আতংক নিয়ে আছে। প্রায় শুনা যাচ্ছে আজকে একজন গুলিবিদ্ধ, কালকে দুইজন গুলিবিদ্ধ। এমন এক দুর্বিসহ সময় পার করছিল পুরা পরিবার।
সুবর্না ও শর্নার প্রতিদিনের অপেক্ষা। সাত দিন ধরে একটি বারের জন্যেও দেখা হয় নিই। আর মন টানছে না সুবর্না আর কলিজার টুকরা শর্নার জন্য। না কপালে কি আছে আছে আজ বাসায় যাবো। সূবর্না এই অনিশ্চিত জীবন জেনেও আমার সাথে চলে এসেছে সব কিছু ছেড়ে দিয়ে। তাকে এভাবে আর কত কষ্ট দেই।
সূবর্নাকে ফোন দিলাম, জান আমি আজকে রাতে বাসায় আসছি। আমি আসবো ডিনার করবো এক সাথে। অনেকদিন হল তোমার সাথে আর আমার কলিজার টুকরা আমার
আম্মুটার সাথে ডিনার করি নিই।
-- না না ভুল করেও আসিও না। এখানে পরিস্থিতি মোটেও ভালো না। আর দুটা দিন অপেক্ষা কর। পরিস্থিতি শান্ত হোক। আমি তোমাকে হাড়াতে চাই না। কান্না চেপে ধরার ব্যর্থ চেষ্টা করেও কান্না আটকাতে না পেরে ফোন কেটে দেয় সূবর্না।
রাত ঠিক নয় টায় অনেক চুপিসারে বাসায় ঢুকে পরলাম। তিন তলার চিলেকোঠায় ঘর আমার। এতদিন পর আমারে পেয়ে সূবর্না'র তো সেই আনন্দ। সূবর্না জড়িত ধরে সেই কান্না। আমিও তার কান্না থামাতে চেষ্টা করি নিই। কাদুক না, এই কান্না চেপে ধরে রাখার মত না। কিছু কান্না চেপে ধরে রাখতে নেই। কপালে একটা চুমু দিয়ে শর্নাকে কোলে তুলে একটু আদর দিয়ে ফ্রেশ হতে গেলাম।
বাড়ি ফিরলাম আজ ৭ দিন পর। ৪ দিন বাদে গোসল করে আইরন করা কালো সাদা লুঙ্গি পিন্দে শুয়ে পরলাম। সূবর্না ক্রমাগত খোঁচাখুচি করে যাচ্ছে বেশ কয়েকদিন হয়ে গেছে তো। এটা-ওটা ইঙ্গিত করছে। তবে ঘুমের চাপে আমি একদম তলানিতে তলিয়ে যাচ্ছি৷ সূবর্না'র আহ্বানে সারা দেবার শক্তি অন্তত এখন আমার নেই।
ধরপরিয়ে উঠলাম। মধ্যরাতে ঘুম ভাঙলো বৌ'র ধাক্কায়। ওগো শুনছো, তাড়াতাড়ি ওঠ বাড়ি ঘিরে ফেলেছে পুলিশ শয়তান গুলো। দেখি দরজা ভেঙে যাবে এক্ষুনি। কোনমতে উঠেই বউরে আলতো করে ঠোঁটে একটা চুমু দিলাম। ছাদের উপরে উঠে কিনারে এসে তিন তলা থেকে লাফ দিলাম নিচে।
আসে পাশে থাকে গার্মেন্টসের দারিদ্র লোকজন। সব টিনের চালা-ঘর। জান বাঁচানো নাকি ফরজ। দিক বেদিক না দেখেই জানের ভয়ে ঝোঁকের বসে লাফিয়ে পরেছি পাশের টিনসেড বস্তিতে। মধ্যরাতে এ কি ঘটাইলাম। নিস্তব্ধতা ভেঙে দুড়ুম শব্দে টুইন টাওয়ারে মত ধ্বসে পরল টিনের ছাদ সাথে আমিও।
দেখছেন আমি কি ভাগ্যবান! ছাদ ভেঙে আমি পড়েছি একটা বিছানার ওপর। না হলে আরো কি যে হত। আমার আছাড় খাওয়া ওজনে খাট ভেঙ্গে চৌচির। শুধু ভেঙ্গে গেলেই হত। কিন্তু মাটিতে মিশে গিয়েছে খাট। হাত টা মনে হয় দু'খণ্ড হয়েছে।
চোখ খুলে দেখি দূর্ঘটনা ঘটে গেছে। ছেড়াবেড়া হয়ে যাওয়া টিনের চালে পতাকার মত ঝুলছে আমার লুঙ্গি। তার থেকেও বড় দূরঘটন ঘটে গেছে, বেদনায় কাতরাচ্ছে নগ্ন কপোত কপতি।
তাদের চোখে স্পষ্ট ভেসে উঠেছে একই সাথে বিষ্ময়, ঘৃণা এবং সহানুভূতি।।