ঘুমভাঙা এক সকালবেলা পাখির কিচিরমিচির শুনে বিছানার উপর উঠে বসলাম। পার্শ্বে টেবিলের উপরে রাখা চশমার নাগাল না পেয়ে হকচকিয়ে গেলাম। চশমা ছাড়া এখন দুইহাত দূরের কোনকিছুও ভীষণ ঝাপ্সা দেখায়। বার্ধক্য যে মানুষের যৌবন শক্তি, দৈহিক শক্তি, চোখের জ্যোতি শক্তিও কেড়ে নেয় সেটা আজ হলফ করে বলতে পারি। একবার ভাবলাম মেয়েটাকে ডাকি, আবার ভাবলাম আজতো ছুটির দিন নিশ্চয় মেয়েটা এখনো ঘুমোচ্ছে। তাই আর ইরাকে ডাকলাম না। ঝাপ্সা চোখের আবছা দৃষ্টি দিয়ে অনেকসময় চশমাটা খোঁজাখুঁজি করা সত্ত্বেও আর পেলাম না। একটা সময় অনেক খুঁজাখুঁজির পর চশমাটা না পেয়ে যখন হতাশ হয়ে বিছানার উপর স্থির হয়ে বসে রইলাম। হঠাৎ রুমে কারো উপস্থিতি অনুভব করলাম। ভাবলাম ইরা বুঝি ঘুম থেকে উঠেছে। চশমাটা খুঁজে ইরা আমার হাতের মাঝে গুঁজে দিলো। সাথেসাথে চশমাটা চোখে দিতেই হতভম্ব হয়ে গেলাম। আজ আবার প্রায় ১০ বছর পর হঠাৎ এই মহিলাটাকে দেখে নির্বাক চোখে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আমার আর কিছুই বলার ছিলোনা। দেখে মুখটা ফিরিয়েও নিতে পারলাম না। স্বার্থপর মানুষগুলোর মুখভর্তি ভীষণ মায়া থাকে, মায়া মুখোশের আড়ালে থাকে শুধুই নিজের চাওয়া পাওয়ার হিসেব। মেয়েটাকে বেশ কয়েকবার ডাক দিলাম। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলাটি বললেন,-
- 'ইরা ওর রুমেই আছে। কেমন আছো তুমি?'
.
প্রশ্নটা কেন জানিনা খুব তীক্ষ্ণ হয়ে হৃদয় পৃষ্ঠে গিয়ে বিঁধলো। পৃথিবীটা খুব বেশিই বৈচিত্র্যময়, তারচেয়েও বড় বৈচিত্র্যময় এই পৃথিবীর মানুষগুলো। অদ্ভুত লাগে যখন জীবনটাকে কেউ সদ্যোমৃত দেহের মতো শ্মশানে তুলে দিয়ে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়, 'কেমন আছো?'
চোখটা আজ চশমা পরেও ভীষণ ঝাপ্সা হয়ে আসছে। তবে সেইদিনগুলোর মতো আজ আর কেঁদে উঠিনি। ভীষণ আবেগপ্রবণ মানুষ ছিলাম সেই যৌবনে। কখনো খুব কষ্ট পেলে চিৎকার করে কেঁদে ফেলতাম। আর নওশিন সেসময় রেগে গিয়ে বলতো, 'মেয়েদের মতো এমন চিৎকার করে কান্না করো কেন! ছেলে না তুমি!'
নওশিনের সেই শাসনে আমি আমার কান্না থামাতাম। আজ আবার এত বছর পর সামনে পেয়ে খুব বলতে ইচ্ছে হচ্ছিলো, 'জানো নওশিন এখনও আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু দেখ, সেদিনের মতো আমি আর কাঁদিনা।'
সৌজন্যতা বজায় রাখতে নাকি কখনো খারাপ থাকলেও ভালো বলতে হয়। কিন্তু আমার আর নওশিনের মাঝেতো কখনো কোনো সৌজন্যতা ছিলোনা। তাহলে কি আজ সেই সৌজন্যতার আশ্রয় নিয়ে বললো 'আমি ভালো আছি?'
হ্যা আজ নিতেই হবে। সেদিনের ইমুটা ইমু থাকলে সেদিনের নওশিনের সাথে এই নওশিনের বিশাল বড় ব্যবধান। আমি তার প্রশ্নের জবাব দিলাম। খুব সৌজন্যতা রেখেই তার প্রশ্নের জবাব দিলাম,- - 'আমি ভালো আছি, আপনি?'
- 'আমাকে আপনি করে বলছো কেন!'
- 'আজ অনেকদিন পর দেখা হলো তো তাই কি বলে সম্বোধন করবো বুঝতে পারিনি। তাছাড়া কাছের মানুষগুলো সাথেই কেবল তুই তুমি করে বলা উচিত।'
- 'আজও খুব কথার আঘাত দিতে জানো তুমি।'
- 'যার ভিতরটাই আঘাত দিয়ে জর্জরিত তার মুখ থেকে ভালোলাগার কথা বের হওয়াটা দুষ্কর।'
- 'ফ্রেস হয়ে খাবার টেবিলে এসো। নাস্তা বানিয়েছি।'
- 'তুমি কি করে ভাবলে তোমার বানানো নাস্তা আমার পেটে পরবে!'
- 'ভাবিনা, খুব ইচ্ছে হয়েছিলো তোমাকে দেখার। তাই ছুটে এসেছিলাম।'
- 'হা হা হা, আবারো হাসালে। আমাকে দেখার জন্য নাকি মেয়েটাকে দেখার জন্য?'
- 'দুজনকেই,'
- দেখেছো?'
- 'হুম দেখেছি।'
- 'এখন তাহলে চলে যাও। তোমার কোনো ছায়া আমার মেয়েটার উপরে পরুক সেটা আমি চাইনা সেটা আমি তোমাকে পূর্বেই বলেছি। দয়া করে আর কখনো এখানে এসোনা। যতটুকু সময় পৃথিবীতে আছি নতুন কোনো গল্পে আর নিজেকে জড়াতে চাইনা। মেয়েটাকে এখন একটা ভালো ছেলের হাতে তুলে দিতে পাড়লেই নিশ্চিন্তে ঘুমাতে যাবো।
- 'চলে যাচ্ছি আমি। ফোন দিলে ফোনটা রিসিভ কইরো।'
.
আমি কিছু না বলে চুপ হয়ে রাইলাম। নওশিন চোখেরজল চাপা আঙুল দিয়ে মুছে বাসা থেকে বেরিয়ে গেল। আমি উঠে গিয়ে দুজনার কাটানো সেই বেলকুনিটার মাঝ লোহাগড়া গ্রিল ধরে দাঁড়ালাম।
.
আজ থেকে প্রায় ২৬ বৎসর পূর্বে আমি আর নওশিন ভালবাসার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলাম। তখন পড়াশোনা শেষ করে ভালো একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরীও ছিলো আমার। বিয়ের পর অনেক ভালোই সময় যাচ্ছিলো আমাদের। আমি রোজ সকালে অফিসে চলে যেতাম আর এদিকে নওশিন তার পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে পড়াশোনায় সারাদিন ভীষণ ব্যস্ত থাকতো। রাতের খাবার খাওয়ার জন্য রান্নাবান্না শেষ করে আমার ফেরার অপেক্ষায় বসে থাকতো একসাথে খাবে বলে। আমাদের সবকিছুই ঠিকঠাক চলছিলো। কিন্তু ১ বছর যেতেনা যেতেই আমাদের মাঝে ভীষণ ঝগড়া বাধতে শুরু হলো। কারণেঅকারণে নানান বিষয় নিয়ে অল্পতেই আমাদের মাঝে ঝগড়া লেগে যেত। একটা সময় ঝগড়াঝাঁটি করতে করতে সম্পর্কেটার মাঝে তিক্ততা এসে বাসা বেঁধে ফেললো। সাময়িক ঝগড়ায় ভালবাসার গভীরতা বাড়ে, আর অধিক ঝগড়ায় একটি সম্পর্কের মাঝে তিক্ততা এসে দানা বেঁধে ফেলে। ঠিক সেই মুহূর্তটাতেই নওশিনের বাচ্চা কনসেপ্ট হলো। আর তাতেই আরও বেড়ে গেল ঝগড়ার পরিমাণ। নওশিন সেসময়ে বাচ্চা নিতে নারাজ ছিলো। তার ইচ্ছে ছিলো রেজাল্ট বের হওয়ার পর সেও চাকরী করবে। তারপর কয়েকবছর পর বাচ্চা নিবে। কিন্তু আমার কাছে সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিলো বাচ্চাটা নষ্ট করে ফেলা একদম উচিৎ হবেনা। তাছাড়া ইসলামের বিধানেও সেটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তাই বাচ্চাটা যেন নষ্ট করে সেজন্য বাধা দিলাম। এই বাধা দেওয়াই একপর্যায় বড় ঝগড়ার কারণ হয়ে দাঁড়ালো। নওশিন প্রেগন্যান্ট অবস্থায় খুব বাজে ব্যবহার করতে শুরু করলো আমার সাথে। আমি সবকিছুই মেনে নিচ্ছিলাম শুধু গর্ভে থাকা বাচ্চাটার কথা ভেবে। কখনো কোনোকথার প্রতিবাদও করিনি একটাবার। মাঝেমাঝে অনেকটা ধৈর্যহারা হয়ে পরতাম। নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে বাসা থেকে বের হয়ে যেতাম তবুও নওশিনকে কখনো গালমন্দ করতাম না। মাঝেমাঝে অফিস শেষে রাতে বাসায় ফিরে দেখতাম বাসায় কোনকিছুই রান্না করা হয়নি। ফের বাইরে গিয়ে দুজনের জন্যে খাবার নিয়ে এসে খেয়ে তারপর ঘুমাইতাম। এইসব কিছু দেখতে দেখতেই সময় গুলো অতিবাহিত হয়ে যাচ্ছিলো। একটা সময় আমাদের কোলজুড়ানো ফুটফুটে একটি বাচ্চা আসলো যার নাম দুজনে মিলে ঠিক করে রাখলাম 'ইরা'। ভেবেছিলাম বাচ্চা কলে আসলে নওশিনের বুঝি রাগ ঝগড়াঝাঁটি করা কমে যাবে। কিন্তু আমার ধারণাটা সম্পূর্ণ ভুল হলো। খেয়াল করলাম নওশিন পিচ্চি মেয়েটাকে অগ্রাহ্য করছে নানাভাবে। আমাকেও যা খুশি তাই বলে গালমন্দ করতো। বুঝতে পারলাম আমি কোনকিছু না বলতে বলতে নওশিনকে প্রশ্রয় পেয়ে গেছে। প্রতিবাদ করলে প্রতিঘাত হবে জেনে কখনো নওশিনকে কিছুই বলিনি। একদিন ছুটির দিনে ছোট্ট একটা ব্যাপার নিয়ে কথাকাটি হচ্ছিলো দুজনার মাঝে। নওশিন রেগে গিয়ে হঠাৎ হাতের কাছের কাঁচের গ্লাসটা আমার দিকে ছুড়ে মারলো। সেদিন ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে রেগে গিয়ে গালে একটা থাপ্পড় মেরেছিলাম। পরদিন অফিস শেষে বাসায় ফেরার পর দেখলাম নওশিন বাসায় নেই। ইরা বিছানার উপর বসে চিৎকার করে কান্না করছে। রান্নাঘর, ওয়াশরুম, আশেপাশের বাসাগুলোতেও খোঁজ নিলাম। দেখলাম নওশিন কোথাও নেই। দের বছরের ছোট্ট এই শিশুটিকে একলা রেখে নওশিন বাসা থেকে চলে গেছে সেকথা ভাবতেই ভীষণ কষ্ট হচ্ছিলো। মেয়েটাকে কোলে তুলতে গিয়ে দেখলাম বিছানার উপর একটা সাদা কাগজ রাখা। ইরাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে কাজগটা হাতে তুলে নিয়ে দেখলাম কিছু লেখা রয়েছে তাতে। দুইটি লাইন লিখে রেখে গিয়েছে নওশিন,-
"আমাকে আর ফেরানোর চেষ্টা করোনা,
ডিভোর্স লেটারটা সঠিক সময় পেয়ে যাবে"
.
লেখাটা পড়ে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। ফোনটা হতে নিয়ে নওশিনকে ফোনকল দিলাম। দেখলাম নওশিন ফোনের সুইচড অফ করে রেখেছে। ভাবলাম হয়তো বাড়িতে চলে গিয়েছে রাগ করে। সেকথা ভেবে নওশিনের বাবাকে ফোন দিলাম। তিনি বললো নওশিন তার ঐখানে যায়নি। কোথায় গেল সে চিন্তায় ছুটে গেলাম ওদের বাড়িতে। গিয়ে দেখলাম সত্যিই নওশিন সেখানে যায়নি। একের পর এক আত্মীয়স্বজনদের ফোন দিয়ে নওশিনের খোঁজ করতে লাগলাম। সবাই শুধু নিষেধ করেই যাচ্ছিলো কারো বাসায় নওশিন যায়নি। শেষমেশ রাত প্রায় ১২টার দিকে নওশিনের বাবার ফোনে নওশিনের ফোন আসলো। ফোনে নওশিন তার বাবাকে বললো,- - 'বাবা আমি আবিরের সাথে দেশের বাহিরে চলে যাচ্ছি এখন। নিজের খেয়াল রেখ। আর আমাকে ক্ষমা করে দিও।'
.
আমি তখন তার পাশেই বসেছিলাম। লাউটস্পিকার দেওয়ায় সেসব কথা স্পষ্টভাবে আমি নিজ কানে শুনতে পেলাম। সমস্ত ঘটনাটাই খুব স্পষ্ট হয়ে গেল আমার কাছে।
আবির ছিলো ওর ক্লাসমেট। শুনেছি আবিরও ওকে ভালবাসতো একসময়। কিন্তু আবির'রা চারবছর আগেই সপরিবারে ফ্রান্সে চলে গেছে। কিন্তু এতদিনও যে নওশিন আবিরের সাথে যোগাযোগ রেখেছে সেটা কখনো বুঝতে পারিনি। বুঝবোই বা কি করে, যাকে ভালো রাখার জন্যে দিনরাত হুমড়ি খেয়ে অফিসে পরে থাকতাম, তার সময়টা যে একলা বাসায় থেকে অন্যকেউ পেয়েছে। নওশিন আমার সাথে এমনটা করতে পারবে কখনো বুঝতেও পারিনি একবারও। ঝগড়াঝাঁটির প্রকৃত কারণগুলো এখন খুব স্পষ্ট হয়ে গেল আমার কাছে। গতকালের গ্লাস ছুড়ে মারাটাও হয়তো একটা সাজানো গোছানো নাটক ছিলো তাদের। নওশিনের বাবাকে আমি আর কোনোকথাই বললাম না। নতশির মানুষগুলোকে কিছু বলার চেয়ে না বলাই ভালো। নিঘুম একটি রাত্রি কাটিয়ে মেয়েটাকে নিয়ে বুকে জড়িয়ে সেদিনই শেষবার চলে আসলাম নওশিনদের বাড়ি ছেড়ে। নিজের মন থেকে আর কখনো প্রশ্ন আসেনি কেমন আছে নওশিন প্রবাসে। মেয়েটাকে বড় একটা মিথ্যে বলে আজ বড় করেছি। একবার জিজ্ঞাস করেছিলো মেয়েটা তার মা কোথায়। বলেছিলাম সে ছোট থাকতেই তার মা মারা গেছে। মিথ্যেটাকেই সত্য ভেবে মেয়েটা আজ বেড়ে উঠেছে। ১ যুগ পর বিদেশ থেকে ফিরে নওশিন একদিন কৌতূহল নিয়ে দেখতে এসেছিল আমার নতুন সংসার। বাড়িতে হঠাৎ নওশিনের উপস্থিতি দেখে অনেকটা অবাক হয়েছিলাম প্রথমবার। গত ১ যুগে অনেকটা বদলে গেলেও নওশিনকে চিনতে একটু কষ্ট হয়নি আমার। দেখেই অনেকটা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিলো শরীর। কিন্তু মেয়েটার জন্যে তখন নিশ্চুপ হয়ে বসে ছিলাম। ১৪ বছরের মেয়েটি তখন নওশিনকে দেখে প্রশ্ন করে বসলো,- - 'বাবা উনি কে?'
.
খুব সহজভাবেই একজন নাট্যমঞ্চের অভিনেতা বানিয়ে নিলাম নিজেকে। আমি বললাম,- - 'উনি তোমার আন্টি হয় বাবা।'
- 'কি নাম উনার?'
- 'উনি তোমার ছায়া আন্টি হয়।'
.
ইরা ছায়া আন্টি বলে তার কাছে গিয়ে জড়িয়ে ধরে বললো,- - 'কেমন আছো আন্টি?'
.
তখন আমি নিজের চোখেরজলটা বারবার মুছে নিচ্ছিলাম। ইরার চোখে যেন না পরে এই জল সেএইজন্য। নওশিন সেদিন কেঁদেছে। নিজের মেয়ের মুখে আন্টি ডাক শুনে সেদিন নওশিনও খুব কেঁদেছে। ইরা নওশিনের কান্না দেখে জিজ্ঞাসা করলো,- - 'কাঁদছো কেন আন্টি?'
.
নওশিন বললো,- - 'অনেকদিন পর তোমায় দেখলাম তো তাই। তোমার আম্মু কোথায়?'
.
নওশিন বললো,- - আপনি কি জানেন না, আমার আম্মুতো সেই ছোটবেলায়ই মারা গেছে।
.
নওশিন বুঝেই নিলো আমি আর দ্বিতীয়বার বিয়ে করিনি সে চলে যাওয়ার পর। কান্নাটা আটকে রাখতে না পেরে আমি গোসলখানায় গিয়ে পানিরট্যাপ ছেড়ে বেশকিছুক্ষণ সময় দাঁড়িয়ে রইলাম। খানিকক্ষণ পর মুখটা ধুয়ে ফিরে এসে দেখলাম নওশিন ইরাকে পাশে বসিয়ে গল্প করছে। ইরাকে বললাম,- - 'বাবা ফ্রিজ থেকে একবোতল পানি নিয়ে এসে তোমার আন্টিকে দাও।'
.
ইরা পানি আনার জন্যে চলে গেল। আমি খুব দ্রুত নওশিনের হাত ধরে টেনে নিয়ে বাসা থেকে বের করে দিয়ে দরজা লাগিয়ে দিলাম। আর বলেদিলাম, 'কখনো যেন তোমার ছায়াটাও আমার মেয়েটার উপর না পরে।' ইরা পানির বোতল নিয়ে এসে জানতে চাইলো,- - 'বাবা আন্টি কোথায়?
.
আমি বললাম,- - 'তোমার আন্টির একটা জরুরী ফোন এসেছে তাই সে চলে গেছে। বলেছে সময় করে আবার আসবে।'
.
মেয়েটা মুখটা মলিন করে পানির বোতলটা আবার ফ্রিজে রাখতে চলে গেল। ১০ বছর পর আবার নওশিন এসেছে। আজও তাকে মুখে বলেই তাড়িয়ে দিয়েছি। ইরা চা বানিয়ে নিয়ে এসে বললো,- - 'বাবা ছায়া আন্টি কোথায় গেল?'
- 'জরুরী ফোন পেয়ে চলে গেছে।'
- 'কি অদ্ভুত উনি আসলেই কি উনার জরুরী ফোন আসে? সেই ছোটবেলায় একবার এসেছিলো সেদিনও এভাবে ফোন আসতেই চলে গেল। আজ এত বৎসর পর আসলো আজও ঠিক একইভাবে চলে গেল! সত্যিই বড় অদ্ভুত লাগে! উনি কেন এভাবে চলে যায়?
- 'সেতো অনেক আগেই চলে গেছে মা!'
- 'কি বললে?'
- 'না কিছুনা, বললাম ছায়া আন্টিতো সূর্য যতক্ষণ থাকে ততক্ষণই পাশেপাশে থাকে। তারপর যখন সূর্য ডুবে যায় ছায়াটাও পাশ থেকে সরে যায়। বেলা শেষ তাই হয়তো চলে গেল।'
- 'কি যে অদ্ভুত কথাবার্তা বলোনা মাঝেমাঝে! যাও চা খেয়ে রেডি হয়ে নাও। আজ আমাদের অফিসের বর্ষপূর্তি প্রোগ্রাম আছে। সেখানে তোমাকে নিয়ে যাবো।'
- 'না না আমি ওসব প্রোগ্রামে যাবো না মা।'
- 'কেন যাবেনা শুনি?'
- 'এমনিই,'
- 'কোনোকথা চলবেনা বললাম। যা বলছি সেটাই করতে হবে। মায়েদের কথা অমান্য করতে হয়না। যাও বলছি তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নাও।'
.
মেয়ের শাসনটা সত্যিই সেসময় মায়ের মতোই ছিলো। মা ও মেয়ে হয়, মেয়ে ও হয় মা। মায়ের সাথে তখন এই বৃদ্ধ ছেলেটা যাওয়া জন্যে সম্মতি দিয়ে দিলো। আর তাতেই ফুটে রইলো ইরার মুখে একগাল হাসি।