কোথায় তুমি?
-এইতো আসছি।
-আর কতক্ষন বসিয়ে রাখবে আমাকে?
-এই পাচ মিনিট,আসছি আমি।
-হুম আসো।
কথাটি বলেই মালিহা ফোনটা রেখে দিল।মেয়েটা অনেক্ষন যাবৎ অপেক্ষা করছে আমার জন্যে।আসলে মাঝে মাঝেই আমার এরকম আসতে একটু দেড়ি হয়।কিন্তু এ নিয়ে মালিহার কোন কথা নেই।মেয়েটা একটু বেশীই ভালবাসে আমাকে।
"
মালিহার সাথে আমার রিলেশন প্রায় তিন বছর হবে।অফিস শেষে প্রায় প্রতিদিনই মেয়েটার সাথে দেখা করি।
যখন জব ছিল না তখন আমি সব থেকে বেশী সাপোর্ট পেয়েছি মালিহার থেকে।মেয়েটা সবসময় আমার পাশে থেকে সাহস জুগিয়েছে।
"
এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে চলে এসেছি সে খেয়ালই নেই।দূর থেকে মালিহাকে স্পষ্টই দেখতে পাচ্ছি।মেয়েটা হয়তো বেশ রেগে আছে।আমি মালিহার পাশে গিয়ে বসতেই মেয়েটা কেমন করে যেন তাকালো।আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই মালিহা টিস্যু দিয়ে আমার মুখ মুছতে মুছতে বললো,
-একদম ঘেমে গেছো।
-দেড়ি হচ্ছিলো তো তাই একটু দৌড়ে আসছিলাম।
-দেড়ি হচ্ছে হোক,তাই বলে দৌড়ে আসতে হবে।আমি তো আছিই।
মালিহার কথায় আমি কিছু বলতে পারলাম না।ভেবেছিলাম দেড়ি করে আসাতে মেয়েটা রাগ করবে কিন্তু এখন দেখছি উল্টোটা।
মালিহাকে যতই দেখছি ততই ওর প্রেমে পড়ে যাচ্ছি।
"
যেদিন জব পেয়েছিলাম সেদিন আমার থেকে মালিহাই বেশী খুশি হয়েছিল।তবে সেদিনও আমি মালিহার সাথে দেখা করতে দেড়ি করেছিলাম।আমি আসার সাথে সাথেই মালিহা বললো,
-চাকরী হয়েছে?
আমি মাথা নিচু করে বললাম,
-না।
-মন খারাপ করো না,দেখো একদিন ঠিক হয়ে যাবে।
-এই কাগজটা ধরো।
-কিসের কাগজ?
-খুলে দেখো।
মালিহা কাগজটা দেখে আমার দিকে রাগি চোখে তাকিয়ে বললো,
-মিথ্যে বললে কেনো?
-সারপ্রাইজ।
সারপ্রাইজ না,কথাটি বলেই মালিহা আমার বুকে মুখ লুকালো।আমি কিছু বলার আগেই মালিহা বললো,
-চলো।
-কোথায়?
-বাবার কাছে।আমি আর দেড়ি করতে চাই না।
-কিন্তু একটা প্রস্তুতির তো ব্যাপার আছে।
-নাহ কিছুই লাগবে না।চলো।
মালিহার জেদের কাছে আমি হেরে গেলাম।মেয়েটা একবার যেটা বলবে সেটাই করবে।সেদিন মালিহার বাসায় আমার সাথে আমার বাবা মা ও গিয়েছিল।বিয়ের ব্যাপারে ওনাদের দায়িত্বটাই বেশী।
"
মালিহা এবার ঘাম মুছে দিয়ে বললো,
-দুপুরে খেয়েছো?
-আসলে হইছে কি কাজের.......
মালিহা আমাকে আর কিছু বলতে না দিয়ে ব্যাগ থেকে একটা টিফিন বাটি বের করলো।এটা আবার কি।
'
হা করো।
'
মালিহার কথায় আমি হা করতেই মেয়েটা আমাকে টিফিন বাটিতে আনা বিরিয়ানি খায়িয়ে দিল।বাহ বেশ মজা হইছে।মেয়েটা আমাকে এত ভালবাসে কেন।আমি মালিহাকে বললাম,
-সারাজীবন এভাবেই ভালবাসবে তো।
-খাওয়ার সময় কথা বলতে নেই,চুপচাপ খেয়ে নাও।
"
প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এসেছে।মালিহা আমার কাধে মাথা রেখে বসে আছে আর ওর ছোট ছোট স্বপ্নগুলোর কথা বলছে।আমাদের বিয়ের আর মাত্র কিছুদিন বাকি।বিয়ের পর কোথায় ঘুরতে যাব,আমাদের কয়টা বাচ্চা হবে,এমনকি তাদের নামও ঠিক করে ফেলেছে।
মেয়েটার পাগলামো দেখে মাঝে মাঝে না হেসে পারিনা।
"
মালিহাকে ওর বাসার সামনে নামিয়ে দিতেই মেয়েটা আমার হাত শক্ত করে ধরে বললো,
-সারাজীবন এভাবেই ভালবাসবো।
"
আজ দু দিন হলো মেয়েটার সাথে দেখা হয় না।আসলে অফিসে কাজের চাপে সময়ই হয় না।ভাবছি কাল অফিস ছুটি নিয়ে মেয়েটার সাথে সারাদিন ঘুরবো।মেয়েটা খুব বেশীই খুশি হবে।
'
দুপুরের দিকে মেয়েটা ফোন করে বলেছিল,আমার জন্যে নাকি কালো পাঞ্জাবী কিনেছে।বিয়ের দিন নাকি এটাই পড়তে হবে আমাকে।বিয়েতে কি কেও কালো পাঞ্জাবী পড়ে।তবে আমি পড়বো।মালিহার খুশির জন্যে আমি সব করতে পারি।
"
সন্ধার পর বাসায় ফিরে মালিহাকে ফোন দিলাম কিন্তু ধরলো না।সেই সকালে বের হইছে শপিং এর জন্যে।বাসায় ফিরলো কি না জানতে হবে তো।কিন্তু মেয়েটা ফোন ধরছেই না।হয়তো অন্য কিছুতে ব্যাস্ত আছে।
'
আমি ফ্রেশ হয়ে বের হতেই ফোনটা বেজে উঠলো।মেয়েটা হয়তো ফোন দিয়েছে।আমি ফোন ধরতেই দেখি নাদিয়ার ফোন।মালিহার ছোট বোন মানে আমার একমাত্র শালী।আমি ফোন ধরতেই নাদিয়া কান্না জড়িত কন্ঠে বললো,
-ভাইয়া একটু আমাদের বাসায় আসুন।এখনি।
কথাটি বলেই নাদিয়া ফোন কেটে দিল।কিন্তু ও কান্না করছে কেন।ওর বাবার শরীরটাও কিছুদিন হলো ভাল না ওনার কিছু হলো নাকি।
আমি আর দেড়ি না করে বেড়িয়ে পড়লাম।
"
পুরো বাড়িটা কেমন যেন নিড়ব হয়ে আছে।কোন শব্দ নেই। আমি কলিং বেল বাজাতেই মালিহার বাবা দড়জা খুলে দিল।আরে উনি তো সুস্থই আছে,তাহলে কি মালিহার কিছু হয়েছে।
আমি রুমে ঢুকতেই দেখি মালিহার নিথর দেহ ফ্লোরে পড়ে আছে।আশেপাশে দু একজনকে দেখতে পেলাম মুখ লুকিয়ে কাদছে।
মালিহার এ অবস্থা দেখে বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠলো।বুকটা মনে হয় চিড়ে যাচ্ছে।মেয়েটার শরীরে বেশ ক্ষতের চিহ্ন।পাশে আমার জন্যে কেনা কালো পাঞ্জাবিটা কেমন যেন লাল দেখাচ্ছে।মালিহার এ অবস্থা দেখে আমি কিছুই বলতে পারছি না।কি হয়েছে ওর।
'
আমি মালিহার পাশে বসে ডুকরে কেঁদে উঠলাম।এভাবে কোনদিনও কাদিনি আমি।নাদিয়া আমার পাশে বসে বললো,
-কিছুদিন হলো এলাকার কয়েকটা ছেলে আপুকে বিরক্ত করতো।আজ যখন আপু বাসায় আসছিল তখনি ওরা আপুর উপর ঝাপিয়ে পড়ে।পাশের গলিতে নিয়ে আপুকে ওরা ধর্ষন করে।
এটুকু শুনতেই আমার শরীরটা কেমন যেন অবশ হয়ে এলো।
মালিহার নিস্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে আমি আর কান্না আটকে রাখতে পারলাম না।মালিহাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করে দিলাম।
ওর হাতে আমার পড়ানো আংটিটা বেশ চকচক করছে।হাতের মেহেদী রক্তে যেন আরও লাল হয়ে উঠেছে।
'
মালিহা এই মালিহা,আমার জন্যে এখন কে অপেক্ষা করবে, ঘেমে থাকা মুখ কে পরিষ্কার করে দেবে,আমাকে নিজ হাতে কে খায়িয়ে দেবে,এই কালো পাঞ্জাবিটা আমি কার জন্যে পড়বো।কার জন্যে।
"
আমাদের স্বপ্নগুলাও ছিল বেশ ছোট।ভেবেছিলাম সারাটাজীবন বেশ সুখেই কাটিয়ে দেবো দুজন।কিন্তু কিছু হায়েনার জন্যে আমাদের স্বপ্নগুলা একেবারে শেষ হয়ে গেলো।
"
আমাদের দেশে এমন কিছু মানুষ আছে যারা অন্যের সুখ এক মুহুর্তে শেষ করে দিতে পারে।এই মেয়েটার কি দোষ ছিল।দু দিন পর বিয়ে।হাতে বেশ গাড় করেই মেহেদী লাগিয়েছিল এটাই কি তার দোষ।ছোট ছোট স্বপ্ন দেখেছিল এটাই কি তার দোষ।বরের জন্যে একটা পাঞ্জাবিও কিনেছিল,কালো পাঞ্জাবিটা রক্তে লাল হয়ে গেছে।
"
এভাবেই শেষ হয়ে যায় হাজারো মালিহার জীবন,আর তাদের অপেক্ষায় থাকা আমার মত মানুষগুলা।ও হয়তো মারা গিয়েছে কিন্তু আমি বেচে থেকেও মৃত।মানুষ কিছুদিন আফসোস করবে তবে তার পরেই ভুলে যাবে মালিহাকে।
মালিহার মত হাজার হাজার মেয়েকে ভুলতে হয়তো সময় লাগবে না।কিন্তু আড়ালে থাকা মানুষটা একদিন ঘরকুনো হয়ে যাবে।মালিহার সৃতি বয়ে বেড়াবে সারাটা জীবন।
(তোমাকে আসতেই হবে)