বললেই কি দেখা করা যায়? ( আমি )
- আমি জানিনা। করতেই হবে ( রাশা )
- দেখি
- কিসের দেখি? গত ৬ মাস ধরে দেখা হয় না সেটা মাথায় আছে তোমার ( রাগে )
- হু
- হু হু করবানা একদম। রাগ হচ্ছে আমার
- আচ্ছা শোনো....
- আম্মু আম্মু... রাখলা....
( টূট টূট টূট )
ফোন টা নামিয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি ফোনের দিকে । হঠাৎ করে ফোন কেটে দেয়াটা আমার একদম পছন্দ না। বিশেষ করে সেটা যদি রাশা হয় তাহলে আর কোনো কথাই নেই । এত্ত রাগ হচ্ছে যে বলার মত না ।
.
তিন বছর হতে চলল আমাদের সম্পর্কের । একথা আম্মুও জানে । রাশার সাথে দেখাও হয়েছে আম্মুর ।
.
বারান্দা থেকে রুমে আসলাম। ঘড়িতে রাত ১১.২৩ । ছাদে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে।
প্রতিদিন এসময় ছাদে না গেলে আমার ঘুম হয় না। ড্রয়ার থেকে চাবি নিয়ে চলে আসলাম।
দাঁড়িয়ে আছি ছাদের এক কোণায়। এর মধ্যেই নীলাদ্রী আপুর ফোন - - কি করো? ( নীলাদ্রি আপু )
- বাথরুমে ( আমি )
- ওহ, আচ্ছা। বের হয়ে ফোন দিও।
- হুম
কেটে দিলাম। ইনি হচ্ছে আপুর মত দেখতে girlfriend। যদি বাথরুমে না বলতাম তাহলে প্রেম শুরু করে দিত। আমাকে পছন্দ করে। যদিও সেটা মুখে কখনো বলে নি। ইশারায় বুঝিয়েছে আর কি। নীলাদ্রি আপু আমার থেকে ২ বছরের বড়। আমাদের পাশের ফ্ল্যাটে থাকে। আম্মুর সাথে ভাল পরিচয় আছে। কিন্তু আমি তাকে অতটা পাত্তা দেই না ।
.
ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি পড়ছে। তবুও দাঁড়িয়ে আছি। ভালোই লাগছে। রাশা থাকলে আর একটু ভাল হত। ভাবতে ভাবতে যখন ই একটু রোমান্টিক হতে যাব তখন ই আম্মুর ফোন - - কোথায় তুমি?
- এমন সময় আমি কোথায় থাকি?
- বাসায় আস এখনি
- ৫ মিনিট
- তাড়াতাড়ি
.
বৃষ্টি বেড়ে যাচ্ছে। এখন যাওয়া উচিৎ। ছাদ তালা লাগিয়ে রুমে এলাম। - এতো রাতে ছাদে যেতে না করেছি তোমাকে ?
- কিচ্ছু হবে না আম্মু
- যেদিন হবে সেদিন আর একথা থাকবেনা। খেয়ে নাও। টেবিলে খাবার রাখা আছে
- আচ্ছা
.
খেয়ে ল্যাপটপটা নিয়ে একটু বিছানায় বসলাম। এর মধ্যেই রাশার মেসেজ - - কি করছো ? ( রাশা )
- কিছু না বসে আছি ( আমি )
- খেয়েছ ?
- হুম
- আচ্ছা আমার ঘুম পাচ্ছে আমি ঘুমালাম
- গুড নাইট
.
ফেসবুকে এলাম । ঘুম পাচ্ছে খুব। তবুও ফেসবুকে তাকিয়ে আছি ।
চোখ লেগে আসছে । ল্যাপটপ রেখে ঘুমিয়ে পড়লাম ।
সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি সকাল 11 টা বাজে । রাশার ৪ টা মেসেজ । সব গুলো তার মত করে reply দিলাম ।
ফ্রেশ হয়ে খেয়ে নিলাম । বের হব একটু কাজ আছে ।
কাজ শেষ করে রাস্তা দিয়ে ফিরছি । দুপুরের কড়া রোদ টুকু সবটা আমার মাথার ওপরে ।
ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম , কিন্তু হঠাৎ করে কোথা থেকে যেন একটা রিকশা এসে পেছন থেকে ধাক্কা মারল । হুমড়ি খেয়ে পড়লাম ।
আমি কিছু বলার আগেই রিকশাওয়ালা বলে উঠলো - - ইস ব্যথা পাইছো বাবা ?
- দিয়ে আবার জিজ্ঞেস করতেছেন ?
- দেহিনাই । বেরেকটা ঠিকমত কাজ করতেছে না ।
- চালানোর সময় চোখ কোথায় থাকে ?
- আসলে বাবা ...
- কি হইছে ভাই ?
( হঠাৎ করে কোথা থেকে একটা লোক এসে বলল । পথচারী মনে হচ্ছে ) - কিছু হয় নাই ভাই আপনি যান ( আমি )
.
সব মিটমাট করে আমি এসে পড়লাম । আরেকটু হলেই ঐখানে ছোটখাট একটা ঝামেলা হয়ে যেত । আজকালকার পাবলিক বলা তো যায় না । ধরে দু এক ঘা লাগিয়ে দেবে রিক্সাওয়ালাকে ।
হাতটা অনেকটা কেটে গেছে । ব্যান্ডেজ করে বিছানায় এসে বসলাম ।
ফোন বের করেই দেখি রাশার 17 টা মিসড কল ।
৩ বছরে এই প্রথম রাশা আমাকে এতো গুলো কল দিয়েছে। আমি সাথে সাথে ফোন ব্যাক করলাম । - কোথায় ছিলে তুমি এতক্ষন ( রাশা , রাগে )
- একটু বাইরে গিয়েছিলাম কাজে কিন্তু ছোটখাটো একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেছে ( আমি )
- কি হয়েছে
- ফেরার সময় একটা রিকশা এসে পেছন থেকে লাগিয়ে দিয়েছিল । হাতটা অনেকটা কেটে গেছে, তোমার call দেখতে পাইনি
- এখন কোথায় তুমি
- আমার রুমে
- টুট টুট টুট
.
আমি বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম । একটু আগেও তো রোদ ছিল কিন্তু এখন দেখছি আকাশটা মেঘলা । মেঘ গুলো সূর্যটাকে আড়াল করে রেখেছে । বড় রকমের বৃষ্টি হবে মনে হচ্ছে । একটু একটু ঠান্ডা বাতাস চারপাশটাকে আরও রোমাঞ্চকর করে তুলেছে । আট তলার ওপর থেকে পরিবেশটা অনেক উপভোগ্য ।
.
হঠাৎ দরজা খোলার শব্দ পেলাম । কেউ এসেছে মনে হচ্ছে । - ভাল আছি মা তুমি কেমন আছো ( আম্মু )
- ভাল আছি মা
( পরিষ্কার রাশার কন্ঠ শুনতে পেলাম । ও আমার আম্মুকে মা বলেই ডাকে । কিন্তু হঠাৎ ও এখানে কেন । যাকে আমি জোর করেও মার সামনে আনতে পারিনি আজ সে স্ব-শরীরে নিজে উপস্থিত ) - জয় কোথায় মা
- ওর রুমে আছে হয়তো
( রুমে কেউ আসলো । বুঝতে পারলাম সেটা রাশা ছাড়া আর কেউ না ) - জয়য়য়য়য়য়য়য়য়য়য়য়.......( জোরে ডাক দিল )
- এখানে এএএএএ .....
.
বারান্দায় আসলো ও । আমি বারান্দার একপাশে দাঁড়িয়ে আছি । ও ওপাশ থেকে সোজা দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল । হঠাৎ এরকম অবস্থায় হাতটাকে সামলে রাখতে পারিনি । তাই একটু ব্যথাও পেলাম কিন্তু সেটা প্রকাশ করলাম না - কতগুলো ফোন দিয়েছি তোমাকে একটা ফোনও ধরনি , তুমি জানো আমি কত টেনশনে ছিলাম ? ( রাশা ) ( কেঁদে কেঁদে )
- আমি রাস্তায় ছিলাম ঠিক শুনতে পাইনি । sorry
- কোথায় ব্যথা পাইছো ?
( আমাকে ছেড়ে দিয়ে ) - এই তো এখানে । হাতে । বেশি না
- একদম চুপ দুপুরে খেয়েছ ?
- না এখনো হয়নি
.
ও খাবার এনে, নিজ হাতে আমাকে খায়িয়ে দিচ্ছে। - খুব ভালোবাসো না আমায়? ( আমি )
( ও আমার দিকে এমন ভাবে তাকালো যে খুব কঠিন একটা প্রশ্ন করেছি। করুন দৃষ্টিতে তাকালো ও। বুঝতে পারলাম রাশার কষ্ট হচ্ছে। জড়িয়ে ধরলাম তাকে। ওর কষ্ট আমার একদম সহ্য হয় না ) - আমি আছি তো ( আমি )
- ভয় করে তবুও
- কিচ্ছু হবেনা। সব ঠিক হয়ে যাবে
( ও আমাকে ছেড়ে দিয়ে বাকি খাবার টা শেষ করল )
.
রাশা বলল - আমি গেলাম। কাল আবার আসবো। প্রেম করতে...
এই কথাটা বলেই একটা হাসি। মনে হচ্ছে আমি থাকতে পারবনা সেই মুচকি হাসির টানে।
আম্মুকে সালাম করে চলে গেল আমার ভবিষ্যৎ বউ। আমি এগিয়ে দিয়ে আসলাম কিছু দূর।
.
রুমে এসে ভাবতে লাগ্লাম মেয়েটার কথা।
.
রাশা সহ তারা ৩ বোন। কি আছে মেয়েটার ?
তিন বছর আগে যখন তার সাথে দেখা হয়েছিল তখন আমি এসব কিছুই জানতাম না। আসলে সে আমাকে কখনো বলেনি।
সম্পর্কের ৭ মাসে আমি জানতে পারি সবকিছু।
ওরা ৩ জন সহ ওর মা বাবা থাকে একসাথে। কিন্তু একসাথে থাকার আনন্দটা রাশা পায়নি কখনো।
ওর বাবা ওকে দেখতেই পারতো না। ও ওর বাবার আদর পায় নি কখনো।
ওর বাবা সবসময় ওকে কাজের মেয়ের থেকেও ছোট করে দেখেছে। আর ঝগড়াতো সবসময় লেগেই আছে ।
রাশার মা - বাবার মধ্যে ঝগড়াটা একটা প্রাত্যহিক রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ওর সাথে তো কথাই বলতো না ওর বাবা।
পরিবারের প্রতি যে একটা দায়িত্ব আছে সেটা ওর বাবা ভুলেই গেছিল।
ওদের পরিবার চালাতো ওর মামারা। ওর বাবা একটা টাকাও দিত না।
তার বাবা মার মধ্যে ঝগড়াটা একদিন এতোটাই বড় হয়ে গেছিল যে, সে তার বাবাকে মারতে গিয়েছিল।
ও আমাকে বলেছিল যে, এই পৃথিবীতে ও দুইজনের কষ্ট সহ্য করতে পারেনা।
আমার আর ওর আম্মুর। সেদিন আমি শুধু হেসেছিলাম।
এক কথায় রাশার আছে বলতে আমি আর ওর আম্মু। মামারাও মাঝে মাঝে ওর বাবার মতো আচরণ করে।
ছোটোবেলা থেকেই এসব দেখতে দেখতে রাশার সয়ে গিয়েছিল। এখন আর এসব কিছু মনে হয় না।
কিন্তু আমি জানি ও কতটুকু কষ্টে আছে।
ওর বাবা থেকেও নেই।
ওদের অবস্থাটা এখন এমন যে, তারা আর চলতে পারেনা। তার বাবা একটা টাকাও দেয় না।
চলতে তো হবে ??
.
রাশার বিয়ে ঠিক হয়ে আছে । আমি কথাটা শুনে একটু মাত্রও বিচলিত হইনি। কারন আমি জানতাম আমি কোনোদিন রাশাকে পাবোনা।
তবুও হাতটা ছেড়ে দিইনি।
ভালোবাসতাম যে....... খুব
. - কিরে যাবিনা?? ( আম্মু )
- হু....?? হুম। যাব। তুমি যাও। আমি আসছি। ( আমি )
( উঠে ফ্রেশ হতে যাবো তখনি আম্মু বলে উঠলো ) - আর কত বাবা??
( আমি কথাটা শুনে একটু থমকে দাঁড়ালাম, কি বলবো বুঝতে পারছিনা কারণ আম্মু সবকিছুই জানে ) - আমি আর এভাবে দেখতে পারছিনা তোকে
( পেছন ফিরে তাকালাম )
-............. ( চুপ ) ( আমি ) - একা আর কত কষ্ট সইবি তুই ? ( আম্মু কাঁদছে )
- আম্মু.........!!
( চোখের পানি মুছে দিয়ে আম্মুকে জড়িয়ে ধরলাম ) - তেমন কিচ্ছুনা । ও যেভাবে থাকতে চাইছে ওকে সেভাবে থাকতে দাও । কদিন পর তো.....
( আম্মুকে ছেড়ে দিয়ে চলে আসলাম, বুঝতে পারলাম আম্মুর কান্না বেড়ে গেছে )
বেরিয়ে এলাম বাসা থেকে। আর থাকতে পারবনা ।
.
কয়েকদিন এভাবেই কাটলো । সামনেই পহেলা বৈশাখ। নববর্ষ ১৪২৫।
ভাবছি কিছু একটা দিব রাশাকে। এ পর্যন্ত তেমন কিছুই দিতে পারিনি মেয়েটাকে । ও আমাকে অনেক কিছুই দিয়েছে । আমি নির্লজ্জ্বের মতো সেগুলো নিয়েছিও ।
.
আগামী পরশু বৈশাখ । রাতে শুয়ে আছি। আম্মু আসলো - - কি করছিস ? ( আম্মু )
- কিছুনা । বসে ছিলাম... ( আমি )
- তো রাশাকে কিছু দিবি না ?
- হুম। ভাবছি
- আচ্ছা । আমি ঘুমাতে গেলাম
- হু
.
ছাদে চলে আসলাম । কেন জানি মনে হচ্ছে কিছু একটা হবে । এখন না হলেও কিছুদিনের মধ্যেই হবে । কি করবো বুঝতে পারছিনা। মন টা এত অস্থির কেন লাগছে হঠাৎ ।
গান শুনবো ভাব্লাম । বাজছে Believer - Imagine Dragon এর।
.
গান শুনতে শুনতে হঠাৎ বুঝতে পারলাম চোখে পানি জমেছে । কিন্তু ঠিক কি কারণে হলো বুঝতে পারছি না..
রাত তখন ২.৫৬ । এতো রাতে ছাদে দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক না জেনেও দাঁড়িয়ে আছি। চোখ থেকে এক ফোটা পানি ঝরে পড়লো।
কেন হচ্ছে আমার সাথে এমন । কেনো পানি আসছে আমার চোখ দিয়ে । বুঝতেই পারছিনা ।
. - জয়, কতগুলো ফোন দিয়েছি তোমাকে ( রাশা )
- হুম, বলো ( আমি )
- একটু পর রেডি হয়ে পার্কে চলে আসবা । খুব জরুরী কথা আছে । প্লিজ
- আচ্ছা । কিন্তু কিছু হয়েছে কি ?
- সব এসে বলবো জয় । এখন রাখছি
- আচ্ছা
.
আজ পহেলা বৈশাখ । মেয়েটা আমাকে একবারো শুভ নববর্ষ বল্লো না ?
সকাল সকাল ফোন দিয়ে হঠাৎ কি দরকার হলো । আমাদের তো ঘুরতে যাওয়ারও প্ল্যান নেই।। তাহলে কি হল হঠাৎ ?
.
আমি তড়িঘড়ি করে রেডি হয়ে পার্কে যাওয়ার জন্য বের হলাম। বেশ দেরি হয়ে গেছে। মেয়েটা অপেক্ষা করছে বোধ হয় ।
তাড়াতাড়ি রিক্সা নিলাম। ভাড়া না বলেই উঠে পড়লাম । এখন এতো কিছুর সময় নেই ।
রাশা ফোন দিচ্ছে । কেটে দিলাম। ও এসে গেছে মনে হয়।
ভাড়া দিয়ে পার্কে ঢুকলাম। বাহহ...!!
আজ আর কেও একা নেই। সবার সাথেই কেও না কেও আছে ।
আমি ওদিকে না তাকিয়ে সোজা দৌড় দিলাম। আমাদের বসার একটা নির্দিষ্ট জায়গা আছে । গিয়ে দেখতে পেলাম ও বসে আছে । এদিকটায় মানুষ একটু কম । - একটু দেরি হয়ে গেল.. সরি ( হাঁপাতে হাঁপাতে ) ( আমি )
-............ ( চুপ ) ( রাশা ) - সরি বললাম তো....
-............. - আমি কি বসবো ? কষ্ট হচ্ছে খুব
( আমার মুখে কষ্ট শুনে ও মনে হয় আর চুপ থাকতে পারলো না ) - বসো
- কি ব্যাপার ? এতো জরুরী ভাবে ডাকলে হঠাৎ ( বসে )
- জয়......
( এভাবে বলাতেই বুঝতে পারলাম যে বড় কিছু একটা হয়েছে ) - কি হয়েছে রাশা ?
- আমার সাথে কেনো এমন হলো ? ( কেঁদে কেঁদে )
- আরে কান্না করছো কেন ? বলো কি হয়েছে ?
( ওর একটু কাছে গাঁ ঘেষে বস্লাম )
-.............. ( কোনো কথা বলছেনা । কেঁদেই যাচ্ছে ) - দেখো কান্না থামাও প্লিজ । আমার টেনশন হচ্ছে । কি হয়েছে বলো
- বিয়ের তারিখ ঠিক হয়ে গেছে । কেও তোমার কথা শুন্তেও চাইনি । আম্মুও না ।
.
এতক্ষন রাশার দিকে তাকিয়েছিলাম । কথাটা শুনেই আমি উপরে তাকালাম।
বুকের বাম পাশটা মোচড় দিয়ে উঠলো । খুব কষ্ট হচ্ছে বুঝতে পারছি । চোখ ফেটে কান্না আসতে চাইছে । মনে হচ্ছে পৃথিবীটা থেমে যাচ্ছে ।
চোখে সবকিছু ধোঁয়াশা দেখতে পাচ্ছি । শরীরের রক্ত চলাচল থেমে যাবে মনে হচ্ছে । - ছেলে পুলিশে চাকরি করে । আমি কি করবো এখন তুমিই বলে দাও ( রাশা )
( ওর কথায় আমি বাস্তবে ফিরে এলাম )
ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসলো আমার ।
. - সামনে ২৭ তারিখ বিয়ে । আমি মরে যাবো জয়। আমি থাকতে পারবোনা তোমাকে ছাড়া ( রাশা )
( ওর কথায় একটু মুচকি হাসলাম । এরকম মূহুর্তে কেও কিভাবে হাসে সেটা নিজেও বুঝতে পারলাম না ) - বাস্তবতা বলে একটা জিনিস আছে । জানো ? ( আমি )
- আমি কিচ্ছু জানতে চাই না জয় । আমি শুধু তোমার সাথে সারাজীবন থাকতে চাই
- সেইজন্যইই তো জানতে বলছি
- মজা করো না প্লিজ । আমি কি করবো এখন
- তোমার কি মনে হয় ..? আমি মজা করছি ?
-................ ( চুপ ) - রাশা , আমি জানতাম আমি তোমাকে কখনো পাবোনা । তবুও তোমার হাতটা ছেড়ে দিইনি । কেনো জানো ? খুব ভালোবাসি যে তোমায় । যা কিছুই হয়ে যাক না কেনো আমি তোমাকে ছেড়ে দিইনি । আমি জানতাম আমাদের সম্পর্ক- এ ঠিক এমন একটা সময় আসবে । কি করার ছিল বলো..?? ভাগ্য আর বাস্তবতার কাছে হার মানতেই হতো এক সময়
-................. ( চুপ ) - মেয়ের পিছনে সবাই টাইমপাস করার জন্য ঘোরে না । কেও কেও সত্যিকার অর্থে ভালবাসে । একটা প্রেমের গল্প সবসময় হাসিখুশী ঘুরাঘুরি ডেটিং, চ্যাটিং শত বর্ণের ফ্যান্টাসিময় হয় না । অনেকে হাজার ভাবার পরও বুঝতে পারে না আবেগের বসে কেন একটা মানুষকে এত বেশী ভালবেসে ফেলেছি ? তাকে ছেড়ে থাকার কথা
ভাবতেও তো এখন কষ্ট হয় ! একটা হিন্দু কিংবা বৌদ্ধ মেয়ের সাথে যখন মুসলিম ছেলে মারাত্মক ভাবে আত্মার টানে জড়িয়ে যায় তখন সেখানে সম্পর্কের আনন্দের আড়ালে দুশ্চিন্তাটা বেশী থাকে ।
একটা সেইম এইজ সত্যিকারের ভালবাসার চড়াই উৎরাই ঐ দুটো মানুষ ই জানে
শুধু । আমাদের অবস্থাটাও এখন এমন. রাতগুলো শুধু চড়া দামে রঙ্গিন স্বপ্ন বোনার না, দুপাড়ের দুটো দীর্ঘশ্বাসের এক সাগরে
আত্মহননের শত সহস্র গল্পও থাকে এ রাত জুড়ে ! একটা বিয়ে মানে শুধু হৈচৈ নাচগান আর আনন্দ উল্লাসের ব্যাপার না । একটা বিয়ে মানে অনেক সময় হৃদয় ভাঙ্গার ইতিহাস ।
আলোকসজ্জা ই কারও বাড়ি নতুন অতিথির আগমনে আলোকিত যখন, কারও জীবনে তখন ঘোর অন্ধকার ।
এমন অনেকেই আছে যারা নিয়তির কাছে হার না মানার শপথ করে ।
একটা সময় আসে আর কিছুতেই কিছু হয় না ! চিরায়ত নিয়মে পবিত্র সম্পর্কটুকু চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যায় ।
হাজার চেষ্টা করেও সাত জনম এক থাকার প্রতিজ্ঞা আর এই এক জনমে রক্ষা করা সম্ভব হয় না ।
স্রোতের সাথে গা ভাসাই কেও কেও, একটা খারাপ স্বপ্ন ভেবে নতুন করে শুরু করে সব । কেও কেও ভুলতে না পেরে জীবনের কাছে হেরে যায় ।
এত হেরে যাওয়ার গল্পের পরও
সবাই চায় পৃথিবীর কোন এক কোণে কেও একজন অন্তত ভালবেসে জিতে যাক । সবাই প্রত্যাশা করে সবকিছুর উর্ধ্বে মানবজমিনের বুকে সত্যিকারের ভালবাসা লড়াই করে বেঁচে থাকুক অনন্তকাল। - জয়.........!!
- ক্যামেরার ফ্ল্যাশ-এ সবাই যখন তোমাকে একটু দেখতে আসবে , একটু ছবি তুলতে আসবে তখন ইচ্ছা থাক বা না থাক মুখ ফুটে হাসি আসবে তোমার । তখন তোমার বর তোমাকে চুপি চুপি দেখবে । তার মনে থাকবে খুশি । আমার কথা তখন মনেই আসবেনা তোমার । মনে করতে চাইলেও পারবেনা । চারপাশটা ঘিরে রাখবে তোমার নতুন অাত্বীয়, নতুন ঘর, নতুন সংসার , নতুন মুখ ।
বাসর রাতে বর যখন জানতে চাইবে যে - আপনি কাউকে পছন্দ করতেন ??
তখন তার মন রাখার জন্য হলেও বলবে - না ।
আস্তে আস্তে যখন সে তোমার কাছে আসতে চাইবে , তখন কয়েকদিন তুমি তাকে এড়িয়ে চলবে । কিছুদিন পর এটা তোমার ভাগ্যের পরিহাস বলে মেনে নিবে । আমার কথা মনেই আসবেনা তোমার। আমার জায়গাটা পাবে অন্যকেও ।
প্রাকৃতিক নিয়মেই তোমার সবটা দিতে হবে তাকে । মন তোমাকে বলবে - আর কত কষ্ট পাবি ?
মেনে নে । যা হয়েছে ভালই হয়েছে । নতুন ভাবে শুরু কর রাশা । পুরোনো স্মৃতি নিয়ে কষ্ট পাস না । মেনে নে । দেখবি অনেক সুখে থাকবি...
তুমিও মেনে নিবে । আস্তে আস্তে আমার কথা মনেই থাকবেনা । বাচ্চা হবে , মা হবে , বাচ্চারা আম্মু আম্মু ডাকবে...
আমি কে তখন ভুলেই যাবে । দেখবে আমিও তখন কাউকে বিয়ে করবো ।
চলে যাবে একভাবে । জীবন থেমে থাকবেনা রাশা । কারোর জন্য জীবন থেমে থাকেনা । কক্ষনো না....
.
রাশার দিকে তাকালাম । অঝোর ধারায় অশ্রু ঝরছে মেয়েটার চোখ দিয়ে । আজ কেন জানিনা রাশাকে কাঁদতে দেখে কষ্ট হচ্ছে না । - জানো রাশা, হঠাৎ যখন তোমার কথা মনে পড়বে , চাঁদের আলোয় যখন তোমার মুখটুকু ভেসে উঠবে তখন বারান্দার সেই ভাঙা চেয়ারে দোল খেতে খেতে চোখের কোনে পানি জমবে , বান পাশটা চিন চিন করবে, হয়তো চোখ বেয়ে পানিও পড়বে কিন্তু নিঃশব্দে সবগুলো কষ্ট সয়ে যাবে...
.
রাশা জড়িয়ে ধরলো আমাকে । রাশার চোখের পানি আমার বুক বেয়ে পড়ছে ।
আর পারলাম না । চোখ থেকে এক ফোটা পানি আমার গাল বেয়ে পড়লো ।
হঠাৎ দেখতে পেলাম গাছের আড়ালে আম্মু দাঁড়িয়ে আছে । সূর্যের আলোয় আম্মুর চোখেও স্পষ্ট পানি দেখতে পাচ্ছি...
.
কেবল বিধাতা জানে এ তিন চোখের পানির অর্থ কি....!!