Love Story.

srvoter(41)
Published in
#story
Words
677
Reading
4 min
Listen
Play
8y

ময়মনসিংহ ক্যান্টনমেন্ট
পাবলিক কলেজে ভর্তি হয়েছি।
কাল থেকে ক্লাস শুরু।
একটা সাবলেট বাসা ঠিক করা হয়েছে।
সকাল থেকেই মনটা কেমন যেন বিষণ্ণ। মফঃস্বলের ছেলে আমি।
শহুরে জীবনের রঙের টানে কিছুটা রোমাঞ্চিতও। আজ চলে যাব। সকাল
থেকেই বাসায় একটা অন্যরকম
পরিবেশ খেয়াল করছি।
মা কেন জানি আজ আমার
কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে।
বোনটাও কেমন যেন দূরে দূরে চলছে।
ছোট ভাইটা একটু অবাক হয়ে গোছ–গাছ দেখছে। সে বুঝতে পারছে না, আমরা কোথায় বেড়াতে যাচ্ছি। মাকে কয়েকবার জিজ্ঞেস করে দুবার বকাও খেয়ে ফেলেছে।
আমি ড্রইং রুমে সোফায় বসে
সবাইকে দেখছি। বাবা গোসল করছে, আজ আমার সঙ্গী। বিকাল ৪ টা বাজে।
এবার বের হতে হবে।
কেমন জানি যেতে ইচ্ছে করছে না।
বাসায় অনেক মানুষের সমাগম।
খালা-খালু, চাচা-চাচী, চাচত-খালাত ভাইবোনেরা। মাকে খুঁজছি সবার ভিড়ে, কিন্তু কোথাও দেখছি না।
বাবা তাড়াতাড়ি করতে
বলে বের হয়ে গেলেন।
আমি জানি, আমি কাদব না।
আমি সহজে কাঁদতে জানি না।
কেন কাঁদব? আবার তো দু-মাস পর আবার আসব। হয়ত দু-দিনের বেশি
বাসার বাহিরে থাকিনি, তাই বলে কাঁদব কেন? কিছুক্ষণ পর মার খোঁজ মিলল।
চোখ লাল। আমার মায়াবতী
মাকে দেখে আসলেই বুকের
কোথায় যেন একটা ধাক্কা খেলাম।
আমার মা, যাকে
ছেড়ে দু-দিনের বেশি কোথাও থাকিনি।
আজ সেই মাকে রেখে যাচ্ছি,
আবার দু-মাস পর মায়ের
এই পবিত্র মুখখানা দেখতে পারবো !!!
বিদায় বেলাটা যেমন কষ্ট
হবে বলে ভেবেছিলাম, তেমন
কষ্ট লাগলো না।
মা আমায় জড়িয়ে অনেক
কাঁদলেন, শরীরের যত্ন নিতে
বললেন, যখন যেটা
খেতে মন চায় সেটা খেতে বললেন।
হায়রে, মায়েরা এমনই!!! আমার
বোকা বোনটা আজ কেদে চোখ ফুলিয়ে ফেলেছে।
এমনিতে কতো বলত, তুই চলে
গেলে আমিই বাসার বড়। আজ
সেই আমাকে জড়িয়ে কাঁদছে।
আসলে রক্তের স্বার্থহীন ভালবাসা।
আমি সেই ভালবাসার টান
উপেক্ষা করে ব্যাগ হাতে
বের হয়ে গেলাম।
না, আমি কাদিনি।
আমি জানি, সবাই আমার
পিছন পিছন আসছে।
আমি ফিরে তাকালাম না।
সরাসরি হেঁটে বাসস্ট্যান্ডে চলে আসলাম।
দেখি বাবা দাঁড়িয়ে আছেন।
একমাত্র বাবার অনুভূতি
গুলো স্বাভাবিক।
বাসটা যখন চলতে
শুরু করল, ভেবেছিলাম জানালা দিয়ে তাকাব না।
কিন্তু আমার বিদ্রোহী
চোখগুলো ঠিকই জানালার
ফাঁক গলে আমার মাকে খুঁজে নিল।
বুকের ভিতর জমে থাকা কান্নাটা আর আটকাতে পারলাম না।
চোখ বেয়ে নোনা জল বের হয়ে গেল।
বাবা কিছু বললেন না।
একটা দীর্ঘশ্বাস শুনতে পেলাম শুধু।
,
ওই সাবলেট বাসায় যখন
ঢুকলাম, তখন রাত হয়ে গেছে।
বাহিরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি।
অপরিচিত পরিবেশ, অপিরিচিত মানুষ। নিজেকে অসহায় লাগছিল।
রুমটা একটু বাহির সাইডে।
একটাই রুম, সাথে লাগানো টয়লেট।
নীচতলায়। বলতে গেলে
ওই বাসার কারো সাথে
যোগাযোগের
প্রয়োজন নেই। বাহিরে যাবার
জন্য আমার আলাদা দরজা আছে।
ভালই লাগলো, আমি নির্ভেজাল থাকতে পারবো।
এসে তোষক-বালিশ কিনেছি।
মশারী কিনা হয়েছে।
আমার ছোট সংসারটা
বাবা যতটুকু সম্ভব গুছিয়ে দিলেন।
এবার আবার বিদায় বেলা।
বাবা সবকিছু বুঝিয়ে দিলেন আমায়।
মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে
বললেন, “পড়াশুনা করিস বাবা।
টাকার জন্য কষ্ট করিস না।
টাকা লাগলে জানাবি, রক্ত বেচে হলেও টাকা দিব। তবুও পড়াশুনা ঠিক ভাবে করিস।
তোর উপর আমার অনেক আশা।
দোয়া করি, তুই অনেক বড় হবি”।
বাবা চলে গেলেন আমাকে একা রেখে।
বাবারা কাঁদেনা। তিনিও কাঁদেননি।
কাঁদিনি আমিও । চলে যাবার পর
এখন অনুভব করছি, আমি আজ থেকে একা হয়ে গেলাম।
সেই জন্মের পর থেকে
মা-বাবার সাথে থেকে তাদের
অভাবটা বুঝিনি। অনেক
সময় তাদের শাসনে বিরক্ত হয়েছি।
তখন মনে হতো, বাসা থেকে দূরে কোথাও থাকলে কতো না ভালো হতো।
কিন্তু আজ ভালো লাগছে না।
সত্যি বলতে কি, আমার অনেক খারাপ লাগছিল। চোখ ফেটে কান্না আসছিল।
আমি নির্জন ঘরে একা একা বসে আছি।
যখন কারেন্ট চলে গেল, চারপাশ
অন্ধকারে ডুবে গেল, তখন
আমি আসলেই কেঁদে ফেললাম।
মায়ের রুমালটা আমি চুরি
করে নিয়ে এসেছি, বাবার ফতুয়াটা।
সবার কথা শুধু মনে হচ্ছে।
আমার সেই মফঃস্বল, আমার
সেই স্বার্থহীন বন্ধুরা, আমার সেই সাইকেল, আমার আদুরে বোন, আমাকে
অসম্ভব ভয় পায়- সেই ছোট ভাইটা,
আমার দরদী মা, আমার সব
সাফল্য যার অক্লান্ত চেষ্টার ফসল, সেই বাবা। আজ সবাই কতো দূরে।
,
বাবা কি আজ থেকে যেতে পারত না?
অভিমানে আমার গলার
কাছটাতে কান্নাটা দলা পাকিয়ে উঠল।
ঠিক তখনি দরজায়... ঠক...ঠক।
সাথে সাথে বাবার গলা শুনতে পেলাম।
আমি একলাফে উঠে
দরজা খুলে দেখি বাবা দাঁড়িয়ে আছে।
মুখে সেই দরাজ হাসি।
আমি বাবা কে জড়িয়ে
ধরে কেঁদে ফেললাম।
পুনশ্চঃ জেমসের সেই কথা...
“এতো রক্তের সাথে রক্তের টান,
স্বার্থের অনেক উপরে ”।
,
পরিবারের এইসব স্বার্থহীন ভালবাসা সকলে পায় না। অনেকে পায় কিন্তু অবহেলায় হারিয়ে ফেলে। তারাই বুঝে, যাদের পরিবার নেই। সুতরাং পরিবারের সকলের প্রতি যত্নবান হন।