ইতিহাসের সবচেয়ে সহজলভ্য তথ্যের যুগে এসে আমার এখন বহু কিছু জানতে ইচ্ছা করে। যেহেতু এখন আস্ত এক লাইব্রেরি পরিমাণ বই একটা ডিভাইসেই রাখা যায়, তাই এই ইচ্ছাটা হয়ত একদম অমূলক নয়। চোখের সামনে যে কোনো বিষয়ে পাওয়ারফুল লেখা দেখামাত্রই ওটার প্রেমে পড়ে যাই। এভাবে অনেক বিষয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। ইদানিং আরেক সমস্যা নিয়ে আছি, কোনো বই শেষ করতে পারি না। একটা শুরু করে ৩০/৪০ পৃষ্ঠা পড়তে না পড়তেই আরেকটা বই খুলে বসি। এভাবে প্রায় ১৫টা বই পেন্ডিং অবস্থায় পড়ে আছে ই-রিডারে। কাগজের বইতেও আজকাল কম্ফোর্ট ফিল করি না। ভারী, সাইজেও বড় তাই রাখার ঝামেলার কারণে কাগুজে বই পড়া প্রায় বাদই দিয়েছি বলা যায়।
ইলিয়াড, ওডিসি, রামায়ণ, মহাভারত এই চার মহাকাব্য বিশেষ ছাড়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে গত ডিসেম্বরে কিনলেও এখনও কোনোটারই গতি করতে পারলাম না। এখন ইলিয়াড পড়ছি, দেখি কতদূর কি করতে পারি। এটা আবার অ্যাকাডেমিক, বেশিদিন ফেলে রাখা যাবে না, ঠেলায় পড়ে হলেও শেষ করা লাগবে।
আমি চাচ্ছি একটা সুনির্দিষ্ট বিষয়ে ফোকাস করতে। আমার ইচ্ছা ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে কাজ করার। কিন্তু, সাহিত্য নিয়ে পড়তে পড়তে কখন যে দর্শন বা ইতিহাস এসে পড়ে মাথায় টের পাই না। এখানে সমস্যাটা হয় সোশ্যাল মিডিয়ার কারনে। হাইভে বা অন্য কোনো প্লাটফর্মে যখন দেখি কেউ এমন কোনো বিষয় নিয়ে লিখে যা সম্পর্কে আমি প্রায় কিছুই জানি না তখন ওটা নিয়ে ইন্টারনেটে গুতাগুতি করা শুরু করে দেই। আমার যে ওই বিষয় নিয়ে মাথা না ঘামালেও চলবে সেটা ভুলে যাই। দুনিয়ার তাবৎ জ্ঞান নেয়ার একটা উদগ্র বাসনা সৃষ্টি হয়। কিছুতেই নিজের কাজে মনোযোগী হতে পারছি না।
একটা সময় ছিলো যখন বই পড়াটা খুব উপভোগ করতাম। এর একটা সম্ভাব্য কারণ হয়ত তখন খুব অবাক হতে পারতাম। এখন বইগুলো আর খুব একটা অবাক করে না।
আমার সিরিয়াসলি বই পড়া শুরু হয় ২০১৫ তে, যখন অভিজিৎ রায় খুন হলেন তখন থেকে। আমি তখন ভাবলাম, লোকটা কি এমন কথা লিখেছে যে তাকে মেরে ফেলতে হবে! আর একটা মানুষ কেবল লেখার জন্য মারা যাবে এটাও মেনে নিতে পারছিলাম না। তবে মুখে কাউকে কিছু বলি নি। তখন 'বিশ্বাসের ভাইরাস' বইটা হাতে নেই। চার/পাঁচদিনের মধ্যে পড়ে ফেলি। মুক্তমনা ওয়েবসাইট থেকে যে কয়টা বই ফ্রিতে পেয়েছি সব পড়ে ফেলি। আর্টিক্যালগুলো অবশ্য পড়া হয় নি সব। এই বইগুলো পড়ে আমি স্তব্ধ হয়ে যাই। এরপর একে একে কার্ল সেগান এর 'কসমস', ডেভিড অ্যাটেনবোরো, নীল ডিগ্রাসি টাইসন এর শো দেখে দেখে আমার চোখ ছানাবড়া! এতোদিনের লালিত বিশ্বাসের উপর এমন বুদ্ধিবৃত্তিক আঘাতে আমি দিশেহারা হয়ে যাই। ভেবে পাচ্ছিলাম না কি করবো। পরবর্তীতে ধর্ম ব্যাপারটাকে যৌক্তিকভাবে না নিয়ে বিশ্বাসের সাথে নিয়ে নিলাম। ল্যাঠা চুকে গেলো।
উল্লেখ্য যে এর আগে আমি জাকির নায়েক এর বেশ ভক্ত ছিলাম। এরপর থেকে তার লজিক্যাল ফ্যালাসিগুলো চোখে পড়তে লাগলো। বিজ্ঞান আর ধর্মকে দু'দিকে সরিয়ে দিয়ে দেখলাম এবার ঠিক আছে। বিজ্ঞান বিজ্ঞানের পথে চলুক, আর ধর্ম ধর্মের পথে।
এই বিষয়গুলো পরিষ্কার হওয়ার পর থেকে আমি আর বিশেষ কিছুতে খুব একটা আগ্রহ পাচ্ছি না। শেষ বার, Hans Rosling এর Factfulness পড়ে বেশ ভালো লাগে। আবার যেসব বই পড়লে মাথা আউলা হয়ে যায় সেসব বইয়ে ঠিকমতো দাঁত বসাতে পারছি না। The Dictator's Handbook পড়তে গিয়ে বেশ সমস্যা হচ্ছে আজকাল। এর আগে Why Nations Fail টা খুব একটা ভালো বুঝতে পারি নাই। অর্থ বুঝতে পারলেও কনটেক্স বুঝতে সমস্যা হয়। আবার মাঝে মাঝে আগ্রহ হারিয়ে ফেলি।
মোদ্দা কথা হলো, আমি কোনো একটা বিষয় নিয়ে লেগে থাকতে পারছি না। এখন আবার ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করা শুরু করলেও দর্শন দূর থেকে হাতছানি দেয়। ভলতেয়ার, স্পিনোজা, নীটশে কাছে ডাকে। এদিকে শেকসপিয়ার, কোলরিজ, শেলী, কীটস, হোমার, ওয়ার্ডসওয়ার্থ চোখ রাঙায়! কোনদিকে যে যাই!? অ্যাকাডেমিক পড়াশোনা করলে ক্যারিয়ারে নতুন মাত্রা যোগ হবে, এটাও ভুলে যেতে পারি না। জীবনটা এতো ছোট কেন সেটা ভেবে খুব হতাশ হই।
তো সিদ্ধান্ত নিয়েছি এখন থেকে অ্যাকাডেমিক পড়া আগে শেষ করবো। অন্যান্য আগ্রহের জিনিস পরেও পড়া যাবে। বোর লাগলে আলতু-ফালতু বইও পড়বো মাঝে মাঝে। কিন্তু লক্ষ্য থেকে সরে আসা যাবে না।
এই অর্থহীন লেখাটা পড়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
ভালো থাকবেন।