সন্ধ্যা থেকে মেজাজটা বেশ খিটখিটে হয়ে আছে। একটা সিগারেট ধরাতে পারলে ভালো হতো। তবে হাতে নিকটিনের প্যাচ টা দেখে সেই ইচ্ছেটা দমিয়ে রাখতে হলো। বারান্দায় চাঁদের আলো বেশ ফকফকে ভাবে আছড়ে পড়েছে। রুমের লাইট টা নিভিয়ে বারান্দায় গিয়ে বসলে মন্দ হয় না।
ঘরে নীল ডিম লাইট জালিয়ে রেখে বারান্দায় গিয়ে বসতেই এক ভূতুরে আবেশ সৃষ্টি হলো। হুমায়ুন আহমেদ স্যারের একটা ভৌতিক গল্পের সমগ্র ছিল। সেটা পড়তে ইচ্ছে হচ্ছিলো, কোন হতচ্ছারা কে দিয়েছিলাম বইটা। ফেরত দেবার আর নাম নেই। আচ্ছা, ভূতুরে পরিবেশের সাথে নীল রং এর এত নৈকট্য কেন? নাকি শুধু আমারই এরকম মনে হয়? চিন্তার বিষয়। চিন্তা পরে করা যাবে, আপাতত এই মায়াবী নীলচে আলোয় রকিং চেয়ারে গা এলিয়ে দেওয়া যাক।
নীল ডিম লাইট টা মায়াবী কেন লাগছে আজ? ঘুমানোর সময় প্রতি রাতেই তো জ্বলে। তখন তো মায়াবী লাগে না। চাঁদের আলোর সাথে মিশে হয়তো মায়াবী আবছায়া হয়েছে। এই জন্যই হয়তো কবিরা চাঁদের সাথে মায়াবী শব্দটি বেশ ব্যবহার করেন।
আজ কি জ্যোৎস্না রাত নাকি? হলে হতেও পারে। এখন আর এসব রোমান্টিসিজম এর বেপার সেপার এ নাক গলাই না। তবু একটু "আজ জ্যোৎস্না রাতে সবাই গেছে বনে" গুণগুণ না করলে কবিগুরুর অসম্মান হয়।
সবে মাত্র রাত ১২ টা বাজলো ঘড়ির কাটায়। এখনই কুকুর গুলো চেঁচিয়ে-মেচিয়ে এক অবস্থা! ভাব নিলাম যেনো ওয়ার-উল্ফ এর ডাক শুনছি! একটা সাহেব সাহেব ভাব আনার চেষ্টা আর কি! এতো চেঁচামেচির পরও এক অদ্ভুত নিশ্চুপ নীরবতায় ছেয়ে আছে চারপাশ। স্পষ্ট শুনতে পেলাম টিক টিক করে ঘড়ির কাটায় কেটে গেলো আরও কিছু সময়।
মাঠের পাশে ল্যাম্পপোস্টের হলদে আলোর নিচে সারি সারি খালি বেঞ্চগুলোর দিকে তাকালে অবাক লাগে। এইতো ক'ঘন্টা আগেও কি হইচই, কোলাহল। মানুষের কি কাড়াকাড়ি এক একটি বেঞ্চ নিয়ে! তবে খালি বেঞ্চ গুলো দেখতেই বেশ লাগছে। আজকাল আর মানুষের কোলাহল ভালো লাগে না। একটি দ্বীর্ঘশ্বাষ ছেড়ে দূরে কুকুরের ডাক শুনতে শুনতে কোথায় যেন হাহাকার। বেঞ্চগুলো প্রায় ডাকে আমাকে। কিভাবে বুঝাই তাদের, আর ডাকিস না আমাকে। আমি একা কিভাবে যাই তোদের কাছে?
দরজায় কে যেন ঠক্ ঠক্ করলো। দরজাটা সবসময় খোলাই থাকতো। এই কিছুদিন হলো লক করে রাখছি। খোলা থাকতো এই আশায়, যদি কেউ এসে একটু বসে দু-চারটে মিনিট কথা বলে, ডিপ্রেশনের একাকীত্ব কিছুটা হলেও লাঘব হতো। কেউ একদিন ও আসে নি। বলা হয়েছিলো সবাই আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। দরজার ওপার থেকে এপারের নিশ্চুপ আর্তনাদ কেউ শুনতে চায় নি। এখন যখন দরজা টা বন্ধ হয়ে গেছে, এখন এসে আর কি লাভ। এখন নতুন করে কেনো আগ্রহ, নিজের ওপরে নিজেরই যখন আর আগ্রহ নেই।
বারান্দার রেলিং এ হাতের মুষ্ঠি টা শক্ত হয়ে উঠলো।