কাছে আসতে নেই মানা

Words
701
Reading
4 min
Listen
Play
6y

তখন হয়তো ঘড়িতে দুপুর একটার মত বাজে । আশিস, তো এই সময় আমাকে ফোন দেওয়ার কথা না । এখন তো আমার লাঞ্চ করার সময় । কিছু না বুঝেই ফোনটা রিসিভ করলাম, কি খবর আশিস কি মনে করে । আশিস বলছিল , ভাইয়া আমার ওয়াইফের গতকাল রাত থেকে ভীষণ ব্যথা , ও তো কিছুই খাইতে পারছে না, কি করবো বলেন তো । বড্ড আকুতি নিয়ে কথা বলছিল ছেলেটা, আমি জানি ওর কিছুদিন আগেই চাকরিটা চলে গেছে । পৃথিবীর এই কঠিন সময়ে কারো জীবনি যেন স্বাভাবিক নেই আর আগের মত ।


আশিস তুমি দেখা করো, আধা ঘন্টা পরে ।আমি একটু দুপুরের খাবারটা খেয়ে নেই । আশিস, আমার দুই বাসা পরেই থাকে। অথচ গত রাত থেকে ব্যথা, সে আমাকে কিছুই বলেনি । আমি খাচ্ছি আর ভাবছি, হয়তো তার পকেটের অবস্থা খুব একটা ভালো না ।এইজন্য হয়তো সে লজ্জায় আমার কাছে দেখা করতে পারেনি । মাসখানেক হলো ছেলেটা বাসায় ফিরেছে, শুনলাম ছেলেটার নাকি চাকরি চলে গিয়েছে । আসলেই এই কঠিনতম সময়ে চাকরি গিয়েছে, তারপর আবার বাসায় চলে এসেছে । সব মিলিয়ে পৃথিবী কঠিন একটা রূপ ধারণ করেছে, আমি জানি এই মুহূর্তে আশিস পৃথিবীর যে রূপটা দেখতে পাচ্ছে, এরকম রুপ পৃথিবীর অনেক মানুষই এখন খুব কাছ থেকে প্রতিনিয়তই দেখে ।
ভাত খাওয়া শেষ হতে না হতেই ,আশিস ওর ওয়াইফকে নিয়ে হাজির । রিসিপশনিস্ট কে বললাম ওদেরকে একটু বসতে দাও । অতঃপর খানিক বাদে চেম্বারে গিয়ে, আশিস কে ভিতরে আসতে বললাম । আশিসের ওয়াইফকে আমার টেবিলের সামনে বসাইলাম এবং আশীষ কে বসলাম তার পাশে এবং আশিসের বাবুটা তখনো যেন মার কোলে যাওয়ার জন্য ছটফট করছে । আশিস কোনমতে তার বাবুকে সামলাচ্ছে আর আমি শুনছি ,আশিসের ওয়াইফের কথা । চেষ্টা করছি ভালোভাবে কথাগুলো শুনে, তাকে একটু পর্যবেক্ষণ করার জন্য । তাকে মোটামুটি ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে বললাম সবই তো শুনলাম, এখন হা করেন আপনার মুখের ভিতরটা একটু দেখি । মুখের ভিতরের অবস্থা দেখার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না, নিচের চোয়ালের বাম পাশে একদম শেষের প্রান্তে আক্কেল দাঁতের স্থানে দেখি ইনফেকশন হয়ে গিয়েছে । আসলে আক্কেল দাঁত উঠতিছে তো, তাই আক্কেল দাঁতের উপরের যে মাংস ছিল সেটা ফুলে গিয়েছে এবং ঐ মাংসের কারণে আক্কেল দাঁত ঠিক মতো উঠতে পারছে না । তার ভিতরে এই স্থানে খাদ্যকণা প্রবেশ করে জায়গাটিতে ভালো ভাবেই ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে ।
অতঃপর রিসিপশনিস্ট কে বলে, পোর্টেবল এক্সরে মেশিনের দ্বারা ঐ দাঁতটার একটা এক্সরে করালাম । রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত, আমি আশিষের সঙ্গে গল্প করলাম । তার দিনকাল কেমন যাচ্ছে এই সব শোনার জন্য ।আমি আসলে তার চেহারার অবস্থা দেখেই বুঝতে পারছি, সে খুব একটা ভালো নেই । আমি তাকে বললাম, তার ওয়াইফ কে ব্যথা নাশক কোন ওষুধ খাওয়ানো হয়েছে কিনা । সে বলল ভাই,গতকাল রাতে একটা ব্যথানাশক ওষুধ খেয়ে ছিল কিন্তু কোন কাজ হয়নি,ব্যথা আসলে যেমন ছিল তেমনই আছে । একটু পরে রিপোর্ট হাতে পেলাম এবং দেখলাম যে দাঁতের অবস্থান একদম ঠিক আছে তবে দাঁতের উপরের যে মাংসটা আছে সেটা ক্ষত হয়েছে এবং ঐ মাংসটা কেটে ফেলতে হবে। আসলে ঐ ক্ষত মাংসটার তার জন্যই এতো ব্যথা হচ্ছে ,এটা তাকে বুঝিয়ে বললাম ।
আশিস কে বললাম, আশিস তোমার ওয়াইফের মুখের ভিতরে ছোট্ট একটা সার্জারি করা লাগবে এবং সার্জারিটা ভীষণ জরুরি। আশিস আমার কথা শুনে, একটু হতভম্ব হয়ে গিয়েছে এবং আমাকে বলল ভাই খরচ । আমি বললাম আগে অপারেশনটা হোক, তারপরে বাকি সব কথা বলা যাবে ।
অতঃপর রিসিপশনিস্টকে বলে রোগীকে আমার ডেন্টাল ইউনিটে (চেয়ারে)শোয়ানোর জন্য একদম তৈরি করতে বললাম । এইফাঁকে আমি মানসিকভাবে নিজে প্রস্তুতি নিলাম এবং অবশেষে মিনিট পনেরোর মধ্যে সার্জারিটা পুরোপুরিভাবে সম্পন্ন করে ফেললাম। আমি যখন সার্জারি করছিলাম, তখন আশিষের বাবুটা আশিসের ওয়াইফের কাছে যাওয়ার জন্য বারবার ছটফট এবং কান্নাকাটি করছিল, আশিস অনেকভাবে চেষ্টা করে বাবুটাকে শান্ত করে ফেললো ।
সার্জারি শেষ হওয়ার পরে রোগীকে আমি সবরকম উপদেশ এবং প্রেসক্রিপশন লিখে দিলাম । অতঃপর আশিস আমাকে বলল, ভাই কত টাকা দিতে হবে । আমি দেখছি আশিসের মুখটা ভীষণ ফ্যাকাশে । আমি বললাম আশিস, তোমার বাবুকে একটু আমার কোলে দাও । যদিও বাবু প্রথমে আসতে চাচ্ছিলো না, তবে পরে ওর বাবা তাকে অভয় দিয়ে আমার কোলে পাঠিয়ে দিল । বাবুকে কিছুক্ষণ কোলে নিয়ে তার সঙ্গে একটু খেলা করছিলাম, বাবুকে আমার কলমটা দিলাম । বাবুর সঙ্গে খেলা করছি, আর আশিসকে বলছি আপাতত ভাই টাকা লাগবে না, তুমি ওষুধ গুলো কিনে তোমার ওয়াইফ কে খাওয়াও । যদিও আশিস আমাকে অনেক অনুরোধ করলো, তবে আমি ওকে বলেই দিলাম টাকা লাগবে না । পৃথিবী শান্ত হোক,একদিন না হয় তোমার বাসায় গিয়ে ছোট মাছ দিয়ে ভাত খেয়ে আসবো নি ।
IMG_20200720_012519.jpg

কাছে আসতে নেই মানা | Ecency