সাপ ভীতি-Snake Phobia

Words
707
Reading
4 min
Listen
Play
5y

গ্রামের মাঠেঘাটে,বনেবাদাড়ে লুটোপুটি করে যার বেড়ে ওঠা সাপের সাথে তার চিড়িয়াখানায় গিয়ে আনুষ্ঠানিক পরিচয়ের প্রয়োজন পড়ে না।হয়তো হাঁটতে শেখার আগেই না বুঝে সাপের লেজ ধরে টান দিয়ে পরিচয় হয়েছিলো ঐ প্রাণীটির সাথে।গ্রামের বাঁশঝাড় কিংবা ডুবায়,ফসলের মাঠে কিংবা বসত বাড়িতে সব জায়গায়ই দেখা মিলতে পারে এই ভয়ংকর প্রাণীটির।আমারও যে কিভাবে এ প্রাণীটির সাথে পরিচয় হয়েছিল আমার জানা নেই।আমাদের পুকুরে অনেক সাপ।কিন্তু এগুলো নাকি দাঁড়াশ সাপ,বিষহীন সাপ।তাই এদের ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই।

বর্ষাকালে যখন পানি থৈ থৈ করে,তখন আমাদের বাড়ির পাশের ধানের যে জমিটা আছে এর চারপাশে জাল পেতে রাখতাম আমি আর ছোটো আপা।সকালে যখন উঠতাম তখন প্রচুর মাছ আটকা পড়তো এতে।সাথে আটকা পড়তো ইয়া বড় বড় দাঁড়াশ সাপ।এগুলো জীবিত থাকতো।জাল থেকে আগে মাছগুলো বের করে,ছোট আপা বাম হাতে সাপের মাথা চেপে ধরতো আর আমি জাল টান দিতাম।এভাবে সাপকে বের করে ফেলে দিতাম।আমাদের বাঁশঝাড়ের পিছনে প্রায়ই সাপ ব্যাঙ ধরতো।সাপ যখন ব্যাঙ ধরতো তখন ব্যাঙ খুব জোরে জোরে ঘ্যাঙরঘ্যাঙ করতো।আমরা বুঝতে পারতাম সাপ ব্যাঙ ধরেছে।আমরা দৌড়ে গিয়ে দেখতাম।মাঝেমধ্যে ঢিলা দিতাম।আম্মা বলতো খাবার খাওয়ার সময় বিরক্ত করলে সাপ রেগে গিয়ে কামড় দিবে।তাই আর বিরক্ত করতাম না।

আমাদের বাঁশঝাড়ে সবুজ চিকন লম্বা এক ধরনের সাপ থাকে।এটা নাকি বিষাক্ত সাপ।তাই আমরা বাঁশঝাড়ে সাবধানে চলাফেরা করতাম।কিন্তু সাপকে তেমন ভয় পেতাম না।গ্রামে সাপুড়ে আসে সাপের খেলা দেখানোর জন্য।ওরা দশ-পনেরো প্রজাতির সাপ নিয়ে আসে।ওরা একটা একটা সাপ বের করে পরিচয় করিয়ে দেয়।ওদের অনেক সাপ থাকে,বের করার সাথে সাথে ছোবল মারে ওদের হাত-পায়ে।ওদের কিছুই হয় না।ছোট বেলায় এর কারণ বুঝতাম না এখন অবশ্য জানি,ওরা সাপের বিষদাঁত ভেঙে দেয় তাই বিষ থাকেনা ছোবল দিলে কিছুই হয় না।কতবার এইসব সাপের খেলা দেখেছি তার হিসাব নেই।এসব দেখে দেখে অভ্যস্ত তাই সাপকে আমার কখনও ভয়ংকর প্রাণী মনে হতো না।আর আম্মা বলতেন,সাপকে আঘাত না করলে সাপ কাউকে কামড় দেয় না।আমিও ছোটবেলা থেকে তাই বিশ্বাস করতাম।

একবার আমাদের পুকুরে মাছ ধরতে গেলাম।চৈত্র মাস থাকায় পানি ছিলো অল্প।আমি আর দাদাভাই পুকুরে জাল নিয়ে নেমেছি।জালের একপাশে আমি ধরেছি,অন্যপাশে দাদাভাই।পুকুরের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে জাল টেনে নিয়ে যাব তাহলে জালের ভিতর অনেক মাছ ঢুকে যাবে।ভালোভাবেই টেনে নিয়ে যাচ্ছিলাম।কিন্তু মধ্য পুকুরে যাওয়ার পর আমি আর হাঁটতে পারছিলাম না।পা এতো বেশি ভারি লাগছিলো যেন কেউ আমার পা টেনে ধরে রেখেছে।দাদাভাই বললো,তাড়াতাড়ি আস,একসাথে না টানতে পারলে মাছ সব চলে যাবে।আমি দাদাভাইকে বললাম,আমার পা কে যেনো টেনে ধরে রেখেছে।কিন্তু দাদা ভাই রেগে গিয়ে বললো,কে ধরে রাখবে পুকুরে কি ভূত আছে।ওর কথা শুনে আমি খুব কষ্ট করে পা টেনে টেনে যখনই উপরে উঠতে যাব দেখি আমার পায়ে সাপ পেঁচিয়ে বসে আছে।তারপর আমি চিৎকার দিয়ে পা জারি দিতেই সাপ চলে যায় পানিতে আর আমি চলে আসি।ছোটবেলা থেকে শুনেছি সাপ যেখানে পেঁচায় সেই জায়গা ভারি হয়ে যায়।সেইদিন এই কথার সত্যতা মিলে।সেইদিন সাপ ভীতি আমার আরও কমে যায়।আমার মনে হতে লাগলো,সাপ খুবই নিরীহ প্রাণী।একে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।

কিন্তু সমস্যা দেখা দিলো আমি যখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ালেখা করি।আমরা ভাই-বোনেরা দিনেরবেলা কখনই ঘরে বসে পড়তাম না।এটা অবশ্যই বড় আপা উদ্ভাবণ করে,পরে আমরা সবাই এটাই করতাম।বিশেষ করে আমি,কখনও গাছের ডালে শুয়ে,কখনও দোলনা দুলতে দুলতে,আবার কখনও পুকুরপাড়ে বসে পড়ালেখা করতাম।একদিন আমি পুকুরপাড়ে টুলে বসে চেয়ারে বই রেখে পড়ছিলাম।সেটা ছিলো পাটের মৌসুম।আম্মা অল্পকিছু পাটগাছ মাচা বেধে পুকুরের পানিতে পঁচতে দিয়েছিলো।হঠাৎ আমি দেখলাম একটা বড় সাইজের দাঁড়াশ সাপ এসে পাটের মাচায় বসে আছে।আমি দৃশ্যটা দেখলাম কিন্তু এটা খুবি সাধারণ একটা ঘটনা।
দুই-তিন মিনিট পর আবার সাপের উপর চোখ পড়লো।দেখলাম সাপটা তার মাথা পানির ভিতর ঢুকিয়ে দিলো।আবার সঙ্গে সঙ্গে মাথাটা উঠালো,কিন্তু তার মুখে প্রায় এক হাত লম্বা একটা সিলভার কার্প মাছ।সাপের মাথার অনুপাতে সাপটা সাতগুণ বড় হবে।আমি অবাক হলাম,এতো বড় মাছ ধরে ফেলেছে!তারপর যা দেখলাম তা আমি কখনোই ভুলতে পারি না।এতো বড় মাছ সাপ গিলে ফেললো এক নিমিষে।সাপের গলা রাবারের মতো মোটা হচ্ছে।এটা দেখে আমি ভয়ে ঘেমে গেলাম।তাড়াতাড়ি চলে আসলাম।

তখন আমি ছোটো কতগুলো বাচ্চাকে পড়াতাম।পরেরদিন যখন ওরা পড়তে আসলো আমি ওদেরকে যখন "অজগর টি আসছে তেড়ে" এটা পড়াতে গেলাম কিছুতেই পড়াতে পারছিলাম না।যখনি আমি অজগরের ছবির উপর হাত দিয়ে পড়াতে যাবো তখনি আমার মনে হচ্ছিল,সাপ এই বুঝি আমার হাত কামড়ে দিবে,আমার হাত আস্ত গিলে খাবে।সেই ভয় এতো বছরেও আমি কাটিয়ে উঠতে পারিনি।জীবিত সাপতো অনেক পরের বিষয়,প্লাস্টিকের খেলনা সাপও আমি দেখতে পারিনা।সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যদি কখনও কোনো সাপের ছবি ভুল করে আমার চোখে পড়ে যায় তখন কেনো জানি আমি ঠিক থাকতে পারি না।আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে, শরীর ঘেমে যায়।সেদিন রাতে আর ঘুমাতে পারি না।চোখ বন্ধ করলেই চোখের সামনে সাপ ভেসে উঠে।আমি জানিনা এ সমস্যা থেকে কিভাবে মুক্তিপাবো।আমি নিজেকে বুঝাতে চেষ্টা করি, কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না।এর সমাধান কি?আমি কি কখনও পারবো এ কঠিন সমস্যা থেকে বের হতে!

সমাপ্ত

depositphotos_10351299-stock-illustration-snake-cartoon.jpg