আমার মেয়ে,যখন ও আমার পেটে আসলো সবার কৌতুহল, ছেলে হবে না মেয়ে।কেউ জিজ্ঞেস করে পেটের কোন পাশে ভারি লাগে।কেউ জিজ্ঞেস করে কোন পা ভারি।কেউ বলে কি ধরনের খাবার খেতে ভালো লাগে। প্রশ্ন যায় হোক সবার উদ্দেশ্য কিন্তু এক, ছেলে হবে না মেয়ে তা বুঝার অধম্য চেষ্টা। এভাবে পাঁচ মাস কেটে গেলো।এর পর আলট্রাসনোগ্রাফ করলাম।
আলট্রাসনোগ্রাফ করার পর ডাক্তার বললো ছেলে হবে।আমি খুশি হলাম।কিন্তু কথাটা আমি কাউকে বলিনি।এবার আমি নাম রাখবো। কিন্তু আমি যত নাম পছন্দ করি সব মেয়েদের নাম।নাম ঠিক করতে পারি না।আমি যখন ওর জামা কিনবো বলে দেখি,মেয়েদের জামাগুলোই আমার ভালে লাগে।এভাবে চলে গেলো আট মাস।
আবার যখন আলট্রাসনোগ্রাফ করলাম, এবার ডাক্তার বললো মেয়ে হবে।তাতে আমি কষ্ট পাইনি, বরং খুশি হয়ে ছিলাম।আসলে আমার আনন্দ ছেলে বা মেয়েতে আটকে নেই।আমার সন্তান পৃথিবীতে আসবে,সে ছেলে না মেয়ে তাতে আমার কিছু যায় আসে না।এবার ওর নাম ঠিক করলাম,জামা কাপড় কিনলাম। ওর বাবা প্রথম থেকেই বলতো আমার মেয়ে চাই।
যাইহোক আমার মেয়ে পৃথিবীতে আসলো।কেউ কেউ তো বলেই দিলো, আচ্ছা তোমাদের সব বোনদের প্রথমে মেয়ে হয় কেনো? ওদের প্রশ্নের উত্তর কিংবা উত্তর দেওয়ার মন মানসিকতা কোনটায় আমার নেই ।এবার ওকে নিয়ে সবার কৌতুহল। আচ্ছা ও ফর্সা না কালো।কেউ বলে ও ফর্সা হবে।কেউ বলে অতটা ফর্সা হবে না।কেউ বলে রংটা চাপাই হবে।মেয়েদের নাকি ফর্সাই হতে হয়।আমি আমার মেয়ের মুখে দিকে তাকিয়ে থাকি,মনে মনে ভাবি আচ্ছা ও ফর্সা না কালো।বুঝতে পারি না।
কারণ ওরদিকে তাকালে আমি দেখি পৃথিবীর সব সৌন্দর্য নেমে এসেছে ওর মুখে। আনন্দে আমার মন,প্রাণ অন্তর নেচে ওঠে। ও ফর্সা নাকি কালো বিবেচনা করার মতো নিরীক্ষণ ক্ষমতা আমার থাকেনা।আচ্ছা মেয়েদের কেনো ফর্সা হতে হবে? ফর্সা কি কাজে লাগে?আমার এ ছোট্ট জীবনে অনেক ধাপ পেরিয়ে এসেছি।
পড়াশোনা করেছি,চাকরির পরীক্ষা দিয়েছি,চাকরি করেছি,ব্যবসা করেছি, সংসার করছি। কোথাও ত্বকের কোনো পরীক্ষা হয়নি।কোথাও এ ত্বক কোনো কাজে লাগেনি। আর এমনও হয়নি যে আমার ত্বক কালো বলে আমি একটা কাজ করতে পারিনি। তাহলে এই কালো না ফর্সা নিয়ে কেনো এতো কথ!কেনো এই তর্ক বির্তক। আসলে সৌন্দর্যের প্রয়োজন আছে। কিন্তু সৌন্দর্য কালো বা ফর্সায় আটকে থাকে না।আমার মেয়ে সুন্দর। আমার মেয়ে সুন্দরী। ওর গায়ের রং ওর। সেটা কালো হোক বা ফর্সা।এটাই ওকে করেছে অনন্য।
ওকে নিয়ে বলতে বলতে আমার এক চাচাতো বোনের কথা মনে পড়ে গেলো। ওরা নয় বোন এক ভাই।ভাইটা সবার ছোট। একটা পরিবারে যখন পর পর দুইটা কন্যা শিশুর জন্ম হয় তখন পরিবারের সমস্যা থাকুক আর না থাকুক পাড়া প্রতিবেশীর সমস্যা তো থাকবেই। কবর কবিতার ঐ লাইনটার মতো ''হাতে যদিও না মারিতো শতো মারিতো ঠুঁটে"।সেই মাইর থেকে ছোট্ট কণ্যা শিশুটিও বাদ পরে না।
ওরা নয় বোন।আবার গরিবের সন্তান। শত বঞ্চনা সহ্য করে বড় হতে হয়েছে তাদের। তাই পর পর মেয়ে জন্মটাকে অভিশাপ হিসাবে দেখেই বড় হয়েছে। তাই নিজের বিয়ের পর যখন পর পর দুটি মেয়ে হলো সে মানসিক ভাবে ভেঙে পড়লো।ছেলে সন্তানের আসায় তৃতীয় বার সন্তন নিলো।কিন্তু বিধিবাম আবার কন্যা সন্তান তার গর্বে।
আধুনিক বিজ্ঞানের কণ্যাণে শিশু জন্মের আগেই আমরা লিঙ্গ জানতে পারি।সেও জেনেছে। যখন জেনেছে তখন পাঁচ মাস পেরিয়ে ছয় চলছে তার গর্ভ অবস্থা। কিন্তু তৃতীয় বার সে মেয়ে সন্তান জন্ম দেবে না।আর কিছু ডাক্তার তো আছে যারা টাকার বিনিময়ে মানুষের হাতে বিষ তুলে দেবার আগে একবারও ভাবার প্রয়োজন বোধ করে না।কোন এক ডাক্তার তাকে সন্তান নষ্ট হওয়ার ঔষধ দেয়।সেটা খাওয়ার পর ব্লিডিং শুরু হয়, আর বন্ধ হয়নি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করার আগে।
এতে অবশ্যই এ সমাজের কিছু যায় আসে না।মাকে হারিয়েছে ছোট্ট দুটি শিশু। সন্তান হারিয়েছে মা বাবা।সবার মানসিক শক্তি সমান থাকে না। সবাই সব সহ্য করতে পারে না।এসব বুঝার দায় এ সমাজের নেই।যদি শুনে মেয়ে রেখে দ্বিতীয় বার বাচ্চা হবে, ঠোঁট দুটি নাড়িয়ে বলে দেবে ইদানীং ছেলে হলে ভালো হবে।এতে সন্তান সম্ভবা মায়ের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর কতটা চাপ তা কেউ ভাবে না।