গ্রামের লোকেরা বলে, সবার হাতের রান্না ভালো হয় না।মানে রান্না ভালো করতে হলে হাতের জোস লাগে।হাতের জোস কি আমি জানি না।তবে রান্না একটা শিল্প।এতে যে যত বেশি মনযোগী তার রান্না ততো ভালো।আরেকটা বিষয় হচ্ছে মসলার পরিমাণ। যে যত পারফেক্ট ভাবে মসলা দিতে পারে তার রান্না তত বেশি মজাদার হবে।
আমার বাবার চার বোন।মানে আমার চারজন ফুফু।তারা সবাই ছিলেন রুপবতী,গুণবতী,কেশবতী।যদিও বড় ফুফুকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি।তবু্ও ওনার অনেক গল্প শুনেছি।তিনি আমার জন্মের বহু বছর আগে মারা গেছেন। কিন্তু বাকী তিন জনকে দেখেছি। তিনজনের মধ্যে যিনি বড় ওনার শ্বশুর বাড়ি আমাদের বাড়ি থেকে এক কিলোমিটার হবে।
তিনি যদি সামান্য একটা আলু ভর্তাও করতেন তাও স্পেশাল মনে হতো। ফুফুদের বাড়িতে গেলে দেখতাম ওনাদের পাড়ায় কারো ঘরে মেহমান আসবে কিংবা মেয়ের জামাই আসবে ফুফুর কাছে এসে বলতো,"ভাবী কিংবা চাচী মাংসটা একটু বসিয়ে দিয়ে আসবেন! আপনি একটু হাত লাগাইলে আর চিন্তা থাকতো না"।কিন্তু এতো ভালো রান্নার রহস্য আমার জানা হয়নি। কারণ আমার বয়স যখন নয় কি দশ তখন তিনিও মারা যান।
এরপর আসি আমার মোস্ট ফেবরিট মেজু ফুফুর কথায়।প্রথমেই বলে রেখেছি আমার ফুফুরা রূপবতী, গুনবতী, কেশবতী।আমার মেজু ফুফুর মনটা কোমল আর স্বচ্ছ।যেখানে ছিলো না কোনো কুটিলতা জটিলতা। আমাদের ভালোবাসতেন হৃদয় উঝার করে।ছোট বেলায় যখন ওনার বাড়িতে যেতাম কত মজার মজার রান্না করে খাওয়াতেন। আজও ভুলিনি।
আমি এসএসসি পরীক্ষার পর অনেক দিন ছিলাম ফুফুর বাড়িতে। সব সময় ফুফুর সাথে সাথে থাকতাম এটাই স্বাভাবিক।ফুফু রান্না করলে পাশে বসে দেখতাম। খুবই অবাক হতাম।কারণ কেমন আলতো ভাবে রান্না করতেন। কোনরকম তেল মসলার বাড়াবাড়ি নেই।কিন্তু খেতে গেলে প্রথম সারির রান্না। একদিন আমি বললাম," হম্মা,
আপনি কত স্বাভাবিক ভাবে, সহজ ভাবে রান্না করেন তবুও এতো মজা হয়"।আমাদের কিশোরগঞ্জের ভাষায় ফুফুকে হোয়াম্মা বলে,ফুফু আম্মা সংক্ষিপ্ত হয়ে এমন শব্দ তৈরি হয়েছে।
যাইহোক,ফুফু সেদিন বলেছিলেন, মা রান্না করতে জানলে ছত্রিশ রকম মসলাও লাগে না সাতবার কষানো মজানোও লাগে না,এমনিতেই সুস্বাদু হয়।তখন অবশ্যই রান্নার 'র'ও জানতাম না।কারণ আম্মা আমাদের কখনো রান্না করতে দিতেন না।মূলত আমাদের কোন কাজ করতে দিতেন না।শুধু পড়াশোনায় মনযোগ দিতে বলতেন।
যাইহোক এখন বুঝি।হম্মার রান্নার কথা বলতে বলতে চিংড়ি মাছ দিয়ে পুঁইশাক রান্নার কথা মনে পরে গেলো।এটা আমার মোস্ট ফেভারিট রেসিপি গুলোর একটি।
এই ডিজিটাল যুগে আমাদের সবচেয়ে বড় বদঅভ্যাস হচ্ছে স্মার্ট ফোন স্ক্রোল করা।আর এটা আমার বদঅভ্যাস গুলোর প্রধান।কয়েকদিন আগে এভাবেই স্ক্রলিং করতে করতে ফেইসবুকে চোখে পড়লো পুঁইশাক দিয়ে চিংড়ি মাছের রেসিপি। বিয়ে বাড়ির শাহী মাংস রান্নার সকল মসলা নিয়ে বসে গেছেন ভদ্র মহিলা পুঁই চিংড়ি রান্না করতে। দেখে মনে মনে ভাবলাম ঐ ভদ্র মহিলাকে একদিন ব্যক্তিগতভাবে দাওয়াত করে পুঁইচিংড়ি খাইয়ে দেবো।কিন্তু তার জন্য শাহি মসলা লাগবে না।হলুদ, ধনিয়া,লবণ, তেল,পেঁয়াজ হলেই যথেষ্ট।
ওনার রান্না নিয়ে আমি ভৎসনা করছি না।তবে সবকিছুর একটা সীমা থাকা দরকার আমি মনে করি।বাকী থাকলো আমার ছোট ফুফু রান্না কথন।এটা নিয়ে আমি আর লিখতে চাই না কারণ তিনি আমার একমাত্র ফুফু যিনি বেঁচে আছেন। তাই এই লিখা পড়ে কারো আমার ফুফুর হাতের টেস্টি ফুড খেতে ইচ্ছে হলে বলতে পারেন।খাইয়ে নিয়ে আসবো।
এরপর আসি আমাদের তিনবোনের রান্না বিতানে।আমরা তিনবোন ফুফুদের মতো এতো রুপবতী না হলেও গুণ মনে হয় জীনগতভাবে পেয়ে গেছি।আমরা ছোট থেকে রান্না শিখিনি।বিশেষ করে আমি রান্না শিখেছি আমার বিয়ের পর।তাও কিভাবে জানি ভালো রান্নার তকমা টা পেয়ে গেলাম।
আমার দুই আপা ওরা বিয়ের আগে রান্না শিখলেও রান্না করেনি। শুধু আম্মা কোনো কারণে একবেলা বাড়ি না থাকলে হয়তো ডিম ভেজে ভাত রান্না করে চালিয়ে দিয়েছে। অথচ এখন যেকোনো ধরনের রান্না অতি সহজে করে দেবে।যে খাবে সে দ্বিতীয় বার খাওয়ার ভাসনা অবশ্যই রাখবে।
এছাড়াও আমি দেখেছি বাবুর্চির ছেলে বাবুর্চি হলে যতভালো রান্না করে নতুন কোন বাবুর্চি ট্রেনিং করে আসলেও তেমন রান্না করতে পারে না।তাই আমার মনে হয় রান্নায় হাতের কেরামতি না থাকলেও বংশগত একটা ব্যাপার থাকে।