অর্থ ছাড়া জীবন অচল এর থেকে বড় সত্যি পৃথিবীতে নেই।আর একটা সত্যি কথা হলো কোটিপতি থেকে ভিখারী সবাই ছুটছে টাকার পিছনে। যার যত বেশি টাকা তার তত বেশি প্রয়োজন। হ্যাঁ এসব কথা সত্যি তাই বলে টাকার কাছে সম্পর্ক মূল্যহীন নয়।
আজ শাওন বলছিলো তার এক পরিচিত যার নাকি ক্যান্সার হয়েছে। ছেলেটা তিন ভাই বোনের মধ্যে সবার ছোট।তার বড় দুইটা বোন। সে পরিবারের এক মাত্র পুত্র সন্তান। তাই তাকে ঐ পরিবারের প্রাণ ভোমরা বলা চলে।তাই অতীব প্রয়োজনীয় টাকার চেয়ে তার জীবনের মূল্য অনেক বেশি।যত সম্পদ বা টাকা পয়সা ছিলো সব দিয়ে তাকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে বাবা মা।
এবার অনেকের মনে হতে পারে আমি বেশি বেশি বলছি।আবার অনেকে অভিযোগ করতে পারে এক ছেলেকেই মানুষ ভালোবাসে পাঁচ বা দশ ছেলের বাবা মা কি তাদের সন্তানকে ভালোবাসে না।আমি এক কথায় বলবো অবশ্যই ভালোবাসে।কিন্তু আমাদের সমাজটা বড়ই অদ্ভুত। যেখানে জন্মের পর থেকেই মানুষের মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয় একটা বংশের জন্য পুত্র সন্তান কতটা গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া প্রত্যেক বাবা মায়ের এক অদ্ভুত দুর্বলতা থাকে পুত্র সন্তান প্রাপ্তির উপর। এই দুর্বলতা সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত নাকি সামাজিক সৃষ্টি আমার জানা নাই তবে তা চিরন্তন সত্য কেউ স্বীকার করে আবার কেউ স্বীকার করে না।
এছাড়াও আরেকটা সত্য হলো জীবনের প্রয়োজনে পুত্র সন্তান সবাই পছন্দ করে। বৃদ্ধ বয়সের ভরসার জন্য। এবার প্রশ্ন উঠতে পারে মেয়ে সন্তান কি বৃদ্ধ বয়সের ভরসা হতে পারে না।এখনতো মেয়েরাও স্বাবলম্বী। তারাও মা বাবার দায়িত্ব নিতে পারে। আমিও একমত তবে বাস্তবতা বুঝাতে দুইটা উদাহরণ দেই।
আমার বাবার চাচা, যার তিন ছেলে এক মেয়ে।মেয়েটা সবার ছোট।বাবা তখন থেকে প্যারালাইসিস হয়ে শয্যাশায়ী।অভাবের সংসারের ছেলেদের লেখাপড়া হয়ে ওঠেনি।বড় ছেলেটাকে আট কি নয় বছর বয়সে চা দোকানে দিয়ে দেয়।তখন থেকে সংসারের জোয়াল কাঁধে তুলে নেয় সে।চায়ের দোকানে কাজ করে নিজে একটা চায়ের দোকান দেয়।মেজু ভাইকে বিদেশে পাঠায়।এরপর ছোট ভাইকে বিদেশে পাঠায়।
এবার তিন ভাই মিলে ছোট বোনটাকে রাজকুমারীর মতো বড় করে।এখন বাবার সেই ছোট্ট ভিটার আশেপাশের জায়গা কিনে তিন ভাই তিনটা দৃষ্টি নন্দন বাড়ি করেছে।বোনকে বিয়ে দিয়েছে। বড় ভাই আর মেজু ভাই এখন বাজারে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী।ছোট ভাই এখনো বিদেশে। সমাজের কাছে এখন তারা ধনী না হলেও উচ্চ মধ্যবিত্ত।সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয়, যে মা বৃষ্টির দিন ঘুমাতে পারতো না বৃষ্টির পানিতে ভিজে ঘরের কোনে সন্তানদের নিয়ে বসে থাকতো তার তিন ছেলের তিনটা দৃষ্টি নন্দন বাড়ি।
সেসব বাড়িতে সে ঘুরে বেড়ায় মনের আনন্দে। এরপর আসি আমার মা বাবার বিষয়ে। তাদেরও চার সন্তান। কিন্তু বড় তিনজন মেয়ে, একমাত্র ছেলে সবার ছোট।আমি বোনদের মধ্যে ছোট। ভাই আমার থেকেও দশ বছরের ছোট। তাই বলা চলে আমার ভাই বাবা মার শেষ বয়সের সন্তান। আমার মা বাবা অত্যন্ত যত্নের সাথে আমাদের বড় করেছে। আমাদের তিন বোনকে উচ্চশিক্ষিত করেছে।আমার তিন বোনই উপার্জন করি।তিন জনের স্বামীও উচ্চশিক্ষিত চাকুরীজীবি।
আমার ভাই এইচএসসি পাশ করার পর আমার বাবা মারা যান।পড়াশোনার জন্য ভাইটা ঢাকায় থাকে। মা একা বাড়িতে থাকেন। আমরা তিন বোন ভালো আছি। কিন্তু উপার্জনের কেউ নেই তাই আম্মার সংসার চলে কোনো ভাবে।অন্যদের কথা জানি না আমি চেয়েছি আমার ভাইটাকে রাজপুত্র করে রাখতে। কিন্তু পারিনি। কিন্তু কেনো। আমার স্বামী কি আমাকে বাধা দিয়েছে? তাতো কখনো দেয় নি, এমন কি উল্টো সাহায্য করেছে। তারপরও পারিনি।
ওদের তিন ভাইয়ের চেয়ে আমরা তিনবোন কম উপার্জন করিনা কিন্তু আমার বাপের ভিটায় দৃষ্টি নন্দন তো দূরের কথা একটা স্বাভাবিক ঘরও বেঁধে দেওয়া হয়নি। তাদের নিজের তৈরী করা ঘরেই তাদের বসবাস করতে হয়। তাতেও হয়তো সমস্যা হতো না যদি সম্পত্তি ভাগের ক্ষেত্রে সমস্যা না হতো।
পৃথিবীর সবাই চায় তার কষ্টে উপার্জিত সম্পদ তার সম্তানরা ভোগ করবে।এটা খুবই স্বভাবিক। কিন্তু পুত্র সন্তান না থাকলে তার সম্পূর্ণ সম্পদ তার মেয়েরা পাই না।তখন সে ভাই,ভাতিজা,বোন এমন সকলের মাঝে ভাগ হয়।
তাই,এসব বিষয় চিন্তা করলে মনে হয়, ছেলে সন্তান থাকা বাব-মা’র জন্য আশির্বাদ।অন্তত আমাদের এই সমাজ ব্যবস্থায়।
সেই পুত্র সন্তান যদি একমাত্র হয়। সেতো অন্ধের যষ্টি। সে পরিবারের আনন্দ, হাসি,সুখ।তাই তাকে নিয়ে হারনোর ভয়তো থাকবেই। তার প্রাণের কাছে টাকা তুচ্ছ।লিখার শুরুতে যে বলছিলাম ছেলেটাকে বাঁচানোর জন্য সবকিছু দিয়ে দিচ্ছে বাবা-মা।এটাই তার প্রমাণ।
আমি শুধু বাস্তবতাটা ব্যাখ্যা করলাম। সবাই এর সাথে একমত না হতেই পারে।এছাড়াও যাদের ছেলে নেই তাদের জীবনতো আর বসে থাকে না।এমনকি যাদের সন্তান নেই তাদেরও দিন চলে যায়।