ছোট থেকে সাইকেলের প্রতি আমার বিশেষ আকর্ষণ ছিলো। কিন্তু আমাদের ছোট বেলায় গ্রামে মেয়েদের সাইকেল চালানোর কথা ভাবাই যেতো না।কিন্তু আমার আম্মা আমাদের একটু স্বাধীনচেতা ভাবে আমাদের বড় করেছে। ওনার রোলস মেনে সবই করা যাবে।
উনার রোলস বলতে, সন্ধ্যার পর খেলাধুলা করা যাবে না,সকাল,বিকেল,রাত পড়াশোনা করতে হবে,পাড়া বেড়ানো যাবে না,পাড়ার দুষ্ট বাচ্চাদের সাথে মিশা যাবে না এইসব।কিন্তু পাছে লোকে কিছু বলে নিয়ে এতো মাথা ব্যথা নেই। তাই আমি সাইকেল চালোনো শিখতেই পারি।কিন্তু তাহলে আবার 'কিন্তু' কিসের? মনে হতেই পারে। 'কিন্তু' তো আছেই।সাইকেল চালানো শিখতে হলে সাইকেল তো লাগবে।আমাদের তো সাইকেল নেই।
কারণ আমরা তিন বোন।আব্বা বাড়িতে থাকে না।সাইকেল চালাবে কে।আমার মামাতো ভাই আমাদের বাড়ির কাছের স্কুলে পড়াশোনা করতো।তার একটা ছোট লাল সাইকেল ছিলো। সে এটা দিয়ে স্কুলে আসতো। কিন্তু স্কুলে সাইকেল রাখার জায়গা ছিলো না। তাই আমাদের বাড়িতে রেখে যেতো।তালা লাগানো থাকতো। চাবি ঘরে রেখে যেতো।তখন আমি এই সাইকেল দিয়ে সাইকেল চালানো শিখতে শুরু করি।কিন্ত ও স্কুলে যতক্ষণ থাকে ততক্ষণই সাইকেল আমাদের বাড়িতে থাকে। আমিও তখন স্কুলে থাকি। তাই চালানো হয়না।
এভাবে অল্প অল্প করে চালিয়ে আমি সাইকেল চালানো শিখি।এরপর আমার মামাতো ভাই বিকেএসপিতে ভর্তি হয়ে ঢাকায় চলে যায়,আমারও সাইকেল চালানো বন্ধ। মাঝে বাড়িতে সাইকেল দিয়ে কেউ আসলে আমি সাইকেল নিয়ে প্র্যাকটিস করতাম।এরপর ইন্টার পাস করার পর আমিও ঢাকায় চলে আসি। সাইকেল চালানো পুরোপুরি বন্ধ।
তারপর ভাইয়ের স্বপ্নের সাইকেল কিনে দিলাম। ইচ্ছে ছিলো দুই একদিন চালাবো।কিন্তু সময় বা সুযোগ কোনটায় আর হয়নি। তাই সাইকেল চালানোও আর হয়নি।দীর্ঘ আট বছর ঢাকায় থেকে একবারও আর সাইকেল চালাতে পারিনি। এরপর মালয়েশিয়া চলে আসলাম।সাইকেলের কথা ভুলে গেলাম।
মালয়েশিয়া আসার পর কোরবানি ঈদের দিন মালয়েশিয়ান এক কাকা(আপা) আমাকে বলে "তিতি ওয়াংসা" পার্কে যাচ্ছি তোরা যাবি?ভাবলাম ঘুরে আসি।গিয়ে দেখি ঐপার্কে একটা বড় ঝিল এর পাশ দিয়ে রাস্তা। এখানে সাইকেল ভাড়া ঘন্টা হিসেবে। এ পার্কে সবাই আসে সাইকেল চালাতে। বিভিন্ন ধরনের সাইকেল। আমরা একটা ডাবল সাইকেল নিয়ে দুইজনে চালাইছি।আমিতো মহাখুশি মাঝে মাঝে এসে সাইকেল চালাবো।কিন্তু এরপর একদিন গেলাম গিয়ে দেখি সংস্কারের জন্য বন্ধ। পুরা পার্ক ভেঙে নতুন করে বানাতে দুই বছর সময় লেগেছে।
এরপর পৃথিবীতে করোনার আগমন।এরপর আবার মানহা পেটে, এরপর মানহা ছোট এসব করে করে আমার সাইকেল চালানো আর হয়না।এখন মানহা হাঁটতে পারে তাই গতমাসে গেলাম।সব ঠিকই ছিলো কিন্তু আমি যেনো সাইকেল চালানো ভুলে গেছি। ঐদিন আমার একটু শারীরিক অসুস্থতা ছিলো তাই চালাতে পারিনি।
এরপর এই রবি বারে আবার সাইকেল চালাতে গেলাম।প্রথমে মাঠে মানহাকে নিয়ে খেলা করে তারপর যাবো সাইকেল চালাতে।মানহার বল বিমান নিয়ে যাওয়া হয়েছে।বল আর বিমান ছুড়ে দিলে মানহা কুড়িয়ে নিয়ে আসে।এটাই খেলা।ওর বাবা একবার বিমান এতো জোড়ে ছুঁড়ছে ঝিলের পানির মধ্যে গিয়ে হাবু ডুবু হয়ে গেছে।আমি ভাবলাম মানহার বিমানের আজ সলীল সমাধী নিশ্চিত। কিন্তু ঝিলে কিছু বোটম্যান ছিলো।
মানহার পাপা সোনা বুদ্ধি করে তাদের ডেকে এনে বিমান উদ্ধার করেছে।কিন্তু তখন সব কিছু গুছিয়ে আমরা সাইকেল চালাতে চলে গেলাম।প্রথমে মানহাকে নিয়ে মানহার পাপা সোনা সাইকেল চালালো।এরপর আমরা তিনজন একসাথে সাইকেল চালিয়ে ঘুরলাম। এরপর আমি আবার চেষ্টা করতেছি একা চালাবো।মানহা পাপা সোনা ধরতে চাই। আমি বলি একা চালাবো।এরপর সাহস করে প্যাডেলে দিলাম পা। ওমা সব ভয় হারিয়ে গেছে আরামসে গোল গোল করে ঘুরতেছি আর সাইকেল চালাচ্ছি।
আমার মনে তখন আনন্দের বন্যা ভাসছে। আমি একটা বিষয় বুঝতে পারলাম কোন কিছুর প্রশিক্ষণ নিলে তা কেউ ভুলে যায় না।আমার মুক্তিযুদ্ধা মামা বলতেন, অস্ত্র জমা দিয়েছি প্রশিক্ষণ জমা দেইনি।মানে অস্ত্র জমা দিলেও তিনি যুদ্ধা।আজীবন যুদ্ধা।