আমার বাসা বেনারসি পল্লীর কাছে।তাই মাঝে মাঝে যাওয়া হয়।আসলে বেনারসি তো আর প্রতিদিন কিনার জিনিস না।এখানকার বেনারসি গুলো এতো সুন্দর দেখলে মন ভালো হয়ে যায়।তাই এখানকার প্রায় সকলের সাথে আমার ভালো সম্পর্ক। এখানে প্রতিদিন শত শত লোক আসে বিয়ের বেনারসি কিনতে।আমি এসব দেখি। কে কেমন বেনারসি কিনেছে। কত দাম ইত্যাদি ইত্যাদি।
আমি এখানে থাকি প্রায় বারো বছর। কতজনকে বেনারসি কিনতে দেখেছি তার হিসাব দেওয়া সম্ভব না।কিন্তু আজ একটা ব্যতিক্রমী বিষয় দেখলাম। মা আর মেয়ে এসেছে বেনারসি কিনতে।প্রথমে এসেই বলে কালো বেনারসি দেখাতে। দূর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য কালো বেনারসি কোনো দোকানে নেই।এরপর অর্ডার করলো এক সপ্তাহ পর নিবে।
হঠাৎ মাকে বলতে শুনলাম এটা না হয় নীল নিয়ে চল।লেহেঙ্গা তো কালো নিয়েছিস তমা।ও সঙ্গে সঙ্গে বললো না আমি কালোই পড়বো।আমি বুঝতে পারছিলাম না কোথায় পড়বে।তাই একটু কৌতুহলী হয়ে এগিয়ে জিজ্ঞেস করলাম ''কালো বেনারসি পড়ে কোথায় যাবেন?'' মা একটু হেসে ওমা কোথায় আবার যাবে। সামনে মাসে ওর বিয়ে তাই বেনারসি কিনতে এসেছি।আমি ব্রু কুঁচকিয়ে বললাম, বিয়েতে কালো বেনারসি পড়বে!
কিছু না মনে করলে একটা কথা বলবো আন্টি।বলো কি বলতে চাও।আপনার মেয়ে বিয়েতে কালো বেনারসি পড়বে আপনি তাতে রাজি।কিছু বলছেন না আবার অর্ডার করে বানাতে দিলেন। উনি একটা বড় হাসি দিয়ে বললেন কালো ওর পছন্দের রং।আর কালো পড়লে ওকে সুন্দরও লাগে।কেউ চোখ ফেরাতে পারবে না।সেসব ঠিক আছে তাও আন্টি শুভ অশুভ বলে কথা আছে। বিয়ের মতো শুভ কাজে মানুষ বেড়াতেও যায় না কালো জিনিস পড়ে। সে বিয়ে করবে কালো বেনারসি পড়ে। তাই বললাম। যার যেমন ইচ্ছে।
আমি একথাটা বলতেই ওনি আমার হাত ধরে টেনে বসালেন। মা শুভ অশুভের কথায় যখন বললে তাহলে বসো একটা গল্প বলি।তমা এখন এখানে নেই। ওর সামনে কথা গুলো বলিনি যদি ওর মন খারাপ হয়।এখন বলতে পারি।তমা আমার মেয়ে নয়।পুত্র বধু।তাহলে যে বললেন একমাস পর বিয়ে। হ্যাঁ একমাস পর ওর বিয়ে আমার বোনের ছেলের সাথে। আমি ওনার কথার আগামাথা বুঝতে পারছিলাম না।বললাম বুঝিয়ে বলেন আন্টি।
তমার বয়স যখন সতেরো তখন আমার এক মাত্র ছেলের সাথে ওর বিয়ে দেয় আমার স্বামী পছন্দ করে। বিয়ের দুই বছর পর জন্ডিস হয় আমার ছেলের। কি হলো জানিনা হঠাৎ সে মারা যায়।তখন তমা ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে পরে।আমার আর কোনো ছেলেমেয়ে নাই।
দুই বছরে তমা আমাকে মায়ের জায়গা দিয়ে দেয়।আমার ছেলের মৃত্যুর পর তমার মা বাবা ওকে নিয়ে বিয়ে দিতে অনেক চেষ্টা করে। তমা যায়নি।আমার বাড়িতে থেকে সে অনার্স শেষ করে এখন মাস্টার্স করছে। এখন প্রাইমারী স্কুলে জব করে। এখন ওর বয়স আটাশ বছর। সে আমার নিজের মেয়ের থেকেও বেশি আপন।ওকে ছাড়া আমাদের আর কেউ নাই। বিয়ে না করে এভাবে আমাদের সাথে থেকে জীবন নষ্ট করবে সেটাও মানতে পারবো না।তাই বোনের ছেলের সাথে বিয়ে দিয়ে বাড়িতে রাখবো।
ঐযে শুভর কথা বললে ঐবার বিয়েতে লাল টুকটুকে বেনারসি পড়েই এসেছিলো আমার বাড়িতে। লাল বেনারসি আমার ছেলেকে বাঁচাতে পারেনি।তাই ইদানীং বিয়ে হবে ওর মনের মতো।কোনো শুভ অশুভ, শুদ্ধ, অশুদ্ধ এসব কথা আসবে না।প্রাণ ভরে মন থেকে দোয়া করে মেয়ে কে বিয়ের পিড়িতে বসাবো।এরপর সব ভালো হবে আসা করবো।এইটুকুই।
এই নয় বছর তাকে যেভাবে আগলে রেখেছি বাকী জীবনটাও আগলে রাখবো।লাল শাড়ির যে উদাহরণ আমি তোমাকে দিলাম সেটা শুধু শুভ অশুভ বলে কিছু হয়না এটা বুঝাতে। আমার ছেলে চলে গেছে বলে তমার জীবন শেষ এমন আমি কখনো ভাবিনি।আমার ছেলের হায়াত শেষ সে চলে গেছে। তাই তমা সুখে বাঁচতে পারবে না এটা কেমন!