নিয়মানুবর্তিতা, সময়ানুবর্তিতা,পরিকল্পনা এসবের কথা আমরা সবাই বলি।কিন্তু মেনে চলি কয়জন।কিংবা যারা মেনে চলতে চেষ্টা করে তারাও কি পারে সুষ্ঠুভাবে পালন করতে।আসলে আমাদের জীবনে মাঝে মাঝে এমন কিছু পরিস্থিতি আসে যা সামলাতে গিয়ে এসব নীতি কথা মেনে চলার বিষয়টাই আমাদের মনে থাকেনা।
এটা খুব স্বাভাবিক, এতে দোষ খুঁজার কোনো কারণ নেই।আমরা অনেক পরিকল্পনা করি।কিন্তু আমাদের সব পরিকল্পনা কি বাস্তব রূপ পায়?হয়ত পায় নয়তো নয়।তবে এটাই জীবন। এসব মেনে সামনে এগিয়ে যাওয়ায় বুদ্ধিমানের কাজ।
আজ আমার মনটা খুব খারাপ। এই দীর্ঘ প্রবাস জীবনে বন্ধু পেয়েছি অনেক, এসব বেশির ভাগই হয় ইন্দোনেশিয়ান নয় মালয়।কারণ এখানে বাংলাদেশী অনেক তবে মহিলা খুব কম।আর যারা আছে তাদের বেশির ভাগ মধ্যবয়সী নারী যারা কাজের জন্য এসেছে।
যখন মানহা পেটেছিলো তখন আমি আমাদের বাসার পাশের একটা মা ও শিশু ক্লিনিকে চেকআপ করাতাম।সেখানে আরেকজন মহিলাও চেকআপ করাতো। সেখানকার ডাক্তাররা আমরা দুইজনই বাঙ্গালী তাই আমাদের চিনে ভালো।এক ডাক্তার একদিন আমাকে বলে আরেকজন যে আসে সে কি আপনার বান্ধবী। আমি বললাম না।কিন্তু আমি বুঝতে পারলাম আরেকজন বাংলাদেশী আছে এখানে।এরপর একদিন দেখি ওনি বসে আছে। আমি বুঝতে পারলাম তিনি বাংলাদেশী।
কিন্তু সময় ছিলো না তাই কথা বলা হয়নি।ওনি বুঝতে পারেনি আমি বাংলাদেশী।পরের তারিখে আমি সকাল সকাল গেলাম দেখি তিনি বসে আছেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম ''আপনি বাংলাদেশী"?
ওনি খুব খুশি হয়ে গেছে। যে আমি বাংলাদেশী।ওনারও আমার মতো অবস্থা প্রথমবার মা হবে তার উপর একা।মনে মনে ভয়ে আছে।তাই আমাকে পেয়ে খুব খুশি। কিছুক্ষণ কথা বলার পর ওনার ডাক এলো তাড়াতাড়ি মোবাইল ফোন নাম্বার বিনিময় করে চলে গেলেন। এরপর আর দেখা হয়নি। বাসায় গিয়ে বিকেলে আমাকে ফোন দিলেন।আস্তে আস্তে প্রতিদিন কথা হয়। মূল বিষয় অভিজ্ঞতা বিনিময়।
এরপর মানহা হলো, ওনার ছেলে হলো।এরপর আবার ওদের টিকা দিতে যেতে হয় প্রতিমাসে।মালয়শিয়াতে প্রতিমাসে একটা করে ছয়মাস একধারে টিকা দেয়।একসাথে দুইচারটা দেয়না।এভাবে মানহার চারমাস বয়সে ওনার সাথে দেখা হয় ক্লিনিকে। এরপর আমরা নার্সকে বলে একি তারিখে আসার ব্যবস্থা করি।আমাদের সম্পর্ক আরও গভীর হয়।আমরা কে কোথায় যাচ্ছি, কি করছি, কি করবো একজনের খবর আরেকজন জানি।এইতো ঈদে তিনি আমাদের বাসায় আসলেন সারাদিন আমরা খুব ভালো সময় কাটালাম।এমাসের ৩ তারিখ আবার তিনি আমাদের বাসায় এসেছিলেন।
আমরা একসাথে রান্না করেছি খাওয়া দাওয়া করে সারাদিন থেকে সন্ধ্যায় বাসায় গেলেন।সেদিন আমরা অনেক পরিকল্পনা করেছি।আমি ভ্লগ ভিডিও বানায় এখন ওনি আমার কাছ থেকে সব শিখে নিলেন।ওনিও ভ্লগ করবেন তাই। আমরা একসাথে বিভিন্ন জায়গায় যাবো ভিডিও করবো। এইসব পরিকল্পনা করলাম।কিন্তু হঠাৎ গতসপ্তাহ তিনি অনুভব করলেন ওনি প্র্যাগনেন্ট। তাতে সমস্যা নেই কিন্তু তিনি ভয় পাচ্ছেন।
ছেলে ছোট ওনার আবার সিজারে বাচ্চা। একা একা কি করবে।আজ সন্ধ্যায় তিনি আমাকে মেসেজ করেছেন ওনার খুব মন খারাপ। আমি প্রশ্ন করলাম কেনো।তিনি বললেন তিনি হয়তো দেশে চলে যাবেন।ওনি স্টুডেন্ট ভিসায় ছিলেন। পড়াশোনা শেষে ওয়ার্ক পারমিট এর জন্য এপ্লাই করেছেন।ভিসা পেয়ে যাবে কিন্তু একবার দেশে গেলে আর আসতে পারবেন না। কারণ ছেলে এখানে জন্ম গ্রহন করলেও সে এখানকার নাগরিক না।সে ছয় বছর থাকলে তারপর আইসি পাবে।
উনি চলে যাবে শুনে আমার মনটা ভিষণ খারাপ। কিন্তু কি আর করা। প্রয়োজনের কাছে সবাই মাথা নত করতে বাধ্য।তাই আজ পরিকল্পনার কথা মনে পড়লো।সব সময় আমরা নিজের পরিকল্পনার বাস্তবায়ন করতে পারি না।এটা খুবই স্বাভাবিক।এমন অনেক পরিকল্পনা আছে যা আজীবন পরিকল্পনা হিসেবেই থেকে যায়।