প্রচলিত একটা কথা আছে ''নারীরা মায়ের জাত"।হ্যাঁ নারীরা মায়ের জাত। কিন্তু আমার মনে হয় নারী মানেই মা।এর সাথে সন্তান জন্মদানের কোন সম্পর্ক নেই। মানে আমি বুঝাতে চাচ্ছি সন্তান জন্ম দেয় বলে নারী মা এমন নয়।একজন নারী জন্ম গ্রহণ করে মা হয়ে।সে সন্তান জন্মদান করুক আর না করুক।
তার মাতৃত্ব প্রথম ফুটে ওঠে যখন তার ছোট ভাইবোনের জন্ম হয়।এর দুই একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। আমি যখন ছোট ছিলাম তখন আমার বড় আপা গোসল করিয়েছে, খাইয়ে দিয়েছে।এমন কি ক্লাস এইট পর্যন্ত আমার কাপড় গুলো ধুয়ে দিয়েছে। সে গুলো তাকে কেউ জোর করে করায়নি।আমাকে নিজের মতো সাজিয়ে রেখেছে নিজের ভিতরে অনুভব করা ভালোবাসা থেকে। আমার মেজু আপা। সে আমার তিন বছরের বড়।
ছোট বেলায় আম্মা খাবার মানে শুকনো খাবার আমাদের তিন বোনকে ভাগ করে দিতেন।হতে পারে বিভিন্ন ফল আম,জাম,বরই,লিচু ইত্যাদি। আমি ছোট বেলায় খুব খেতাম। আমার গুলো দেওয়ার সাথে সাথে খেয়ে নিতাম।বড় আপাও নিয়ে টেবিলে পড়তো আর খেতো।আমি আর ছোটো মানে মেজু বোন একসাথে বসে খেতাম।ছোটো প্রথমে ভালো গুলো আলাদা করে রেখে ছোট কম পাকা গুলো খেতো।তাও খুব আস্তে। ওর ছোট গুলো খাওয়ার আগে আমার সব শেষ।এখন আমি বসে আছি সে খাচ্ছে।
আমি চাইবো না। তাকাবোও না। কিন্তু আমার নেই সে খাচ্ছে সেটা সে মানতে পারবে না।সে আমার দিকে একটু রাগ করে তাকাবে বলবে "তুর শেষ! একটু আস্তে খেতে পারিস না"। বলে আমাকে দিয়ে দিবে ওর গুলো।আমি যদি বলতাম লাগবে না।সে হেসে আমার হাতে দিয়ে দিতো। এখন দুইজন দুই জায়গায় থাকি। নিজেদের সংসারে ব্যস্ত।তারপরও যদি আমার মন খারাপ হয় ফোনে হ্যালো বলতে দেরী হয় তার বুঝতে দেরী হয় না । ব্যতিব্যস্ত হয়ে যায়, কি সমস্যা, কেনো মন খারাপ।
আমি ছোট বেলা থেকে একটু শুচিবায়ু প্রকৃতির।আমি কারও মুখে খাবার তুলে দিতে পারতাম না।যদি আমার হাতে মুখ লেগে যায় এই ভয়ে।কোন বাচ্চার মুখেও খাবার দিতে পারতাম না।আমার ছোট ভাই আমার থেকে নয় দশ বছরের ছোট।ওর যেদিন জন্ম হলো সেদিনটার কথা আমার আজও মনে আছে।আমি ঘুমিয়ে গেছিলাম। সেদিন বুধবার ছিলো। হঠাৎ ওর কান্নার শব্দে ওঠে বসলাম।ঘড়িতে তখন ১১ টা বেজে ৫২ ।আব্বা আযান দিচ্ছে।
এরপর ওকে গোসল করিয়ে চৌকির উপর শুয়ে দিলো।কিছুক্ষণ পর ওকে খাওয়াতে হবে।আমি ওকে প্রথম খাইয়ে দিলাম ধনিয়া ভিজানো পানি।আমাদের এলাকায় তখন বাচ্চা হলে তিনদিন পর মায়ের দুধ দিতো।কেনো জানিনা, প্রথম ধনিয়া-সজ ভিজিয়ে পানি খাওয়াতো।আমিও তাই করলাম।
এরপরের দিন থেকে আমার ছাগলের দুধ নিজে দুইয়ে পানি মিশিয়ে পাতলা করে খাইয়েছি।যদিও ছাগলের দুধের গন্ধ আমি সহ্য করতে পারি না।ছোট বাচ্চারা তিন দিন কালো কষের আঠালো পায়খানা করে।আমি সেগুলো মাঠে যেখানে পানিতে স্রোত সেখান থেকে ধুয়ে নিয়ে আসছি।আমি নিজেই অবাক হয়ে যাচ্ছিলাম আমি কিভাবে পেরেছি?আমাদের পাশের বাড়ির এক ফুফু আছে যাকে দেখলে মনে হয়, মনে দয়া মায়া কিছুই নেই।আমাদের সমবয়সী।কিন্তু ওর যখন ভাই হলো মনেহলো ও যেনো মা হলো।
ওকে খাওয়ানো গোসল ঘুম পাড়ানো সবই সে করতো।হঠাৎ এসব বলার কারণ তাহলে বলেই দেই। আজ আমার এক পরিচিতের সাথে দেখা একটা শপিং মলে। ওনার সাথে আমার অনেক দিনের পরিচয়। চীনা নাগরিক। বয়স পঁয়তাল্লিশ হবে।আজ দেখি ওনার সাথে চারটা বাচ্চা। সব থেকে ছোট বাচ্চাটার বয়স চার বছর। বাচ্চাদের বিভিন্ন রাইডে চড়ালেন, নিজেও তাদের সাথে খেলাধুলায় ব্যস্ত।খেলা শেষে রেস্টুরেন্টে এসে খেতে দিলেন।ছোট বাচ্চাটাকাকে নিজ হাতে খাইয়ে দিলেন।
আমি ভাবলাম ও গুলো ওনার সন্তান। শেষে কোন একটা কথায় তিনি বললেন ও গুলো ওনার ভাইয়ের সন্তান আমি আশ্চর্য হয়ে বললাম আপনার ছেলে মেয়ে কতো বড়।ওনি বলে ওনার কোনো সন্তান নেই।কারণ ওনি সন্তান জন্মদানে অক্ষম।
তাই ভাইয়ের সন্তানদের নিজের করে নিয়েছেন।যদি সন্তান জন্ম দিলেই মা হতো তাহলে এমন হাজার হাজার বন্ধ্যা মা সন্তান পালক নিয়ে মা হতে পারতো না।