ছোট বেলা থেকে অভাব দেখিনি, না পাওয়া দেখিনি।গ্রামে বড় হলেও আমরা বড় হয়েছি শহরের মতো করে। খাওয়া দাওয়া সবই একটু স্টাইলিস্ট যাকে বলে।আমার বাবা সরকারি চাকরি করতেন।বাবা ছিলেন একটু আধুনিক মনা মানুষ। মা একেবারে সহজ সরল। ছোটবেলায় গান নাচ শিখেছি।আমরা দুইভাই দুইবোন।
আগেই বললাম মা সহজ সরল আর বাবা আধুনিক মনা চতুর ব্যক্তি। তাই আমাদের বড় হওয়াটা একটু এলোমেলো। বাবা আমাদের অবাধ স্বাধীনতা দিয়েছেন। ভালো ভাবে থাকতে হবে নিজেকে পরিপাটি রাখতে হবে।এক কথায় "ভদ্র লোকের জুতা পরিস্কার"। কিন্তু মাকে তিনি তেমন পাত্তা দিতেন না। তাই আমরাও হলাম এমনি মায়ের কথার গুরুত্ব কখনো দেয়নি।তাই যথেষ্ট স্বচ্ছলতা থাকা সত্ত্বেও আমাদের পড়াশোনা হয়ে ওঠেনি।বড়ভাই ডিপ্লোমা শেষ করেছিলো।
বড়বোন এসএসসি পাস করেছিলো। আমরা ছোট দুই ভাইবোন এসএসসির গন্ডি পাড় করতে পারিনি।যখন স্কুলে পড়তাম তখন অনেক ছেলের ক্রাশ ছিলাম।এরপর তিনবার এসএসসি দিয়েও যখন পাস করতে পারিনি তখন পড়াশোনা বাদ দিলাম।সব সময় বাড়িতে গয়নাগাটি পড়ে সেজেগুজে থাকতাম। দুইতিন বছর ঘরে বসে থাকার পর বড়বোনেরও বিয়ে হয়ে গেছে তাই পরিবার থেকে ঠিক করলো আমাকে বিয়ে দিয়ে দেবে।
আমি এস এসসি পাস করিনি কিন্তু আমার বাবা আমাকে সরকারি চাকরিজীবী, ভালো পরিবার, ধনী ছেলে ছাড়া বিয়ে দিবেনা বলে দিয়েছে। ঘটক পাত্র নিয়ে আসে, আগে বাবা খুঁজ নেয়, পছন্দ হলে দেখতে আসতে বলে। আমি সেজেগুজে পাত্রপক্ষের সামনে যায়।বাড়িতেই খাওয়া দাওয়ার আয়োজন হয়। পাত্র পক্ষ আমাকে দেখে টাকা দেয় কেউ পাঁচশ একটাকা কেউ এক হাজার এক টা।কিন্তু পরে আর খবর দেয় না।মানে আমাকে পছন্দ হয় না।এভাবে চার পাঁচ বছর কেটে যায়।
কত পাত্র পক্ষ আমাকে দেখে গেছে তার হিসাব নেই।অনেকেই আমাকে পছন্দ কিন্তু তাদেরকে চলে যেতে হয় কারণ বাবা তাদের পছন্দ করেননি।কিন্তু দুর্ভাগ্য আমার তখনি দেখা দিলো যখন আমার বাবা হঠাৎ প্যারালাইসড হয়ে যায়।অনেক চিকিৎসাই হয়েছে কিন্তু বাবা শুয়া থেকে ওঠতে পারেনি।বাবার অসুস্থ হওয়ায় একদেড় বছর কেটে গেছে বাবা সুস্থ হচ্ছে না।এরপর আবার আমার বিয়ে জন্য চেষ্টা করতে লাগলো।এভাবে বার বার পাত্র পক্ষের সামনে যেতে আমার ভালো লাগে না।এখন লোকের মুখে ছড়িয়ে গেছে আমার বিয়ে হয়না। যখন অষ্টম শ্রেণীতে পড়তাম তখন নাকি আমার এক ক্লাসমেটের ক্রাশ ছিলাম। সে তখন প্রবাসে চলে যায়।
এরপর আমি যখন সব দিকে কোনঠাসা, তখন তার সাথে ফেইসবুকে আলাপ।আস্তে আস্তে কথা শুরু হয়।এরপর প্রেম। ছোট বেলায় দেখেছিলাম, চেহারা তেমন মনে নেই। কিন্তু সুন্দর ছিলো সেটা মনে আছে।ফেইসবুকে ছবি দেখি তবে এসবে তত বিশ্বাস নেই।দুই বছর আমাদের সম্পর্ক। ও দেশে আসবে বিয়ে করার জন্য।সে বিদেশে থেকে আমাদের বাড়িতে প্রস্তাব পাঠিয়ে বিয়ের তারিখ ঠিক করে দেশে আসে।
দেশে আসার পরদিন আমাদের বাড়িতে আসে। মটর বাইক থেকে যখন নামছিলো জানালা দিয়ে আমি তাকে প্রথম দেখি।সত্যিকারের নায়ক।ছয় ফুট লম্বা হলুদ বর্ণের গায়ের রং, সুঠাম দেহ প্রেমেতো আগেই পড়েছি এবার আমি হারিয়ে গেছি তার রূপে। মনে তখন সুখের হাওয়া বইছে।বিয়ের একমাস পর সে আমাকে নিয়ে বিদেশে চলে যায়।সেখানে আমার মেয়ে হয়।ছয় মাসের মেয়ে নিয়ে দেশে আসি।সে আমাদের রেখে বিদেশে চলে যায়।সে দূরে থাকলেও সে আমাদের সাথে ছিলো সব সময়।মেয়ের যখন পাঁচ বছর বয়স তখন সে একেবারে দেশে চলে আসে।আমার সুখের নৌকা তখনো ছলছলিয়ে চলছিলো। কিন্তু আমার কপালে সুখ বেশি দিন স্থায়ী হয়না।দুর্ভোগতো আসবেই। আমার মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করলাম।আবার একটা বাচ্চা পেটে আসলো। আমি গর্ভবতী তাই মেয়েকে পড়াতে কষ্ট হয়।
বাড়িতে পড়ানোর জন্য পাশের বাড়ির ইন্টারমিডিয়েট পড়ুয়া এক ননদকে নিয়োগ করলাম।প্রতিদিন সে পড়াতে আসে।মেয়ের বাবাকে ভাই বলে সম্বোধন করে।মেয়ের পড়াশোনা নিয়ে প্রায়ই ম্যাডাম মেয়ের বাবার সাথে কথা বলে।আমি সেটাকে স্বাভাবিক ভাবে নিলাম।
কিন্তু পরবর্তী তাদের মধ্যে নাকি প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। প্রথমে আমার স্বামী অস্বীকার করে কিন্তু পরে একদিন বিয়ে করে বাড়িতে নিয়ে আসে।মেনে নিতে পারিনি। চোখ বন্ধ করে বের হয়ে চলে এসেছিলাম বাবার বাড়ি। কিন্তু বাবা মা বেঁচে নেই। ভাইদের সংসারে জায়গা হয়নি। তাই আবার ফিরে এসেছি। মরে আমি সেদিনই গিয়েছি।লাশ হয়ে আজ মেয়েদের পাশে আছি।বাকী সময় গুলো হয়তো এভাবেই কাটবে।বারবার মনে প্রশ্ন জাগে আজ কেনো এমন হলো?