আমাদের ছোট বেলায় সাইকেলের প্রচলন বেশি ছিলো।কিন্তু সাইকেল এতোটাও সহজলভ্য ছিলো না।এখন গ্রামে গেলে দেখা যায় একেক ঘরে চার পাঁচটা সাইকেল,আবার মোটর সাইকেলও আছে।কিন্তু তখন উচ্চ মধ্যবিত্তদের ঘরে হয়তো একটা দুইটা সাইকেল থাকতো।আব্বা বাড়িতে থাকতো না আর আমরা তিন বোন তাই আমাদের সাইকেল থাকার কারণ নেই।
কিন্তু সাইকেলের প্রতি আমার একটা আকর্ষণ ছিলো। মানে আমার সাইকেল চালাতে খুব ইচ্ছে করতো। কিন্তু গ্রামে তখন মেয়েদের সাইকেল চালানোর প্রচলন ছিলো না।আমার দুই মামার দুইটা সাইকেল ছিলো, আর দুই মামাতো ভাইয়ের দুইটা সাইকেল ছিলো। আমার ছোট মামাতো ভাই সে আমার দুই তিন বছরের বড় হবে।তার সাইকেলটা ছিলো লাল। ছোটদের সাইকেল। সে আমাদের বাড়ির কাছের প্রাইমারি স্কুলে পড়তো।তখন সে তৃতীয় কি চতুর্থ শ্রেণীতে পড়তো।সে প্রতিদিন লাল সাইকেলে করে স্কুলে আসতো।আমাদের বাড়ি থেকে স্কুলের দুরত্ব পাঁচ মিনিট। স্কুলে সাইকেল রাখার জায়গা নেই তাই সে প্রতিদিন সাইকেল আমাদের বাড়িতে রেখে স্কুলে যেতো।ও সাইকেল রেখে চলে গেলে আমাদের বাড়ির বাহিরের উঠোনে সাইকেল চালানো শিখতাম।আম্মা আবার বকা দিতেন। তাও আমি লুকিয়ে লুকিয়ে শিখে নেই।
এরপর আব্বা বাড়িতে চলে আসলো ঢাকা থেকে। বাড়িতে থাকতে শুরু করলেন। বাজারে দোকান দিলেন। এখন আমি সারাদিন সাইকেল চালালেও কোন ভয় নেই। আব্বা বলতো কি হয়েছে সাইকেল শিখুক।এভাবে সাইকেল চালানো শিখি।কিন্তু আমি সাইকেল চালতাম বাড়িতে, কখনও রাস্তায় যায়নি।এরপর যখন অনার্স পড়তে ঢাকায় চলে আসলাম তখন থেকে আর সাইকেল চালাতাম না।
গত রবিবারে আমারা কেএলএ এজটি পার্কে গেলাম। এটা সাইকেলিং এর পার্ক। মানে এই পার্কে বড় একটা ঝিল আছে। আর এই ঝিলের চারপাশে রাস্তা। আবার কতক্ষণ পরপর গোল চত্বর।এখানে বিভিন্ন ধরনের সাইকেল ঘন্টা হিসাবে ভাড়া পাওয়া যায়।পার্কে ঢুকে আমরা প্রথমে অল্প সময় ঘুরে তারপর একটা সাইকেলে নিলাম।
সাইকেলের সামনে মানহার বসার সীট লাগিয়ে দিলো।মানহা সাইকেলে বসে আনন্দ করছিলো। আমি প্রথমে পিছনে না উঠে ঝিলের পাশে বসে ছিলাম। মানহাকে নিয়ে তার বাবা চলে গেলো।কিন্তু অল্প সময় পর আবার ফিরে এলো। বলে আমি একা বসে থাকলে ওদের সাইকেল চালাতে ভালো লাগে না।তাই আমি পিছনে ওঠে বসলাম।ও সাইকেল চালাচ্ছে আমি পিছনে বসে ভিডিও করছিলাম। এভাবে সারা পার্ক এক চক্বর দিতে দিতে সন্ধ্যা হয়ে গেলো।এক ঘন্টার মধ্যে আর দশ মিনিট আছে।
আমি বললাম এখন আমি একা কতক্ষণ সাইকেল চালাবো।কিন্তু আমি যখন সাইকেল চালাতে নিলাম আর চালাতে পারছি না।এতো বছরে যেনো ভুলে গেছি। তারপর অনেক চেষ্টা করে অল্প চালালাম।সেই সাইকেল চালাতে গিয়ে আমার ছোট ভাইয়ের সাইকেল কিনার কথা মনে পড়ে গেলো।আমার ছোট ভাইয়ের সাইকেলের খুব শখ ছিলো।কিন্তু আর কিনে দেওয়া হয়নি।কিন্তু ও যখন এইটে জেএসসি পরীক্ষা দেবে তখন ওর সাথে কথা হলো সে যদি ভালো রেজাল্ট করে তাহলে পছন্দের সাইকেল কিনে দেওয়া হবে।যথারীতি সে ভালো রেজাল্ট করলো, বৃত্তিও পেলো।এখন আর কি করা সাইকেলতো কিনে দিতে হবে।
সেদিন শুক্রবার ছিলো আমি,শাওন আর মানহার বাবা বংশালের উদ্দেশ্য রওনা দিলাম। সেখানে গিয়ে অনেক ঘুরে শাওনের মনের মতো একটা সাইকেল কিনে নিলাম।এটা ঈদের সময় ছিলো। তই আবার একটা শপিং মলে ঢুকলাম।শাওন সাইকেল ঠেলে ঠেলে আমাদের সাথে চলে।ওকে বলে দেওয়া হয়ছে কেউ সাইকেল চাইলে না দিতে।কিন্তু এক দোকানদার বলেছে,দাওতো তোমার সাইকেলটা চালিয়ে দেখি,সে দিয়ে দিয়েছে।আমি দেখি সে খালি হাতে দাঁড়িয়ে আছে।জিজ্ঞেস করলাম সাইকেল কোথায়।বলে একজন চালিয়ে দেখতে নিলো।আমরা ভয় পেয়ে গেলাম।ভাবলাম নিয়ে গেছে আর পাবো না।কিন্তু সে লোক ভালো মানুষ ঘুরে এসে দিয়ে দিলো।
এরপর মানহার বাবা সাইকেল নিজ দায়িত্বে নিয়ে নিলো বলে না হলে আজই সাইকেল হারিয়ে যাবে।এরপর আমাকে আর শাওন কে বাসে উঠিয়ে দিয়ে সে সাইকেল চালিয়ে আমাদের পিছন পিছন চলে আসলো।
সেই সাইকেল টা এখনো আছে কিন্তু শাওন শুধু যত্ন করে রেখেই দিয়েছে।ভালোভাবে চালায়নি।আসলে অতীত স্মৃতি জীবনকে মধুময় করে। ভালো থাকার জন্য এসব স্মৃতি থাকা অপরিহার্য।