কয়েকদিন যাবৎ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঢুকলেই দেখি ঘূর্ণিঝড় মোখা নিয়ে লিখালিখি। বার বার খুঁজ নিচ্ছিলাম কোথায় কি হচ্ছে কত নাম্বার বিপদ সংকেত। আসলে আমরা যারা প্রবাসী তারা দেশের বিপদে একটু বেশিই কাঁদি।হারিয়েছিতো তাই মায়া বুঝি।
আমাদের কিশোরগঞ্জ ততটা দুর্যোগ কবলিত নয়।তার মধ্যে আমাদের পাকুন্দিয়াতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ নেই বললেই চলে।তাই এর ভয়াবহতা আমরা ছোট বেলায় দেখিনি।তবে কালবৈশাখী ঝড়তো কম বেশি সব এলাকায় হয়।আমাদের এখানেও হয়।ছোটবেলায় বৈশাখ জৈষ্ঠ্যমাসে যখন আকাশ অন্ধকার হতো সবাই বলতো ঝড় আসবে মনে মনে খুবি আনন্দ পেতাম, আম কুড়োবো তাই।
আমাদের তখন টিনের কাঁচা ঘর ছিলো। তেমন মজবুত ছিলো না।আমার বড় আপা ঝড়ের নাম শুনলেই ভয়ে চিৎকার করতো।একটু ঝড়ো হাওয়া দিলেই সে উঠোনের মধ্যে এসে চিৎকার করতো। আব্বা আম্মা ওকে পাঁজা করে ধরে ঘরে আনতো।সে ঘরে এসেও উচ্চস্বরে চিৎকার করে কান্না করতো।আমার কখনো ভয় লাগতোনা। ভাবতাম ঝড়ে ঘর ভেঙে পড়বে তাতে সমস্যা কি যদি দেখি পড়ে যাচ্ছে দৌড়ে বের হয়ে যাবো।
কিন্তু একবার আমার ফুফুর বাড়িতে ছিলাম ঝড়ে ফুফুদের পাশের একটা ঘর ভেঙে পড়ে ছিলো। দরজার ফাঁকা দিয়ে দেখেছিলাম ।ওরা সবাই দৌড়ে বের হচ্ছিল কিন্তু এক ভাইয়ের উপর পড়ে গিয়ে মারাত্মক আহত হয়। তারপর থেকে ঝড় দেখলে আমি ভয় পাই। কিন্তু মনে মনে আরেকটা সমাধান বের করে নিয়েছি বের হওয়ার দরকার নেই, ঘরের ভিতরের শক্তপুক্ত খাটের নিচে আশ্রয় নিতে হবে কারণ ঝড়ে ঘর ভাঙলেও কখনো খাট ভাঙতে দেখিনি। সে যাইহোক এসব আমার কল্পনা কল্পনাতেই থাক।
ঝড়ের কথা মনে হলে আমার সিডরের কথা খুব মনেপড়ে। যদিও এখন এটা বলে হাসাহাসি করি সেদিন খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। তখন আমি ইন্টার পরীক্ষা দিয়ে বড়আপার সাথে ঢাকায় এসেছি।আমি অনার্সে ভর্তি হলে দুইবোন একসাথে থাকবো।তাই বড়আপা ছোট একটা রুম নিয়েছে। নভেম্বরের এক তারিখ আমরা সেই বাসায় উঠেছি।জিনিসপত্র কিনা হয়নি তখনো। একটা খাট, টেবিল, চেয়ার আর আলনা কিনেছি।তোষক অর্ডার দিয়ে বানাবো তাই এখনো কিনা হয়নি।বাড়ি থেকে আনা দুইটা কাঁথা আছে একটা মোটা একটা পাতলা।মোটাটা খাটের উপর বিছিয়ে বিছানার চাদর বিছিয়েছি।জামা কাপড়চোপড়, বালিশ, হাঁড়ি, পাতিল এসব ছাড়া আর কিছু নেই।যেদিন সিডার হলো সেদিন বড়আপার জ্বর ছিলো। আমরা ঘুমিয়ে ছিলাম হঠাৎ বাতাস আর বৃষ্টির শব্দ।
শহরে ঝড় তেমন বুঝা যায়না কিন্তু সমস্যা হচ্ছে শিলা বৃষ্টি হচ্ছিল, বাতাস সব মিলিয়ে প্রচন্ড রকম শীত।আমার কোনো সমস্যা হচ্ছিল না।কিন্তু বড় আপা থরথর করে কাঁপছিলো।ওর জ্বরও তখন বেশি।সুয়েটার,কাঁথা সব দিলাম কিন্তু কাঁপা আর বন্ধ হয়না।শেষে ওর দুই-তিনটা বোরকা ছিলো তাও দিলাম।আমি একা কিছু বুঝতে পারছিলাম না কি করবো। শুধু কান্না করতে ছিলাম।এভাবে খুব কষ্টে সকাল হলো।সকালে অবশ্য আপার জ্বর থেমে গেছে।
ঐবাসায় আমগাছ ছিলো ভেঙে গেছে, নারিকেল গাছ পড়ে গেছে।সেসময় দুইদিন বিদ্যুৎ ছিলো না,গ্যাস ছিলো না।বাড়ির রিজার্ভ ট্যাংক থেকে পানি ওঠিয়ে আমরা গোসল করেছি। আমরা বেরিবাঁধ থেকে লাকড়ি এনে ইটের চুলা বানিয়ে রান্না করেছি।সবাই বিরক্ত হচ্ছিল। কিন্তু আমার কাছে পিকনিক পিকনিক লাগছিলো।মনে হচ্ছিল কোনো প্রত্যন্ত অঞ্চলে আমরা। গ্যাস, বিদুৎ তো দূরের কথা লাকড়ি খুঁজে পাওয়াও দুষ্কর হচ্ছিল। যখন বিদ্যুৎ আসলো দুইদিন পর সারা খিলক্ষেতের মানুষ একসাথে চিৎকার করে উঠছিলো।
যাইহোক প্রাকৃতিক দুর্যোগ কখনো কাম্য নয়।অনেক সময় প্রকৃতির বিপর্যয় ঘটিয়ে আমরাই এ দুর্যোগ ডেকে আনি।তাই পরিবেশ বাঁচাতে, নিজেদের বাঁচাতে আমাদের সকলকে নিজ নিজ জায়গা থেকে প্রাকৃতিক বিপর্যয় রোধে কাজ করতে হবে।তবেই আমরা বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা পেতে পারবো।