সাত ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট সুশ্রী।ওর বাবা অবসর প্রাপ্ত পুলিশ অফিসার। বড় ভাই কর্ণেল, মেজু ভাই পুলিশের প্রথম অফিসার। এরপরে আরও দুই ভাই। তারাও সরকারি চাকরিজীবী। বড় দুই বোনের বিয়ে হয়েছে বনেদী ঘরে। সুশ্রীর বাড়ি স্কুলের কাছে।সে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। আমাদের এলাকায় অনেক হিন্দু পরিবার ছিলো। তাদের বেশির ভাগই ইন্ডিয়া চলে গেছে। কিন্তু ওনারা বহাল তবিয়তেই আছে। এলাকায় ওদের নাম, যশ,প্রতিপত্তি কোনো কিছুরই অভাব নেই।
এমন পরিবারের সবচেয়ে ছেট মেয়েকে নিয়ে সবার স্বপ্ন আকাশ ছোঁয়া হতেই পারে তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। ফর্সা, লম্বা চিপচিপে গড়ন সুশ্রীকে করেছে সবার কাছে আকর্ষনীয়।পড়াশোনায় ভালো তাই স্কুলের সব শিক্ষকরাই তাকে চিনে।যখন নবম শ্রেণীতে উঠলো,সবসময় শ্রেণীতে প্রথম হওয়া মেয়েটি বিজ্ঞান বিভাগে পড়বে এটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু সুশ্রী জেদ ধরে বসে আছে সে বাণিজ্য শাখায় পড়বে।বাড়ির সবাই বুঝাতে চেষ্টা করলো সে বুঝে না।শেষে সুশ্রীর জেদের কাছে সবাই মাথা নত করলো। ওকে বাণিজ্য শাখায় পড়তে দিলো।সুশ্রী তাতে বিষণ খুশি।পড়ালেখায় খুব মন দিয়েছে। স্কুলে বাণিজ্য বিভাগের মাত্র একজন শিক্ষক। তিনি বাণিজ্য বিভাগের তিনটি বিষয় পড়ান।
হিসাব বিজ্ঞান প্রাইভেট পড়তে হবে।সুশ্রীর বাবা বাইরের শিক্ষক রাখতে চাইলেন যেন বাসায় এসে পড়ায়।কিন্তু সুশ্রী রাজি হলো না।সে তার স্কুল শিক্ষকের কাছে পড়বে।তিনি আবার বাসায় এসে পড়াতে পারবেন না।ওনার বাসায় গিয়ে পড়তে হবে। সুশ্রীর বাবা রেগে গেলেন। বললেন ''আমি কথা বলব বাসায় এসে পড়ায় কিনা সেটা আমি বুঝবো"।
"তাহলে আমার প্রাইভেট পড়ার দরকার নাই।সবাই স্যারের বাসায় গিয়ে পড়ে আমার কেনো আমাদের বাসায় পড়তে হবে"। এসব বলে সুশ্রী চলে গেলো।পরের দিন ওর বাবা ওকে ডেকে বলে দিলেন, ঠিক আছে স্যারের বাসায় পড়তে যেও। কিন্তু কখন পড়বে সেটা তোমার মাকে বলে দিয়ো।সুশ্রীতো বিষণ খুশি।
পরদিন থেকে পড়তে শুরু করে দিলো।স্যারের বয়স চব্বিশ বছর।একবছর আগে এইস্কুলে যোগদান করেন।তখন সুশ্রী ক্লাস এইটে পরে।স্কুলের ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় সুশ্রী সেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেছে। সেখান থেকে স্যারের সাথে কথাবার্তা শুরু হয়।বার্ষিক পরীক্ষার সময় ওদের সম্পর্ক অন্য রুপ নেয়।দুজনের মন বিনিময় হয়ে যায় । মূলত এই কারণেই সুশ্রী ব্যবসা শিক্ষায় পড়াশোনা করার জেদ ধরে বসে ছিলো। ওদের দিন ভালোই যাচ্ছিলো।এস এস সি পাশ করে কলেজে ভর্তি হলো।
সুশ্রী তার স্কুলের স্যারের কাছে হিসাব বিজ্ঞান পড়বে।এসএসসি তে ভালো রেজাল্ট হয়েছে তাই কারো কোনো আপত্তি নেই। কলেজের নতুন কিছু বন্ধুদের সুশ্রী পড়ার জন্য স্যারের কাছে নিয়ে এলো। সবাই এক সাথে পড়ে। স্যারের কাছ থেকে পড়ে সবাই সুশ্রীদের বাড়িতে প্রায়ই আড্ডা দেয়।এই আড্ডায় এক বন্ধু বলছিলো স্যার মুসলিম তুই ভাইয়াদের কিভাবে মানাবে। এই কথা সুশ্রীর ভাই অন্য রুম থেকে শুনে নিয়েছে। ভাইয়ের বিষয়টা বুঝতে দেরী হয়নি।
সেদিন বিকালে সুশ্রীকে ওর ভাই বড় বোনের শ্বশুর বাড়িতে নিয়ে যায়।বোনের শরীর খারাপ তাই কিছু দিন ঐখানে থাকতে হবে।ওকে রেখে ভাই বাড়িতে চলে আসে।বাড়িতে এসে মেজুভাইয়ের বন্ধুর সাথে সুশ্রীর বিয়ে পাকা করে পরের শুক্রবার। বাড়িতে বিয়ের ধুম লেগে যায় সুশ্রী কিছুই জানে না।বৃহস্পতিবার রাতে বোন সুশ্রীকে নিয়ে বাড়িতে আসে।বাড়িতে এসে সুশ্রী কি করবে বুঝতে পারেনা।এদিকে ওকে সেকেন্ডের জন্যও একা রাখা হচ্ছে না।রাত কেটে গেলো।
সন্ধ্যা লগ্নে বিয়ে। ওকে কণে সাজানো শেষ, বর চলে এসেছে। বর আসার শব্দ শুনে সবাই এক সাথে বেরিয়ে আসে, সুশ্রী ঘরে একা।সুশ্রী জানলা দিয়ে লাফিয়ে ঘরের পিছনে পড়লো এরপর দৌড়ে রাস্তায় ওঠে দেখে স্যার গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছে। গাড়িতে উঠে ওরা সোজা চলে গেলো জেলা জজ আদালতে। সেখানে সুশ্রী ধর্ম পরিবর্তন করলো এবং ওরা বিয়ে করে। এদিকে সুশ্রীকে না পেয়ে ওর ভাইয়েরা স্যারের বাড়িতে পুলিশ নিয়ে গেলো। বাড়িতে বৃদ্ধ মা ছাড়া কেউ নেই। ওনারা ফিরে গেলেন।
সুশ্রীরা বিয়ে করে সরাসরি স্যারের বাড়িতে চলে আসলো।পরের দিন আবার সুশ্রীর ভাই পুলিশ নিয়ে আসলেন। এসে দেখে সুশ্রী হয়ে গেছে সুলেখা। তাই তারা বোনের সাথে সব সম্পর্ক ত্যাগ করে চলে গেলেন।এরপর সুশ্রী সুখে সংসার করতে শুরু করলো।মেয়ের জাত গেছে তাই বাপ-ভাই জীবন থেকে কেটে বাদ দিয়েছে।
কিন্তু কাটতে পারেনি মা, চটপট করেছে সারাক্ষণ। আমরা যখন ছোট সুশ্রীর মা তখন বৃদ্ধ। কিছুটা মানসিক রোগী।রাস্তার পাশে বসে থাকতো রাতদিন।আর পথচারীদের বলতো আমার সুশ্রী কেমন আছে।সুশ্রীকে বলো আমাকে দেখে যেতে। কিন্তু সুশ্রী বাপ ভাই এর ভয়ে আসতো না।ওনাকে দেখে আমিও বুঝেছিলাম মায়ের কোনো জাত হয় না।মা সে শুধু মা।