গ্রামে বড় হয়েছি আমি।তা-ও আবার মধ্যবিত্ত পরিবারে।এমনিতেই গ্রামে চা কফি বাড়িতে করা হয় কম।যদিও এখন ঘরে ঘরে প্রতিদিন করা হয়।কিন্তু আমার ছোট বেলায় এমন ছিলো না।চা পাওয়া যেতো শুধু চায়ের দোকানে। মেহমান কে কেউ চা দিয়ে আপ্যায়নও করতো না।তাই চা খাওয়া হয়নি ছোট বেলায়।যখন আমার বয়স পাঁচ কি ছয় বছর তখন প্রতিদিন সদাই আনতে বাজারে যেতাম।আব্বার দোকান ছিলো বাজারে।
আমি গেলে আব্বা সদাই কিনে আমার কাছে দিতো।আমাদের বাড়ি থেকে বাজারে গিয়ে ঢুকার রাস্তায় মানে বাজারের শুরুতে একটা টঙ চায়ের দোকান আরেক টা বড় মিষ্টির দোকান তবে সেখানে চাও আছে। টঙ দোকানের সামনে বেঞ্ছ থাকে সেখানে বসে সবাই চা খায়(পান করে)।
ঐসব জায়গায় মানুষ চা অল্প অল্প ফিরিজে ঢেলে ফু দিয়ে খেতো।আবার মিষ্টির দোকানের সামনের দিকের চেয়ার টেবিলে বসে একি ভাবে চা খেতো।তখন আমার মনে মনে একটা আকর্ষন এই চা খেতে কেমন?নিশ্চয় খুব মজা।নইলে কি আর এতো মানুষ খেতো?প্রতিদিন আব্বা আমাকে অনেক কিছু খাবার কিনে দিতো।মিষ্টির দোকান থেকে মিষ্টি খাওয়াতো,ছানা খাওয়াতো। বাজারের এক পাশে বুট,বাদাম, নিমকি ওয়ালারা বসতো।আব্বা ওদের বলে দিয়েছিলো এটা আমার মেয়ে যা চাই দিয়ে দিবেন। দোকান থেকে টাকা নিয়ে আসবেন।
কিন্তু আমার প্রতিদিন মনে হতো আব্বা হয়তো আজ চা কিনে দেবে।কিন্তু আমি কি আর জানি ছোট বাচ্চাদের চা খেতে হয়না তাই আব্বা আমাকে কোনোদিন চা কিনে দেবে না। আমি আবার কোনো কিছু চাইতে পারি না।যা দেয় তাই নেই। এভাবে আর কোনো দিন চা খাওয়া হয়নি।এরপর যখন এসএসসি পরীক্ষা দিবো তখন রাতে পড়াশোনা করতে হবে তাই আম্মা চা এনেছে। আমি সন্ধ্যা আটটার মধ্যে ঘুমিয়ে যেতাম তখন।আমি তো খুব এক্সাইটেড জীবনে প্রথম চা খাবো।
পড়াশোনা নিয়ে আমার কোনো মাথা ব্যথা নেই। চা খাবো এটা হচ্ছে ফেক্ট।যাইহোক রাত হলো আম্মা চা বানিয়ে দিলো। লিকার চা।এক চুমুক খেয়ে মনে হলো আরও একযুগ পরে যদি এ সুযোগ টা আসতো তাহলে মন্দ হতো না।তাহলে চায়ের প্রতি আমার এ আকর্ষণটা ঠিক থাকতো।আজকের পর সে ইচ্ছে মরে গেছে। আর কোনো দিন চা খাবো না।আম্মা বলে তুকে মজাকরে খাইতে চা দেই নাই।একটু যাতে পড়তে পারিস তাই দিলাম।প্রতিদিন খেতে হবে।আমি আবার যা পছন্দ নয় তার দিকে তাকিয়ে দেখতেও পছন্দ করি না।তাই আম্মা আর চা আমাকে খাওয়াতে পারেনি।এরপর অনার্সএ ভর্তি হয়ে যখন ঢাকায় আসলাম তখন আমার চায়ের কোন আকর্ষণ নাই।
যখন টিউশনি শুরু করলাম তখন একদিন আমার এক ছাত্রের মা দুধ চা আর টুস্ট বিস্কুট নিয়ে এলো। এখন কিভাবে বলবো চা খাবো না, চা খেলাম সেদিন টুস্টের সাথে। ভালো লাগেনি, আসলে আমার যা একবার অপছন্দ হয় তা খাদ্য তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দেই।এখানে অবশ্যই অনেকটা বাধ্য হয়ে খেতে হলো।এরপর যখন আরও টিউশনি শুরু করলাম তখন দিনে একবার চা খাওয়া বাধ্যতামূলক হয়ে গেলো।কি আর করা যাবে।এর মধ্যে একেক দিন কয়েক কাপ খাওয়া লাগে।
কারণ আমি ছয়টা টিউশন বাসায় গিয়ে করতাম।এরপর যখন ছাত্র ছাত্রীর মায়ের সাথে ফ্রি হয়ে গেলাম তখন সবাই কে বলে দিলাম "আপা চা দিলে আমাকে একটু জিজ্ঞেস করে নিবেন। সমস্যা টা হচ্ছে এমনও দিন যায় চার কাপ চা খেতে হয়।এটাতো ঠিক না।"তখন থেকে আমার ছাত্র ছাত্রীর মা চা খুব কম দিতো।
এরপর আমার বড়আপার বিয়ে হয়ে গেলো।আমরা কুড়িল শিফ্ট করলাম। সেখানে আমরা বড় আপার বড় জায়ের সাথে থাকতাম। মানে আমরা এক সাথে খাওয়া দাওয়া করতাম।এখন সমস্যা হলো ওনারা সকালে চা বিস্কুট নাস্তা খাবে।কি জ্বালারে বাবা! কিন্তু কি আর করা যাবে হেভ টু।তাই প্রতিদিন খাওয়া লাগতো।এরপর আমাদের এলাকার এক ভাইজিকে পড়ানো শুরু করলাম। তাকে চা খোর বলা যায়।
তার মা আবার তাকে চা খেতে বেশি দিতে চায় না।ও আমাকে বলে "আন্টি আমরা তো সন্ধ্যায় পড়বো প্রতিদিন নাস্তার সাথে চা খাবো।আপনি না করবেন না তাহলে কিন্তু আমার খাওয়া হবে না।"সে দুইটা নির্দিষ্ট মগ রেখেছে আমার একটা ওর একটা।এখন ভাবি করে কি, প্রতিদিন এই দুই মগ ভরে চা দেয়। সাথে বিভিন্ন ধরনের নাস্তা।
আসলে ভাবি সেটা দুধ চা না বরং চা দুধ বানাতো।নামে চা আসলে কিন্তু দুধ।কিন্তু খুব মজা ছিলো। যেহেতু চা আমার কম পছন্দ। এভাবে খেতে খেতে এমন অবস্থা হয়ছে চা না খেলে ভালো লাগে না।প্রতিদিন একবার অন্তত চা খেতে হবে।চায়ের গল্প এখানেই শেষ। এখন অবশ্যই বছরেও হয়ত এককাপ চা খাওয়া হয়না।কিন্তু প্রতিদিন সকালে এককাপ কফি না খেলে যেনো দিনই শুরু হয় না।কফি খাওয়া শিখার গল্পটাও একদিন নিয়ে আসবো।