আমাদের সমাজ কিংবা ব্যক্তিত্ব এমন হয়ে গেছে যে আমি নারী তাই আমি নারীর জায়গা থেকে সব ভেবে বসে থাকি।আমি পুরুষ তাই আমি পুরুষের জায়গা থেকে ভাবি।এখন মনে হতে পারে সেটাই তো ঠিক। না আমি সাধারণ চিন্তা চেতনার কথা বলিনি। এটা বলতে আমি নারীকে নিয়ে পুরুষের ভাবনা আর পুরুষকে নিয়ে নারীর ভাবনার কথা বুঝিয়েছি।আমি নারী পুরুষের চিরাচরিত সম্পর্ক নিয়ে ভাবনার কথাও বলিনি।আমি বলেছি নারীর সম্বন্ধে একজন পুরুষ কি ভাবে আর একজন পুরুষ সম্বন্ধে নারী কি ভাবে।
আচ্ছা একটা উদাহরণ দেয়া যাক তাহলে বিষয় টা স্পষ্ট হয়ে যাবে।আজকাল প্রায়ই পুরুষদের বলতে শুনা যায় নারী মা, বোন হিসেবে ভালো, সঙ্গী হিসেবে শতভাগ তো দূরের কথা পঞ্চাশ ভাগও ভালো হয় না। কিন্তু কেনো হয়না?ভেবে দেখেছেন কখনো। এত সময় কোথায়!
মা হিসেবে যে নারী এতোটা মমতাময়ী, বোন হিসেবে যে এতোটা পারফেক্ট সে সঙ্গী হিসেবে কেনো পারফেক্ট নয়।আমি বাংলাদেশী নারী তাই বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থা,রীতিনীতি এসব থেকেই কথা বলবো।
আমাদের সমাজের শুধু পুরুষ নয়, শ্বশুর বাড়ি নামক জায়গার মানুষ জন মনে করেন, একটা মেয়ে যখন বিয়ে করে আসে তখন তার বাবার বাড়ির সাথের সম্পর্কের সুতোটা ছিঁড়ে চলে আসে। এরপর বাবার বাড়ির সাথে সম্পর্ক থাকবে তবে তা হচ্ছে বেড়ানো, ভালো খাওয়া দাওয়া, উপহার আর জামাই বিপদে পড়লে অর্থ থেকে শুরু করে সব ধরনের সহায়তা দিয়ে তাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করবে,বউকে সবসময় চিন্তা করতে হবে বাবার বাড়ি থেকে কি আনা যায়।তাহলে সে বউ বেস্ট।কিন্তু এধরণের বউ পাওয়া একটু ঝামেলা তো বটেই।
আসা যাক সম্পর্কের সুতো ছিঁড়ে শ্বশুর বাড়িতে আসার বিষয়ে। যে বাড়িতে ছোট থেকে বড় হয়েছি যে মায়ের বুকের দুধ খেয়ে বড়ো হয়েছি,যে বাবার বুকে কাঁদতে কাঁদতে বেড়ে উঠেছি,খিল খিল করে হেসেছি।এগুলো এতো সহজে ভুলে নতুন করে বাঁচা যায় কি!আমি জানি আপনি বলছেন এগুলো আগে ছিলো এখন নেই। আপনি যদি বিবাহিত পুরুষ হন তাহলে আজ আয়নার সামনে নিজেকে দেখে প্রশ্ন করোন।উত্তর নিজেই পেয়ে যাবেন। সরাসরি স্বীকার না করলেও মনে মনে জানবেন।
আমার ছোট ভাই আমার থেকে নাকি দশ বছরের ছোট। ও রাত এগারো টা বায়ান্ন মিনিটে জন্ম গ্রহন করে। আমি ঘুমিয়ে গেছিলাম। ওর কান্নার শব্দে আমার ঘুম ভাঙে।গ্রামে তখন বাচ্চা হওয়ার তিন দিন পর মায়ের দুধ খাওয়াতো। আমার আজো মনে আছে আমি ওকে প্রথম ধনিয়া সজ ভিজিয়ে চামচে নেকড়া দিয়ে ওকে এই পানি খাইয়ে দিয়েছিলাম। এরপর তিনদিন নিজে ছাগলে দুধ দুইয়ে পাতলা করে জাল করে চামচ দিয়ে ওকে খাওয়াতাম।
তখন আমার বড়বোন ইন্টার প্রথম বর্ষে পড়ে আর মেজু বোন মামা বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করে।আম্মা সংসারের কাজে ব্যস্ত থাকতো।তাই ও বেশি সময় আমার কাছে থেকেছে। ওকে খাওয়ানো,গোসল করানো,ঘুম পাড়ানো,হাগুু মুতু পরিস্কার সবই আমি করেছি।চাইলেই সম্পর্কের সে সুতো কি ছিঁড়ে দেওয়া যায়?মানুষের মন কোনো কম্পিউটার মেমোরি তো নয় যে ইচ্ছে হলেই ডিলিট করে দেবে।
বউয়ের বাবা অসুস্থ হয়ে মেয়ে কে দেখতে চাইলে মেয়েকে থাকতে হবে স্বাভাবিক। কারণ মেয়েদের সংসারে মন দিতে হয় বাপের বাড়িতে নয়।বউয়ের শরীর খারাপ হলেও আপনার এ টু জেড প্রস্তুত চাই।আপনার কোনে কিছু সহ্য করার সময় নাই। এছাড়া কিছু বর আছে বউকে বসে খাওয়ার কথা বলতেই থাকে। আমরা কারও বিষয়ে মন্তব্য ধুম করে করে দেই।কিন্তু মাঠে নেমে পরিস্থিতি দেখার প্রয়োজন বোধ করি না।
আর বউ যদি চাকরি করে বেতন পায়,তাহলে সেই বেতন সরকারি সম্পত্তি। আর বরের পকেটের একটা টাকা নিলে কৈফিয়ত দাও।আমি অনেক বউদের দেখেছি বড়লোক শ্বশুর বাড়ির রং বেরঙের জিনিসের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেলতে। কিন্তু গরিব বৃদ্ধ বাবাকে তা থেকে এক চিমটি দেওয়ার অধিকার তার নাই। প্রতি মুহূর্তে কষ্ট পোষে মানিয়ে নিতে নিতে যখন হাঁপিয়ে ওঠে বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার জন্য দুই একটা কথা মনের দুঃখে বলে দেয় তখন সে বউ হওয়ার যোগ্যতা হারায়।
পুরুষদেরও হয়তো নিজস্ব কিছু কথা থাকতে পারে আমার তা জানা নাই।আমি বলছি না সবাই এমন কিন্তু মাঠে নেমে পরিস্থিতি বিবেচনা করলে এই দৃশ্যই চোখে পড়ে অহরহ।
আমাদের উচিত,শুধু নিজের জায়গা থেকে না ভাবা।বিপরীত মানুষটার জায়গা থেকেও ভাবা,যে আমি যদি ঐ জায়গায়, ঐ পরিস্থিতিতে থাকতাম তাহলে কি করতাম।এভাবে ভেবে দেখলেই হয়তো সবাই মিলেমিশে ঝামেলা ছাড়া থাকা যেতো।