বাংলাদেশের মানচিত্রের সবচেয়ে নিচে টেকনাফ,মানে বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণে টেকনাফ।বাসে বসে যখন জানলাম যে আমরা সেন্টমার্টিন যাচ্ছি,তখন গুগলে সার্চ দিলাম যেতে কত সময় লাগবে!গুগলে সময় বারো ঘন্টার উপরে দেখাচ্ছে।মানে টেকনাফ যেতেই বারো ঘন্টার বেশি সময় লাগবে।আমিতো ভয় পেয়ে গেলাম।এর আগে কোনদিন এতো দীর্ঘ ভ্রমণ করিনি,বাসে এতোক্ষণ বসে থাকবো কিভাবে!
আমার পাশেই মেসের ভাই ছিলো,ভাই বললো,ঘুমিয়ে যাও।বাস ছাড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই সব লাইট অফ করে দেওয়া হলো।এসি বাস তাই দরজা,জানালা বন্ধ পর্দা দেওয়া।অন্ধকার হয়ে গেলো,একে একে দেখলাম সবাই ঘুমিয়ে যাচ্ছে।আমার পাশের সিটের ভাইও ঘুমিয়ে গেলো।
এমনিতেই রাত জাগা অভ্যাস আমার,তার উপর আবার বাসে, ঘুম যে আসবে না সেটা আগেই জানতাম,হলো ও তাই,সারারাত জেগেই ছিলাম।সিটও পেয়েছিলাম পিছনের দিকে তাই ঝাঁকিও লাগছিলো বেশি।যখনই শুয়ে থাকার চেষ্টা করি তখনই ঝাঁকি বেশি লাগে,অতঃপর ঘুম বা শুয়ে থাকার আশা বাদ দিয়ে চুপচাপ বসে পর্দা ফাঁক করে বাহিরের দৃশ্য দেখা শুরু করলাম।রাত হওয়াতে তেমন বেশি কিছু দেখা যাচ্ছিলো না,কিন্তু বিদ্যুতের আলোতে দোকানপাট,রাস্তাঘাট দেখতে পাচ্ছিলাম।
যাত্রাবিরতিতে কুমিল্লাতে প্রস্রাব করার কথা ইতোপূর্বে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রল হিসাবে অনেক দেখেছি,এই প্রথম নিজের করার সুযোগ হলো।একটা বড় হোটেলের সামনে নামলাম,সেখানে গিয়ে খাওয়া দাওয়া করে, নামাজ-কালামের পাঠ চুকিয়ে আবার শুরু হলো যাত্রা।তারপর ফজরের সময় আবার একটা মসজিদের সামনে থেমেছিলাম।আর পুরো রাস্তাতেই সবাই খুব মজা করে ঘুমাচ্ছিলো,শুধু আমি জেগে ছিলাম,ওহ্ হ্যাঁ আরেকজন জেগে ছিলো,মানে বাসচালক আরকি!
সকাল সাতটার দিকে টেকনাফ পৌঁছালাম।টেকনাফ পৌঁছিয়ে প্রথমেই সীমান্ত রেস্তোরাঁ নামক একটা হোটেলে নাস্তা করে নিলাম।
আমরা মোট দুইশো বিশ জন ছিলাম।যেখানেই যাচ্ছিলাম সেখানেই বিরাট এক ভীড় সৃষ্টি হয়ে যাচ্ছিলো।
একটু সামনেই ঘাট যেখান থেকে সেন্টমার্টিনের উদ্দেশ্যে জাহাজ ছাড়বে।এর আগে জলপথের কোনো বাহনে উঠা হয়নি।বড় হয়ে গ্রামে কলাগাছের তৈরি ভেলাতে উঠেছিলাম এক-দুই দিন।তাছাড়া নৌকাই হোক বা অন্য কোনো নৌযানে উঠা হয়নি।হ্যাঁ সদরঘাটের লঞ্চে উঠেছি অনেকবার, দিদির বাসা ঘাটের আশপাশে হওয়ার সুবাদে,কিন্তু সেগুলো ঘাটে নোঙর করানো লঞ্চ ছিলো চলন্ত নয়।তাই নতুন একটা অভিজ্ঞতা হওয়ার অপেক্ষায় উত্তেজিত ছিলাম।
টিকেটতো আগে থেকেই কাটা ছিলো।সরাসরি জাহাজে উঠলাম।সবার উপরের অংশকে হয়তো সান ডেক বলে,যাইহোক সেখানে উঠলাম।তিনতল বিশিষ্ট জাহাজের দুইতলায় ভিআইপি সিটও বুকিং ছিলো আমাদের,কিন্তু আমি সরাসরি উপরে উঠে গেলাম।যেখান থেকে প্রাকৃতিক দৃশ্যগুলো কোনো ঝামেলা ছাড়াই দেখা যাবে।
জাহাজ ছেড়ে দিলো,সকালের সূর্য তখনও পূর্ব আকাশেই।অল্প কিছু দূরেই উঁচু পাহাড়ের মতো এলাকা দেখা গেলো,গাছপালা উঁচু জায়গাতে।পাহাড় কখনও দেখিনি,তাই এই উঁচু জায়গাকেই পাহাড় হিসাবে ভেবে পুলকিত হয়ে গেলাম।
পানির উপর দিয়ে জাহাজ ভেসে যাচ্ছে,আর জাহাজের দুই পাশ দিয়েই প্রচুর পরিমাণ পানচিল উড়ে বেড়াচ্ছে।তারা জাহাজকে কেন্দ্র করেই উড়ে বেড়াচ্ছে।এই দৃশ্যটা এতো সুন্দর ছিলো যে পুরোটুকু পথ এই দৃশ্যটাই আমি বেশি দেখেছি।জাহাজের রেলিঙ ধরে দাঁড়িয়ে ছিলাম আর এই পাখিদের উড়াউড়ি দেখেছি।
আবার কিছুমানুষ দেখলাম এই পাখিদের চিপস বা এই জাতীয় খাবার দিচ্ছে।মানে দয়া করে পাখিদের খেতে দিচ্ছে এমন না বেপারটা,চিপস বা এই জাতীয় খাবার ছুঁড়ে মারলে পাখিগুলো উড়ে এসে খাবারটাকে ধরে ফেলে ঠোঁট দিয়ে।আর এই ক্যাচক্যাচ খেলাটা অনেকে উপভোগ করছে।একের পর এক চিপস কিনে আনছে আর এক এক করে ছুঁড়ে মারছে।
কিছু মানুষ দেখলাম ছোট ডিঙি নৌকা করে মাছ ধরতে এই গভীর সমুদ্রে চলে এসেছে।এর থেকে বেশি অভাক হলাম তিন-চারজন কিশোর বয়সী ছেলে ফোম দিয়ে বানানো ভেলা টাইপের নৌকায় করে এই মাঝ সমুদ্রে এসে মাছ ধরছে।যেখানে এতো বড় জাহাজে বসে বার বার দোয়া দুরুদ পড়ছিলাম আর ভয় পাচ্ছিলাম জাহাজ না জানি আবার ডুবে যায়।আর সেখানে তারা ভেলায় চড়ে সুমদ্রে চলে এসেছে।জীবিকা আর পেটের দায়ে মানুষ কত ঝুঁকি নিতে পারে তার প্রমাণ।
সমুদ্রের পানি নাকি নীল শুনেছি,কিন্তু এতোক্ষণ যাবৎ অপেক্ষা করছি পানিতো স্বাভাবিকই মনে হচ্ছে।মানুষ জন বলছিলো এখনও সমুদ্র আসেনি।জাহাজে সিট ছিলো কিন্তু আমি আবেগে আর সিটে বসিনি,সারাক্ষণ রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ছিলাম।ঐদিকে বাসেতো সারারাত ঘুমায় নি।জাহাজের রেলিং ধরে আড়াই ঘন্টা যাবৎ দাঁড়িয়ে আছি আর নীল পানির জন্য অপেক্ষা করছি,খুব ক্লান্ত লাগছিলো আর পারছিলাম না।
তখন দুইতলায় ভিআইপি সিটে চলে গেলাম,সেখানে সোফায় শুয়ে ঘুমিয়ে গেলাম।ঘুমাতে না ঘুমাতে বিশ মিনিটের মধ্যেই শুনি সেন্টমার্টিনে প্রায় চলে এসেছি,দৌড়ে আবার উপরে গেলাম,উপরে গিয়ে দেখি সেই কাঙ্ক্ষিত নীল জল।পানি এতো সুন্দর লাগছিলো।ছোট থেকে বিজ্ঞান বইয়ে পানির বৈশিষ্ট্যে পড়ে আসছি,পানি হচ্ছে রংহীন,গন্ধহীন,স্বাদহীন যৌগ।কিন্তু এ পানিরতো দেখি রং আছে।অবশ্য পরবর্তীতে যখন মুখে দেওয়ার সুযোগ হয়েছিলো তখন বুঝেছিলাম এর স্বাদও আছে!
সামনে তাকিয়ে দেখি ঐতো সেন্টমার্টিন দ্বীপ দেখা যাচ্ছে।নীল পানি,দ্বীপের সামনে সারি বেঁধে রেখে দেওয়া অনেকগুলো ট্রলার আর স্পিডবোট,আর তার পিছনেই সমুদ্র তীর আর তারপর গাছের ঘেরা দ্বীপ,সত্যিই ছবির মতোই সুন্দর লাগছিলো।