ছোট বেলায় গল্প শুনতে খুব ভালো লাগতো।বাড়িতে আত্মীয় স্বজন আসলে কিংবা আমরা কোথাও বেড়াতে গেলে গল্পের আসর বসতো।সে সব আসরে মজার মজার গল্প বলতো বড়োরা।কিন্তু বড়ো হওয়ার পর অনেক মজার গল্পের বই পড়েছি। কিন্তু সে সব গল্পের বেশির ভাগই কোনো দিন কোনো বইয়ে পায়নি।এসব বেশির ভাগ গল্প হতো হাসির গল্প।শিক্ষা মূলকও হতো।
তখন এই গল্প গুলো মনে প্রাণে বিশ্বাস করতাম।মনে মনে দৃশ্য গুলো কল্পনা করতাম।কিছু কিছু গল্প ছিলো যা আজো মনে দাগ কাটে।আমার এক দাদী একটা গল্প বলতো প্রায়ই। মানে রাতে আম্মার সাথে ওনার ঘরে যেতাম তখন বায়না ধরতাম এই গল্পটা বলতে হবে তখন তিনিও খুব মনোযোগ দিয়ে গল্পটা শুনাতেন।গল্পটা ছিলো এমন।
এক দেশের রাজা একবার ঘোষণা করলো ওনার দেশে কোনো বৃদ্ধ লোক (সিনিয়র সিটিজেন) রাখবেন না।যাদের ঘরে বৃদ্ধ মা,বাবা,দাদা,দাদী এক কথায় বয়স্ক লোক আছে, রাজা তাদের জন্য নির্দিষ্ট জায়গার ব্যবস্থা করেছেন।সবাই কে সেখানে পাঠিয়ে দিবেন।নিজের দেশকে যুবকদের দেশ বলে ঘোষণা দেবেন।ইচ্ছে না থাকলেও সবাই বয়স্ক মানুষদেরকে,রাজার ঠিক করা জায়গায় পাঠাতে বাধ্য হলেন।
রাজ্যের এক বৃদ্ধ মহিলা ছিলেন। তিনি অল্প বয়সে বিধবা হয়ে খুব কষ্টে একমাত্র পুত্রকে মানুষ করেছিলেন। তার ছেলেও মাকে ছাড়া থাকতে পারতো না।সে তার মাকে পাঠাবে না। তাই ঘরের ভেতর বড় গর্ত করে সেই গর্তে মাকে লুকিয়ে রেখেছে।সবাই ভাবছে ওর মাকেও রাজার লোক নিয়ে চলে গেছে। এভাবে মা ছেলের সময় ভালোই যাচ্ছে। হঠাৎ একদিন রাজ্যে বিপদ নেমে আসলো।পাশের দেশের রাজা এদেশে রাজ্যত্ব কায়েম করতে চাই। হামলা করার আগে একটা পরীক্ষা হবে।এদের রাজা যদি ঐ রাজার পরীক্ষায় জয়ী হয় তাহলে আর হামলা করবে না।
বৃদ্ধের ছেলে এসে মাকে সব বলে।মা এটা শুনে কি পরীক্ষা জানতে চাইলো।পরীক্ষা ছিলো ছাই দিয়ে রশি বানিয়ে ঐ রাজ্যে পাঠাতে হবে।বৃদ্ধ বলে উঠলো এটাতো খুব সহজ কাজ।ছেলে জিজ্ঞেস করে মা তুমি পারবে।মা বলে পারবো।রাজা আগেই পুরস্কার ঘোষণা করেছে।রাজ্যের কেউ যদি ছাইয়ের রশি বানিয়ে দিতে পারে তাকে অর্ধেক রাজ্য লিখে দেবে।
এবার বৃদ্ধের ছেলে রাজার দরবারে খবর পঠালো সে পারবে।রাজার লোক ওকে নিয়ে গেলো।ঘোষণা অনুযায়ী পারলে ওকে অর্ধেক রাজ্যত্ব লিখে দিবে।বৃদ্ধের ছেলে একটা কথা বলতে অনুমতি চাইলো।অনুমতি পেলো।তখন সে বললো "আমি অর্ধেক রাজত্ব চাই না।আমি রশি বানাতে পারলে যা চাইবো তা দিতে হবে।" রাজা রাজি হয়ে গেলো।
মার শিখিয়ে দেওয়া কথা মতো সবার সামনে ছাইয়ের রশি বানানো শুরু করলো।প্রথমে কতগুলো পাট দিতে বললো।সেগুলো দিয়ে শক্ত করে রশি বানালো।এরপর দুই প্রান্তে ধরে টানাটানি করে একটা টিনের তৈরি বক্সে রেখে রশির এক প্রান্তে আগুন ধরিয়ে দিলো।আস্তে আস্তে রশি পুড়ে ছাই কিন্তু রশির আকৃতি ঠিক রয়ে গেলো।সেই রশি বক্সসহ ঐ রাজার কাছে পাঠিয়ে দিলো। রাজাতো অবাক এটা কিভাবে সম্ভব! এখন বৃদ্ধার ছেলের পুরস্কার চেয়ে নেওয়ার পালা।
রাজা তাকে রাজ দরবারে ডেকে বললেন।এবার তুমি যা ইচ্ছে চেয়ে নাও। বৃদ্ধার ছেলে বলতে শুরু করলো প্রথমে আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। কারন আমি আপনার হুকুম অমান্য করেছি। কিন্তু আমি যদি আপনার হুকুম অমান্য না করতাম তাহলে আমাদের দেশ ঐ রাজা নিয়ে নিতো।
আমার মা ছাড়া পৃথিবীতে কেউ নেই তাই আপনি যখন সব বয়স্ক মানুষকে বনবাসে পাঠিয়ে দিয়েছেন তখন আমি আমার মাকে গর্তে লুকিয়ে রেখেছি।আর এই ছাইয়ের রশি আমার মা বলে দিয়েছেন কিভাবে বানাবো।এখন আমি শুধু আমার মাকে নিয়ে শান্তি তে এই দেশে থাকতে চাই। রাজা তার ভুল বুঝতে পারলো। যুবকদের রয়েছে কর্ম ক্ষমতা আর বয়স্কদের রয়েছে দক্ষতা আর অভিজ্ঞতা উন্নতির জন্য, টিকে থাকার জন্য দুটিই অপরিহার্য। তাই তিনি বৃদ্ধ লোকদের আবার দেশে ফিরিয়ে আনলেন।
গল্পের শেষটা কত সুন্দর। ভুল করেছেন ঠিক আছে ভুল বুঝে আবার নিজের ভুল শুধরে নিয়েছেন।কিন্তু বাস্তবটা কখনও এমন হয় না। সবাই ভুল করে। আবার মৃত্যুর আগে পর্যন্ত নিজের ভুলটাকে সঠিক প্রমানের চেষ্টা করে। আজকাল খবরের দিকে চোখ রাখলেই দেখা যায় বৃদ্ধাশ্রমে পিতার মৃত লাশ, শিল্পপতি কিংবা উচ্চ শিক্ষিত সন্তান লাশ নিতে অস্বীকার করেছে।
আমরা যখন এসব খবর শুনি তখন ছি ছি বলতে ভুলি না, কিন্তু আমার বাবা মা বৃদ্ধাশ্রমে সেটা বেমালুম ভুলে যায়।শিক্ষা আমাদের শিখার মাঝেই আটকে থাকে ব্যবহারিক জীবনের ব্যবহারে কেনো জানি আসে না। এখন যাদের মা বাবা বৃদ্ধ তারা আমাদের মতো নব্বই দশকে কিংবা আশির দশকে জন্ম গ্রহণ করেছেন।তার মানে তারাও এসব শিক্ষা মূলক গল্প শুনেছেন কিন্তু শিক্ষাটা গ্রহন করা হয়ে ওঠে নি।এখনকার বাচ্চাদের শিক্ষার ধরণ ভিন্ন তারা কি করবে তাতো আর ভবিষ্যৎ বানী করা যায় না।তাই তারা আমার গল্পের আওতায় আসে না।