তৃতীয় বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষার প্রায় শেষের দিকে, শেষ ভাইভার আগে সপ্তাহখানেক বিরতি ছিলো।এই বিরতির মধ্যে মেডিকেলেরই এক বড় ভাই বললো,তোমার পরীক্ষাতো পনেরো তারিখ শেষ,আমাদের উনিশ তারিখ ট্যুর আছে,প্রস্তুতি নিয়ে রেখো, যেতে হবে।হুট করে ট্যুরের কথাটা বলা হলো,বেশ অবাক হলাম,তাই নাকি,কতো দিনের ট্যুর,ভাই?
ভাই বললো,চাররাত,তিনদিনের ট্যুর।তারমানে দূরের ট্যুর।
আরও বেশি অবাক হলাম দূরের ট্যুর শুনে,কারণ এর আগে আমি কোনোদিন কোথাও ট্যুরে যাই নি,ঢাকার বাহিরেই যাওয়া হয়নি,নিজের গ্রামের বাড়ি বাদে।
জীবনের প্রথমবারের ট্যুরেই এতো দূর।কিন্তু কোন জায়গায় যাবো তা বলা হলো না,এটা সারপ্রাইজ রাখা হলো।বাসে উঠার পর নাকি বলা হবে।
ট্যুরের কথা যদি বাড়িতে বলি,তাহলে নেগেটিভ কথাবার্তা বলবে,মানে ঝুকিপূর্ণ হবে,যাওয়ার কি প্রয়োজন এসব আরকি।আবার এতো দূরের ট্যুর শুনলেতো আরও সমস্যা।তাই আমিও সিদ্ধান্ত নিলাম,বাসে উঠেই যেহেতু কোথায় যাচ্ছি তা জানতে পারবো,তাহলে বাসে উঠেই বাড়িতে বলবো।অবশ্য আগে থেকে মেজু বোনকে কথায় কথায় বলে রেখেছিলাম যে ট্যুরে যাবো।
আমরা ট্যুরে যাবো দুইশোর বেশি ছেলে।সবাই মেডিকেল কলেজের।কেউ ঢাকা মেডিকেল কলেজ,কেউ সোহরাওয়ার্দী,কেউ সলিমুল্লাহ আবার কেউ মুগদা মেডিকেলের,বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ,গ্রীণ লাইফসহ ঢাকা শহরের বেশিরভাগ মেডিকেলের ছাত্ররাই ছিলো।সব ভাইদের সাথে দেখা হবে এইজন্য আরও বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছিলাম।
সাড়ে পাঁচটায় আরামবাগ বাস স্টেশনে থাকতে বলা হলো।সাড়ে ছয়টায় বাস ছাড়ার সময়।আমি যেখানে ছিলাম সেখান থেকে ঘন্টাখানেকের পথ,ঢাকা শহরেতো জ্যাম থাকবেই।আমিসহ আরও তিনজন, আসরের নামাজ পড়ে বের হলাম ঠিক সময়েই।কিন্তু এক বড় ভাই এর মোবাইলের স্ক্রিন ফেঁটে গেলো।যেহেতু চারদিনের ট্যুরে যাচ্ছি সেটা মেরামত না করে গেলে হবে না।ট্যুর মানেই কতো শত ছবি তুলার প্ল্যান,মোবাইল ছাড়া চলবে নাকি!ভাই বললো,দেখি মেরামত করানো যায় কিনা।দ্রুত পাশের এক মোবাইল সার্ভিস সেন্টারে গেলেন,বললো আধাঘন্টার ভিতর ঠিক করে দিতে পারবেন,বারোশ টাকা লাগবে,তা লাগুক।ওনি মেরামত করাতে দিলেন।
আমরা বাহিরে একটা টং দোকানে দাঁড়িয়ে চা খেলাম,আমি অবশ্য চা খাইনি চকলেট খেলাম।আধাঘন্টা পার হয়ে গেলো।পাঁচটা বাজে তখন।
ভাইকে বললাম গিয়ে দেখতে মেরামত হয়েছে কিনা।ফিরে আসলেন হয়নি, আরও আধাঘন্টা লাগবে।আসলে কাজ হাতে পাওয়ার জন্য দোকানদাররাতো এমন মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়েই থাকে।তো আরও আধাঘন্টা শেষ হয়ে গেলো।
এইদিকে স্টেশন থেকে আমার টিমলিডার ভাই কল দিলেন।মোট বারোটা টিম করা হয়েছে।প্রত্যেক টিমের একজনকে লিডার করা হয়েছে,সে সবকিছু দেখাশুনা করবে।
সাড়ে পাঁচটায় যেখানে স্টেশনে থাকার কথা, সেখানে আমরা এখনও রওনায় দিতে পারলাম না।রওনা দিয়েছি সত্য,কাঁধে ব্যাগ কিন্তু আটকে আছি শুরুতেই।কোথায় আছি, জানতে চাইলেন ভাই।আমি সরাসরি মিথ্যা বলতে পারলাম না,তাই কিছু না বলেই ফোন কেটে দিলাম।
এভাবে মোবাইল মেরামত করতে প্রায় ছয়টা বেজে গেলো।তখন একটা সিএনজি অটোরিকশায় করে স্টেশনের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।রাস্তায় জ্যামে আটকা পরতেই আমার টিমলিডারকে ফোন দিয়ে বললাম,ভাই জ্যামে আটকে আছি।ভাই বললো,ভিতর দিয়ে দ্রুত আসার চেষ্টা করো।
আমার সাথে যারা ছিলো,তারা অন্য টিমের।আমি তাই টেনশন করতে থাকলাম,আর মনটা খারাপ হয়ে যাচ্ছিলো।কারণ আমি কোন জায়গায় বা অনুষ্ঠানে গেলে একদম নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত থাকার চেষ্টা করি।সময়ের এক মিনিট পরে গেলেও আমার মন খারাপ হয়।আর এই ক্ষেত্রে সাড়ে ছয়টায় বাস ছেড়ে দিবে,আর আমরা রওনাই দিলাম ছয়টায়।সাড়ে ছয়টায় বাস ছেড়ে দিলেতো,ট্যুর শেষ এখানেই।যদিও জানি আমাদের না নিয়ে বাস ছাড়বে না।
যাইহোক,এভাবে টিমলিডার বারবার ফোনের উপর ফোন দিতে থাকলেন।রাস্তায় তেমন জ্যাম ছিলো না আমরা সাতটার মধ্যে পৌঁছে গেলাম।ছয়টা বাস একসারিতে দাঁড়ানো,দৌড়াদৌড়ি করে আমার বাস খুঁজে বের করলাম।বাসে উঠার পর সবাই বলছিলো যে আশরাফুল এসে গেছে।টিমলিডার জড়িয়ে ধরলেন,কিন্তু একটু বকাও দিলেন কেনো ঠিক সময়ে বের হয়নি।ভাইকে তো আর বলতে পারিনি,আমার দোষ ছিলো না,আমরা ঠিক সময়েই বের হয়েছিলাম।যদিও এতে কারোরই দোষ ছিলো না,মোবাইল যে ভাঙলো এটাতো দুর্ঘটনা।যাইহোক,তবু বেশি দেরি হয়নি।
তখনও জানি না,কোথায় যেতে চলেছি।দৌড়ে এসে বাসে উঠেছি,বাসের নাম খেয়াল করা হয়নি।আর বাস সম্পর্কে আমার ধারণা খুব কম।আগেই বললাম,কখনও কোথাও যাওয়া হয়নি।তো টিমলিডার নিশ্চিত করলো সবাই আছি কিনা,সবাই উপস্থিত বলাতে বাস ছাড়লো।তখন টিমলিডার সেই সারপ্রাইজ বাক্যটি বললো।আমরা সেন্টমার্টিন যাচ্ছি।শুনে খুশি হয়ে গেলাম।কারণ কিছুদিন আগেও হুমায়ুন আহমেদের "দারুচিনি দ্বীপ" উপন্যাসটি পড়েছি।সেই উপন্যাসের বিভিন্ন কাহিনি ও চরিত্রদের কথা মনে হতে লাগলো,আর এক অন্যরকম ভালো লাগা কাজ করতে লাগলো।
জীবনের প্রথম ট্যুর,দূরপাল্লার ভ্রমণ এমন একটা জায়গায় হবে ভাবিনি।খুশি হয়ে আম্মা এবং বোনদের জানালাম।সবাই হয়তো একটু চিন্তিত হলো,কিন্তু কেউ কিছু বললো না।এভাবেই আমার জীবনের প্রথম ট্যুরের সূচনা।
চলবে...