ঢাকা টু কিশোরগঞ্জ রুটে যে লোকাল বাস চলে, সেই বাস ছাড়া জীবনে আর কোনো দূরপাল্লার যানবাহনে উঠিনি এর আগে।ঢাকায় ছোট থেকে থাকি আর কিশোরগঞ্জ নিজের বাড়ি।এই আমার জীবনে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা।তাও কিশোরগঞ্জ সদর হলে একটা কথা ছিলো,সেখানে ট্রেনে যাওয়া যেত,কিন্তু কিশোরগঞ্জের যে অংশে আমার বাড়ি, তা একদম কিশোরগঞ্জের শুরুতে ঐতো গাজীপুরের পরেই।এখানে শুধু লোকাল বাসই চলে,না চলে কোনো ট্রেন।নৌযান চলারতো প্রশ্নই আসে না,আর আকাশযান বাপরে বাপ শখ কতো!
শুধু নিজের বাড়িতেই যেতে হবে এমনতো কোনো কথা নেই।অন্য জায়গাতেওতো ভ্রমণে যাওয়া যায়।হ্যাঁ তা যাওয়া যায়,পাড়ার ছেলেরাতো প্রতি বছরই দলবেঁধে ঘুরতে যায়।কিন্তু না আমার পরিবার থেকে সেইসব দলের সাথে ঘুরতে যাওয়াতে ১৪৪ ধারা জারি করা আছে।তবে স্কুল থেকে গেলে ভিন্ন কথা,শিক্ষা সফর বলে কথা।
স্কুল কলেজে পড়াশোনা করলে সবাই শুনি কতো শিক্ষা সফরে যায়।তবে আমার স্কুলে যেতো না নাকি?
একদম ছোট সময় প্রথম শ্রেণী থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত গ্রামের যে স্কুলে পড়ালেখা করতাম সেটা একটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।ঐ স্কুল থেকে শিক্ষা সফরে যাওয়ার আশা করা আর সূর্যে ভ্রমণে যাওয়ার আশা করা একি কথা।তারপর ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে ঢাকা শহরের যে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতাম সেখানে অবশ্য শিক্ষা সফরে যাওয়ার নিয়ম ছিলো।তবে সেটা শহরের অন্যান্য স্কুলের মতো প্রতি বছর না।ঐ স্কুলের নিয়ম ছিলো দশম শ্রেণিতে উঠলে বছরের শুরুতে শিক্ষা সফরে নিয়া যাওয়া হবে।এটাই ঐ স্কুলের ঐতিহ্য।যুগের পর যুগ এটাই চলে আসছে।যখন নিচের ক্লাসে পড়তাম তখন বড় ভাই বোনদের শিক্ষা সফরে যাওয়া দেখে কতোই না স্বপ্ন দেখতাম,একদিন আমিও দশম শ্রেণীতে উঠবো,আমিও শিক্ষা সফরে যাবো।আমি কি আর তাহলে দশম শ্রেণীতে উঠতে পারিনি?
না না আমি ঠিকই দশম শ্রেণীতে উঠেছিলাম,কিন্তু সেই বছর বিরোধীদলের পক্ষ থেকে সরকারের প্রতি এতো ভালোবাসার উদ্রেক হলো যে তারা সরকারকে বিশ্রাম দিতে সপ্তাহের পাঁচদিনই হরতাল ডেকে বসে থাকতো।একটানা মাসের পর মাস হরতাল,গন্ডগোল।ঐ বছর আমাদের শিক্ষা সফর স্থগিত করে দেওয়া হলো।আমাদের স্কুলের ইতিহাসে ঐ একবছরই দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সফর স্থগিত ছিলো।এরপরের বছর থেকে যথারীতি চলতে থাকলো।আগে সিনিয়রদের শিক্ষা সফর দেখে স্বপ্ন দেখতাম,পাশ করে বের হবার পর জুনিয়রদের শিক্ষা সফর দেখে আপসোস করতে থাকলাম।
তারপর উচ্চমাধ্যমিকে যে কলেজে ভর্তি হলাম,কলেজে প্রথমদিন গিয়েই খুশি হয়ে গেলাম।কি অত্যাধুনিক কলেজ।নবীনবরণ কতো ফিল্মিস্টাইলে করলো।আর মনে মনে ভাবতে থাকলাম,এরা বোধহয় খুব ভালো জায়গায় শিক্ষা সফরে যায় প্রতিবছর।বড় ভাইদের কাছে শুনলাম,প্রতি বছর দেশের নামকরা দর্শনীয় স্থানগুলোতে শিক্ষা সফর হয়।সব শিক্ষার্থীরা যায়।ভাবলাম যাক উচ্চমাধ্যমিকের দুইবছর দুটো সফর পাবো।
কিছুদিন পর শুনলাম আমাদের প্রিন্সিপাল বদলি হয়েছে।সামরিকবাহিনীর পরিচালিত কলেজ তাই কয়েকদিন পর পর প্রিন্সিপাল পরিবর্তন হয়।যাকগে প্রিন্সিপাল পরিবর্তন হয়েছেতো আমার কি!না আমার কিছু হওয়ার ছিলো।আমার সফরে যাওয়ার স্বপ্ন ধূলিসাৎ হওয়ার ছিলো।ঐ বছর এমন এক ল্যাফট্যানেন্ট প্রিন্সিপাল হলেন ওনি বিনোদন একদম সহ্য করতে পারেন না।ছেলেপেলেরা পড়ালেখা করতে এসেছে,এখানে আবার বিনোদন কিসের! রেগ ডে,শিক্ষা সফরসহ যা যা হতো বিনোদনমূলক, সব ঐ দুই বছর বন্ধ ছিলো।
এরপর আমরা যখন পাশ করে চলে আসলাম,তখন শুনলাম ওনার আবার বদলি হয়েছে।এরপর আবার আমাদের জুনিয়ররা মজা করে শিক্ষা সফরে যেতে লাগলো।
তারপর মেডিকেলে ভর্তি হলাম।জ্বি না,অসুস্থ হয়ে না।মেডিকেল কলেজে পড়াশোনা করার জন্য।ঐখানে যাওয়ার পরতো শিক্ষা সফর সম্পর্কে বর্ণনা শুনে চক্ষু ছানাবড়া।প্রথম বর্ষেই প্রথম টার্মের(চার মাসপর সাময়িকি ধরনের পরীক্ষা) পর নাকি শিক্ষা সফরে যাওয়া হয়।এই সফরটাতে অনেক ব্যাচ নাকি দেশের বাহিরেও গিয়েছে।আমি বলি বাহ্,শহরের বাহিরেই যেতে পারিনি আজ পর্যন্ত এখন একদম দেশের বাহিরে,বাহ্ কি সৌভাগ্য!
সৌভাগ্য না ছাই!দুইমাস পার না হতে হতেই,মহাগুরু করোনা সাহেব চলে এলেন।কিসের টার্ম,কিসের বিদেশে শিক্ষা সফর, ঢাকা টু কিশোরগঞ্জ বাসে চড়ে সোজা গ্রামের বাড়িতে এসে উঠতে হলো।দেড় বছরেরও বেশি সময় বাড়িতেই মুখগোঁজে পরে থাকতে হলো।তারপর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর আবার মেডিকেল কলেজে ফেরত গেলাম।এইবার দেড় বছরের পড়া যা বাকি আছে পরে শেষ করো।একের পর এক পরীক্ষা আর পরীক্ষা।এভাবে আরও এক বছর চলে গেলো।
এইবার যখন তৃতীয় বর্ষের প্রফ(মেডিকেলের বোর্ড পরীক্ষা) দিচ্ছিলাম,তখন শুনতে পেলাম বড় ভাইরা নাকি একটা ট্যুরের আয়োজন করছে।নাহ্ এটা কোনো তথাকথিত শিক্ষা সফর না,বড় ভাইরা নিজেরাই আয়োজন করেছে,যেহেতু কলেজ কর্তৃপক্ষ নেই তাই এই নামটা দেওয়া গেলো না ।শুনে মনটা খারাপ হলো,হয়তো এইবারও যাওয়া হবে না, ফাইনাল পরীক্ষা চলছে কিভাবে যাবো!তারপর যখন তারিখ দিলো তখন খুশি হয়ে গেলাম,কারণ পরীক্ষা যেদিন শেষ তার তিনদিন পর দিন ধার্য করা হয়েছে।
যাক অবশেষে সময় সুযোগে মিলে গেলো,ট্যুরের জন্য রাজি হয়ে গেলাম,যেহেতু মেডিকেলের বড় ভাইদের সাথে যাচ্ছি তাই পরিবার থেকে নিষেধ করারও কোনো উপায় নেই এবং চলেও গেলাম।জীবনের প্রথম ভ্রমণ ঢাকা টু কিশোরগঞ্জ বাদে অন্য কোথাও।