একজন মানুষ কতদিনকার আগের পুরানো স্মৃতি মনে করতে পারে?স্বাভাবিকভাবে একটা বাচ্চা সবকিছু বুঝা শুরু করে তিন বছর বয়স থেকে।আর সে যখন বড় হয়ে যায়,হয়তো বিশ বছর বয়স ঐ সময়টায় তার ছোট সময়ের স্মৃতিগুলো ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যায়।কিন্তু সবকিছু মানুষ ভুলে না।কিছু ঘটনা আজীবনের জন্য মনের মধ্যে গেঁথে থাকে।আমারও এইরকম কিছু স্মৃতি রয়েছে,ঘটনাগুলো তেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিলো না,জানি না কেনো, এইসব ঘটনা এখনও ভিডিওর মতো পরিষ্কার মনের মধ্যে ভেসে বেড়ায়।
যেমন,তখনকার কথা যখন আমার চার বছর বয়স হবে।আম্মা স্বাভাবিকভাবে কোনদিন বাজারে যায় না।কিন্তু কোন এক দরকারে পাসপোর্ট সাইজের ছবি তুলতে হবে তাই স্টুডিওতে যেতে হয়েছে।আর গ্রামের সবকিছু বাজারের মধ্যেই থাকে।শহরে যেমন পুরো রাস্তাজোড়ে বিভিন্ন দোকানপাট,কিন্তু গ্রামে সব একজায়গায় এক বাজারের মধ্যে সব,তাছাড়া পুরো গ্রাম জুড়ে আর কোনো দোকান থাকবে না।তো তারজন্য সেদিন আম্মা আমাকে নিয়ে বাজারে গেলেন।যেতে পেরেছিলাম ঠিক মতো,গ্রামের রাস্তায়তো আর শহরের মতো এতো প্যাঁচ নেই।বাজারের পাশে বিরাট মাঠ,আর মাঠের এক কোণায় ঐ স্টুডিওটা ছিলো।বাড়ি থেকে মানুষের কাছ থেকে আম্মা জেনে গিয়েছিলো স্টুডিওটা কোথায়।সেই হিসাবে আমরা চলে যায়।কিন্তু কাজ শেষে ফেরার পথে,বাজারের ভিতর হারিয়ে গেলাম,মানে রাস্তা হারিয়ে ফেললাম।আম্মা আর চিনতে পারছে না কোন রাস্তা দিয়ে আমরা বাড়িতে পৌঁছাতে পারবো।
এই বিষয়টা নিয়ে আমি আজও ভাবি,আগের গ্রামের মহিলারা কতটুকু সহজ সরল ছিলেন,ছোট্র একটা বাজার তাও গ্রামের,এতটুকু রাস্তা উনি চিনতেন না।যাইহোক,তারপর আমরা বুঝতে পারছিলাম না কি করবো।আবার জিজ্ঞেসও করতে পারছিলাম না কারো কাছে।এমনিতে আম্মাতো কোন পুরুষ মানুষকে জিজ্ঞেস করবেন না,আমি তখন ছোট কিভাবে কাউকে জিজ্ঞেস করবো!কতক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম।হঠাৎ আমি দেখি আমাদের পাশের বাড়ির এক লোক,সম্পর্কে আমার দাদা লাগে ওনি মাথায় প্রচুর ডাটা শাক নিয়েছেন আর হাতে বাজারের ব্যাগ নিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন।ঐ জায়গাটা ছিলো উঁচু নিচু।মানে নিচু জায়গায় বাজার সেখান থেকে উঁচু রাস্তায় উঠছেন।তখন আমি আম্মাকে বললাম,"ঐ দেহো সুইট্টেয়ার বাপ"।মানে সুইটি ওনার মেয়ের নাম,সম্পর্কে আমার ফুফু,কিন্তু সমবয়সী।তো তারপর ওনাকে অনুসরণ করে আমরা চলে আসলাম।
ঘটনাটা এতো বিস্তারিত বলার কারণ হচ্ছে বাজারে ঢুকার পর থেকে বের হওয়ার আগ পর্যন্ত এই ঘটনাটা আমার মস্তিষ্কে পুরোপুরি ভিডিও আকারে সাজানো রয়েছে।অথচ ঘটনাটা আজ থেকে আটারো বছর আগের হবে।তবে এই ঘটনার একটু আগের কথা বর্ণনা করতে বললে আমি পারবোনা।মানে ঐদিন বাজারে যাওয়ার আগ মুহূর্তে কি হয়েছিলো বা বাজার থেকে বাড়িতে যাওয়ার পর কি হয়ছিলো সেসব কিছুই মনে নেই।
তেমনি ঐসময়কার আরও কিছু ঘটনা আমার এখনও মনে রয়েছে।আমার বয়স তিন হবে তখনকার ঘটনা।বাচ্চাদের একধরনের বই পাওয়া যায়,ফলের নাম,ফুলের নাম,পাখির নাম,যানবাহনের নাম।এসব বই এ ঐসব জিনিসের ছবি থাকে সাথে ইংরেজিতে আর বাংলাতে তার নাম লিখা থাকে।তো আম্মা আমাকে সেই তিনবছর বয়সে এই তিন চারটা বই প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো মুখস্থ করিয়েছিলেন।যেখানেই যেতাম,তখন মানুষ শুধু আমার কাছে এসবের নাম জানতে চাইতো বিশেষকরে ইংরেজি নাম।কারণ গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে এসব নাম অপরিচিত ছিলো।
Cucumber=শসা,Ladies finger=ঢেড়স,garlic=রসুন,pigeon=পায়রা ইত্যাদি নাম বন্দুকের গুলির বেগে বলে দিতাম।তাই সবাই বিভিন্ন কিছুর নাম ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করতো।তো মুখে মুখে সবাই জানতো যে আমি এসব পারি।এতো ছোট ছেলেকে মা সবকিছুর ইংরেজি নাম মুখস্থ করিয়ে ফেলেছে এইজন্য সবাই অবাক হতো।তো আমাদের বাড়ির পশ্চিম দিকে একটা বংশ রয়েছে,অনেক জায়গা জুড়ে তাদের বাড়ি,ওরা সবাই উচ্চশিক্ষিত এবং এটা নিয়ে তারা খুব অহংকার করতো।তো আমি যে সবকিছুর ইংরেজি নাম পারি এটা ওরাও শুনেছিলো।একদিন বিকালে আম্মা আমাকে ওদের বাড়িতে নিয়ে গেলো এমনিতেই ঘুরতে,তো ওরা একটু তুচ্ছতাচ্ছিল্যের সাথে জিজ্ঞেস করেছিলো,"কিরে শাওন, তুই নাহি সবকিছুর নাম ইংলিশে কইতারোছ"।আমি কোনো উত্তর দেয়নি।আম্মা বললো,"হো শিখাইছি কিছু।"তখন ওরা জিজ্ঞেস করতে শুরু করলো,এবং আমি সবগুলোই বলতে পারলাম,এতে তারা খুব অবাক হয়েছিলো।এমনকি তখনকার তাদের মুখের ভাবভঙ্গিও আমার স্পষ্ট মনে রয়েছে।যদিও এখন আমি তেমন ইংরেজি পারি না,সব ভুলে গিয়েছি।অবশ্য মেডিকেলের পড়াতো সব ইংরেজিতে,কিন্তু সব মুখস্থ করি আরকি।
এমন অনেক ঘটনা আছে যা সেই তিন-চার বছর বয়সের।সেসব ঘটনা আজও মনের আয়নায় স্পষ্ট,এতো স্পষ্ট যে "হাই রেজুলেশনের ভিডিও"র মতো।তবে এই কয়েকটা ঘটনাইতো আমার ঘটে নাই তিন-চার বছর বয়সে,কিন্তু সবতো আর মনে নেই,যেগুলো ঘটেছে তার থেকে আরও কতো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে যা আমার মা-বোনদের মাধ্যমে জানতে পারি,কিন্তু সেগুলো আমার একদম মনে নেই।এটার কারণ না জানি কি,কিছু ঘটনা অযথাই মনে রয়ে গেলো।
অবশ্য ছোট বেলার স্মৃতি যতই বয়স বাড়তে থাকে,মানে তিন-চার বছর বয়সের পর পাঁচ-ছয় এভাবে উপরে উঠতে থাকে ততই বেশি পরিমাণ ঘটনা মনের মধ্যে আনাগোনা দেখতে পাই।